উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির সিদ্ধান্ত অমান্য করেও যারা ভোট করে হেরেছেন তারা দুই কূলই হারিয়েছেন। একদিকে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্নও ভেস্তে গেছে। এসব নেতার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও ধ্বংস হওয়ার মুখে।
তবে বহিষ্কৃত হয়েও অন্তত সাতজন গত বুধবার অনুষ্ঠিত ভোটে নির্বাচিত হয়ে চেয়ারম্যান পদে বসতে যাচ্ছেন। যদিও তাদের ব্যাপারে আগ্রহ নেই বিএনপির। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলছেন, এটা তাদের নিজস্ব বিষয়। দল তাদের ব্যাপারে আর আগ্রহী নয়। যদিও কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, জয়ী ও বহিষ্কৃত অধিকাংশ নেতাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত থাকতে চান। তাদের অধিকাংশই দলীয় পদ ফিরে পেতে কেন্দ্রীয় দপ্তরে আবেদন করবেন বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি।
বহিষ্কৃত পরাজিতদেরপ্রথম দফার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের ৭৩ জনকে গত ২৩ এপ্রিল দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কারের ঘোষণার আগপর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই প্রার্থীদের সঙ্গে ছিলেন। তবে বহিষ্কার করার পর প্রার্থীদের কাছ থেকে সরে যান দলীয় নেতাকর্মীরা। ফলে ভোটের মাঠে বহিষ্কৃত ওই নেতারা সুবিধা করতে পারেননি।
পরাজিত হওয়ার কারণ হিসেবে প্রার্থীরা আরও বলছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এমন আশ্বাসে নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন তারা। কিন্তু ভোটের দিন আওয়ামী লীগ ও প্রশাসন একাকার হয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা তারা করেছিলেন, সেটিই সত্যি হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক নেতা জানান, গত বৃহস্পতিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, উপজেলা নির্বাচন নিয়ে বিএনপি যে ধারণা পোষণ করেছিল সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। বৈঠকে সিনিয়র এক নেতা উপজেলা নির্বাচনের প্রসঙ্গ এনে বলেন, এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না, জাতীয় নির্বাচনের মতো একতরফা উপজেলা নির্বাচনেও ক্ষমতাসীনরা নিজেরা-নিজেরা দখলের রাজনীতি শুরু করবে। সেখানে টাকার খেলা হবে, ক্ষমতার লড়াই হবে। তাই অহেতুক সাজানো এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নেতাকর্মীরা মামলা-হামলায় না জড়িয়ে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। নির্বাচনে জয়ী হওয়া ও বহিষ্কৃত নেতাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেক নেতা বৈঠকে মতামত দিলে সিনিয়র এক নেতা বলেন, তারা এখন আর দলের কেউ না। তাই তাদের দায়দায়িত্ব বিএনপির নেওয়া ঠিক হবে না। তার এই বক্তব্যের পক্ষে প্রায় সবাই একমত পোষণ করেন।
জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের নির্দেশনা অমান্য করা বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এ কারণে দল থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের সঙ্গে দলের কেউ ছিলেন না। আর যারা জয়ী হয়ে এসেছেন, এটা তাদের নিজস্ব বিষয়। দল তাদের ব্যাপারে আগ্রহী নয়।’
জানতে চাইলে গাজীপুর সদর উপজেলায় জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সহসভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ইজাদুর রহমান মিলন ইজাদুর রহমান মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দল তাকে বহিষ্কার করলেও আমি দলে ফেরার জন্য শিগগিরই আবেদন করব।’ বিএনপি যতদিন পর্যন্ত তাকে দলে ফিরিয়ে না নেবে, ততদিন পর্যন্ত তিনি অপেক্ষায় থাকবেন বলেও জানান।
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত আহ্বায়ক ও পরাজিত প্রার্থী রমিজ উদ্দিন জানান, তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতি করেন। তাই এই দলেই থাকবেন। তবে তিনি পরাজিত হওয়ার পেছনে বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে কেন্দ্রে লিখিত নালিশ করবেন। তাতে সেলিম ভূঁইয়া আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন বলে উল্লেখ করবেন।
ইসির সূত্রমতে, প্রথম ধাপে দেশের ১৩৯ উপজেলায় ভোটগ্রহণ হয়েছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১ হাজার ৬৩৫ জন প্রার্থী। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৫৭০, ভাইস চেয়ারম্যান ৬২৫ এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪৪০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
বেসরকারি ফলে দেখা গেছে, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ নেতাদের জয়জয়কার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জয়ী এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়ই আওয়ামী লীগ নেতা। এ পরিস্থিতির মধ্যেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এমন অন্তত সাতজন নেতা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন।
দেশ রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বলছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিন উপজেলার মধ্যে দুটিতেই জয় পেয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারা। গোমস্তাপুর উপজেলায় উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য আশরাফ হোসেন আলিম আনারস প্রতীকে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হুমায়ুন রেজাকে পরাজিত করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলায় জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম জয়ী হন।
বান্দরবান সদর উপজেলায় বিজয়ী হয়েছেন আবদুল কুদ্দুছ। বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত এই নেতা মোটরসাইকেল প্রতীকে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি একেএম জাহাঙ্গীরকে পরাজিত করেন। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় দোয়াত-কলম প্রতীকে বিএনপির সাবেক সদস্য আমিনুল ইসলাম বাদশা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ ফারুককে পরাজিত করেন। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সদস্য মোহাম্মদ আবদুল হামিদ। গাজীপুর সদর উপজেলায় জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সহসভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ইজাদুর রহমান মিলন, সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি যুক্তরাজ্য প্রবাসী মোহাম্মদ সুহেল আহমদ চৌধুরী নির্বাচিত হন।