রেকর্ড টানা পঞ্চম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা নিশ্চিত করেছে বসুন্ধরা কিংস। ময়মনসিংহের শহীদ রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া স্টেডিয়ামে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ডরিয়েলন গোমেজের জোড়ায় মোহামেডান স্পোর্টিংকে ২-১ গোলে হারিয়ে তিন ম্যাচ আগেই বিপিএল শিরোপা নিশ্চিত করলো তারা। দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ লিগ গুলোর মধ্যে বসুন্ধরা কিংসই প্রথম দল যারা টানা পঞ্চমবার শিরোপা জিতলো।
গেলো সপ্তাহে আবাহনীকে হারিয়েই কাজটা সহজ করে রেখেছিল বসুন্ধরা। হিসেবটা ছিল সহজ। দুইয়ে থাকা মোহামেডানকে হারালেই হয়ে যাবে পাঁচে পাঁচ। এমন ম্যাচের সব আলো কেড়ে নেন ডরিয়েলটন। তার জোড়া গোলে বসুন্ধরার শিবিরে ছিল স্বস্থি। তবে মোহামেডান ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তারাও চেষ্টা করে গেছে শেষ পর্যন্ত। মিনহাজ রাকিব একক প্রচেষ্টা একটা গোলও করেছিলেন। তবে হারের পরিণতি মানতে হয়েছে সাদা-কালোদের।
১৫ রাউন্ড শেষে বসুন্ধরার সংগ্রহ ৪০ পয়েন্ট। মোহামেডানের চেয়ে পাক্কা ১২ পয়েন্ট বেশি। শেষ ম্যাচে বসুন্ধরা যদি হারে এবং মোহামেডান যদি জিতে তারপরও ব্যবধানটা থেকে যাবে তিন পয়েন্টের। আগের দুই লিগের মতো এবারও শিরোপাটা বসুন্ধরা নিশ্চিত করেছে একাধিক ম্যাচ হাতে রেখে।
শিরোপা নিশ্চিতের উৎসব যেরকম হওয়ার কথা, ঠিক ততটা হলো না। নিয়ম করে প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করে লাল জার্সির বসুন্ধরার সৈনিকের গাঁয়ে চাপালেন চ্যাম্পিয়ন লেখা আকাশী জার্সি। মাঠে নিজেরা খানিকক্ষণ উযপানে মত্ত থাকলেই। এইটুকুই। আসলে শিরোপা-সাফল্য ক্লাবটির জন্য এতটাই নিয়মিত হয়ে গেছে, যে তিন ম্যাচ হাতে রেখে শিরোপা জিতে অনন্য রেকর্ডের মালিক হওয়ার পরও উদযাপনটা জমেনি।
আসলেই বসুন্ধরা নিজেদের নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। এমনটা দেশের ফুটবলে হয়নি কখনও। উপমহাদেশের ফুটবলেও নয়। বসুন্ধরাই প্রথম দল হিসেবে শীর্ষ লিগে আবির্ভাবের পর জিতে নিয়েছে টানা পাঁচ শিরোপা। কলকাতা মোহামেডানের এরকম একটা রেকর্ড আছে। তবে সেটা তারা করেছিল কলকাতা লিগে।
গত মৌসুমে টানা চার শিরোপায় পেশাদার যুগে দ্বিতীয় সফল দলের উপাধি পেয়েছিল বসুন্ধরা কিংস। এবারও সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে ছয় শিরোপাজয়ী আবাহনীর সঙ্গে ব্যবধানটা আরও কমিয়ে আনলো তারা। আসছে মৌসুমে সেটা হয়ে গেলে আবাহনীকে ছোঁয়ার পাশাপাশি উপমহাদেশীয় রেকর্ডটাও বাড়িয়ে নিবে তারা।
হাতে আরও তিনটি ম্যাচ থাকলেও বসুন্ধরা এই ম্যাচে খুব করে চেয়েছে শিরোপা নিশ্চিত করতে। তাই তো তাদের স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজোন সাজান আক্রমনাত্মক একাদশ। গত সপ্তাহে আবাহনীর বিপক্ষে খেলা একাদশে দু'টি পরিবর্তন আনেন কোচ। কার্ডের কারণে গত ম্যাচ মিস করা সেন্টারব্যাক তপু বর্মণেক জায়গা দিতে সরে যেতে হয় দারুণ ফর্মে থাকা বিশ্বনাথ ঘোষকে। রাইটব্যাক বিশ্বনাথকে বেঞ্চে রেখে তার পজিশনে আবাহনীর বিপক্ষে আগের ম্যাচে ভালো খেলা রিমন হোসেনে আস্থা রাখেন কোচ। আর আক্রমণের শক্তি বাড়াতে হোল্ডিং মিডফিল্ডার মাসুক মিয়া জনির জায়গায় একাদশে রাখেন শেখ মোরসালিনকে। তিন ব্রাজিলিয়ান ডরিয়েলটন, রবসন রবিনহো, মিগেল ফিগেইরার সঙ্গে আক্রমণে যোগ দিয়েছেন ফর্মে থাকা রাকিব হোসেন ও মোরসালিন।
আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলতে নামা বসুন্ধরা শুরু থেকেই মোহামেডানের রক্ষণ চেঁপে ধরে একের পর এক আক্রমনে। তবে বেশ ক'টি গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন ডরিয়েলটন। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটে ডান দিক থেকে রিমন হোসেনের ক্রসে পা ছোঁয়াতে পারেননি অফসাইড ফাঁদ ভেঙে জায়গা করে নেওয়া ডরিয়েলটন। ১৩ মিনিটে রবিনহোর সঙ্গে বল দেওয়া নেওয়া করে বক্সে ঢুকে গড়বড় পাঁকিয়ে ফেলেন এই স্ট্রাইকার। তার ডানপায়ের শট পোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে যায়। দুই মিনিট পর ফের হতাশ করেন ডরিয়েলটন। বক্সের ভেতর মোরসালিনের আলতো পাসে ডরিয়েলটনের শট লক্ষ্যে থাকেনি। তবে ১৮ মিনিটে ঠিকই কাজের কাজটি করেন তিনি। মোরসালিনের কাছ থেকে বল পেয়ে মিগেল নিঁখুত থ্রু ঠেলে দেন বক্সে থাকা ডরিয়েলটনকে। বক্সের ডান দিক থেকে তার ডানপায়ের শট রোখার সাধ্য ছিলো না মোহামেডান কাস্টডিয়ান সুজন হেসোনের। পিছিয়ে পড়ে মোহামেডান চেষ্টা করেছে ম্যাচে ফেরার। তবে সেভাবে গোঁছাতে পারেনি তারা। বারবার বল হারিয়েছে মাঝমাঠে। ২১ মিনিটে অবশ্য উজবেক প্লে-মেকার মোজাফফরভের ভয়ঙ্কর হতে থাকা একটি ফ্রি-কিক শেষ পর্যন্ত পোস্ট উঁচিয়ে বাইরে যায়। ৩৯ মিনিটে মোজাফফরভ বক্সের অনেক বাইরে থেকে ডান পায়ের বাঁকানো শটে পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন বসুন্ধরা গোলকিপার মেহেদী হাসান শ্রাবনকে। একটু অপ্রস্তুত থাকলেও শেষ পর্যন্ত তার পাঞ্চ করে রুখে দেন বসুন্ধরার তরুণ গোলকিপার। ফলে এগিয়ে থাকার স্বস্থি নিয়ে বিরতিতে যায় বসুন্ধরা।
দ্বিতীয়ার্ধে দু'টি পরিবর্তন করে মোহামেডান কোচ আলফাজ আহমেদ চেয়েছেন মাঠে ফিরতে। মঙ্গলবার ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনালের নায়ক শাহরিয়ার ইমন আসেন মানিক মোল্লার জায়গায়। আর রাইট উইঙ্গার আরিফ হোসেন মাঠে আসেন কামরুলের বদলী হিসেবে। তাতে তাদের খেলায় গতি আসে। আক্রমণও হয় গোঁছালো। তবে রক্ষণে এই চাপের মাঝেই ৫২ মিনিটে ব্যবধান বাড়ায় বসুন্ধরা।
শেখ মোরসালিনের কর্নারে একেবারের ফাঁকা হয়ে পড়া ডরিয়েলটন হেডের আনুষ্ঠানিকতা সেড়ে লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মোহামেডান অধিনায়ক সুলেমান দিয়াবাতেকে ছুঁয়ে ফেলেন। দু'জনের গোল হয় সমান ১৩। এরপর থেকেই মোহামেডান জোড় চেষ্টা চালিয়েছে। ৬৪ মিনিটে অনেক দূর থেকে মোজাফফরভ ফ্রি-কিক থেকে সরাসরি গোলের চেষ্টা করে আবারও ব্যর্থ হন। পরের মিনিটে আরিফের আড়াআড়ি শট কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন শ্রাবন। দুই মিনিট পর অসাধারণ গোলে মোহামেডানের ব্যবধান কমান প্রথমপর্বে বসুন্ধরাকে হারানোর নায়ক মিনহাজ রাকিব। প্রথমে সানডের সঙ্গে বল দেওয়া নেওয়া করেন। এরপর বক্সের মাঝখান দিয়ে আক্রমনে উঠতে শাহরিয়ার ইমনের সঙ্গে ওয়ান টু করে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়ান এই মিডফিল্ডার। ৭০ মিনিটে সমতায় ফেরার সেরা সুযোগ নষ্ট করে মোহামেডান। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে অনেকটা এগিয়ে আড়াআড়ি পাস বাড়ান ফাঁকায় থাকা শাহরিয়ার ইমনকে। শ্রাবনকে একা পেলেও ইমনের শট গিয়ে আঘাত করে শ্রাবনের শরীরে। ফিরতি বলে মোজাফফরভের শট ব্লক করেন তপু বর্মণ। বড় বাঁচা বেচে যায় বসুন্ধরা। ম্যাচের ৮০ মিনিটে মিনহাজ রাকিবের ডিফেন্সচেড়া পাস ডান দিকে ধরে কোনাকুণি শট নিয়েছিলেন বদলী আরিফ। অল্পের জন্য দূরের পোস্ট গলে বাইরে যায় তা। ভালো একটা সুযোগ হাতছাড়া হয় মোহামেডানের। আর যোগ করা সময়ে শ্রাবন ইমান্যুয়েল সানডের প্রচেষ্টা রুখে দিয়ে কিংসের লক্ষ্যপূরণে রাখেন বড় ভূমিকা।
পাঁচ শিরোপায় দেশের ঘরোয়া ফুটবলের ইতিহাসে বসুন্ধরা কিংস এখন লিগজয়ীদের তালিকায় উঠে এসেছে চার নম্বরে। সর্বোচ্চ ১৯টি লিগ শিরোপা জিতেছে মোহামেডান। ১৭ শিরোপায় দুইয়ে আবাহনী। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জিতেছিল সাত শিরোপা। পাঁচটি করে শিরোপা বসুন্ধরা ও বারবার নাম বদলানো বিজেএমসি'র।