সহ-অধিনায়ক হয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছেন চোটে পড়া তাসকিন

খুব বড় কোনো চমক নেই, নেই বাড়তি উত্তেজনাও। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপের জন্য যে বাংলাদেশ দলটা ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, তাতে খবর বলতে সাইফউদ্দিনের না থাকা। সেটাও আঁচ করা গিয়েছিল জিম্বাবুয়ের কাছে ম্যাচটা হারের পরই। চমক বলা যায় তানভির ইসলামের দলে থাকা। মাত্র ৪ ম্যাচের ক্যারিয়ার, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ২ উইকেট...এমন পরিসংখ্যান নিয়ে আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশগুলোর কেউ হয়তো দলে থাকবেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত দলগুলোয় এই মানদ-ে কেউ বিশ্বকাপ দলে আসবেন না, সেটা নিশ্চিত।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল চূড়ান্ত করার শেষ দিনটি হচ্ছে ২৪ মে মাঝ রাত পর্যন্ত। ঘড়ির কাঁটা ১২টা পার করে তারিখটা ২৫ মে হলেই কোনো পূর্ব অনুমতি ছাড়াই দলের সদস্য পরিবর্তনের সুযোগ শেষ। এরপর স্কোয়াডে থাকা চোটগ্রস্ত কোনো খেলোয়াড়কে পরিবর্তন করে নেওয়া যাবে আইসিসির টেকনিক্যাল কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে। তবে শেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় না থেকে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ২০ দলের মধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বাদে সব দেশই নিজেদের বিশ্বকাপ দল জানিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই। বাংলাদেশ দল ঘোষণার ক্রমে ১৯তম, বাকি আছে শুধু পাকিস্তান। খুব সম্ভবত আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে গতকাল টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষ হওয়ার পর আজকালের ভেতর তারাও দল ঘোষণা করে দেবে। বাংলাদেশের আগে যে ১৮টি দেশ তাদের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করেছে, সেই ঘোষণা কার্যক্রমের মাঝেও ছিল চমক। ভারতের টি-টোয়েন্টি দল ভেসে উঠেছিল বুর্জ খলিফায়, নিউজিল্যান্ডের দল ঘোষণা করেছে দুই শিশু, শ্রীলঙ্কার দল ঘোষণায় একে একে করে ক্রিকেটারদের নাম প্রকাশ করেছেন দেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভক্তরা। বাংলাদেশের দল ঘোষণাও হয়েছে চিরন্তন সংস্কৃতি মেনেই। সূচিতে ১২-৩০ মিনিটে সংবাদ সম্মেলন শুরুর কথা থাকলেও সেটা পিছিয়ে হয়েছে ১-২০ মিনিটে। সংবাদ সম্মেলনকক্ষে প্রবেশ নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করে প্রবেশপথে সাংবাদিকদের নাম ও প্রতিষ্ঠানের নাম নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত অনাহুতদের প্রবেশ ঠেকানো যায়নি। আসন ও খাবার দুটোরই তাতে ঘাটতি অবধারিত।

তবে এত কিছুর পর যেটা হয়েছে, সেটা মন্দ হয়নি। গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটি, যেখানে হান্নান সরকার এবং আব্দুর রাজ্জাকও আছেন; তিনজন মিলে একসঙ্গে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে দল ঘোষণা করেছেন। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ধৈর্য ধরে। সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার পেছনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন তাসকিনকে সহ-অধিনায়ক করার সিদ্ধান্তটা বোর্ডের হলেও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘এটা বিসিবির সিদ্ধান্ত। সে একটা জেনারেশনের উদীয়মান ক্রিকেটার। দীর্ঘদিন ধরে সে ভালো করছে একটা বিভাগে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাসকিনকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’ তার চোট এবং খেলার সম্ভাবনা ও আশঙ্কাা নিয়ে বলেছেন, ‘একটা জিনিস ঘটার পর মনে হয়, আমরা নিজেরাও আক্ষেপ করেছি এড়ানো যেত। আসলে আমাদের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো সাজেশন ছিল না। শেষ ম্যাচের আগে আমরা টিম ম্যানেজমেন্টকে কিছু বলিনি। হয়তো এড়ানো যেত। সবই ভাগ্যের লিখন। যদি সে খেলতে না পারে, তাহলে বিসিবি তাদের নজরে আনবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এই মুহূর্তে আমি পরিষ্কার উত্তর দিতে পারছি না। যদি তিনি কোনো কারণে না খেলেন, তবে তার পরিবর্তে অন্য কাউকে দেওয়া হবে। সাইফউদ্দিনকে দলে না নিয়ে তানজিম হাসান সাকিবকে বেছে নেওয়ার ব্যাপারে বলেছেন, ‘সাকিবকে শ্রীলঙ্কা সিরিজেও আমরা দেখেছি। তার একাগ্রতা, মাঠে দেওয়ার চেষ্টা, সেটা সাইফউদ্দিনের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রেখেছে। আমরা যে কারণে সাইফউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম যে ডেথ ওভারে ইয়র্কার করা, সেটা ঘরোয়া ক্রিকেটে যেমন ছিল তার চেয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একটু ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। তাই আমরা একটু ভিন্ন চিন্তা করেছি। ৩০ তারিখে যে দলটা দিয়েছিলাম, সেখান থেকে একমাত্র এ জায়গাটাতেই পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের আসলে সাইফউদ্দিন ও সাকিবের সঙ্গেই দ্বন্দ্ব চলছিল।’

প্রশ্ন এসেছে লিটন দাসের ফর্ম নিয়ে, সৌম্য সরকারকে অলরাউন্ডারের ভূমিকায় কতটা কার্যকরভাবে দেখা যাবে, এসব অনেক কিছু নিয়েই। সঙ্গে প্রত্যাশা কমিয়ে রাখতে অধিনায়কের আহ্বান কতটা যুক্তিসংগত, এমন প্রশ্নেও সুন্দর ব্যখ্যা দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক, ‘দেশের ক্রিকেটে বিশাল উন্মাদনা আছে। সব সময় দেখেছি, যখনই খেলা হয়, তখন গ্যালারি ভর্তি থাকে। এখন তা আরও বেড়েছে। এটা অধিনায়ক বুঝতে পেরেছেন। তিনি একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন যে টি-টোয়েন্টিতে আমরা এখনই ওই পর্যায়ে চলে যাইনি যে ফাইনালে খেলা। উনি বাস্তব শক্তির আলোকে এটা বোঝাতে চেয়েছেন যে টুর্নামেন্টে ধাপে ধাপে বাংলাদেশ এগোতে চেয়েছে। উনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন।’

দলে চার পেসার, দুজন ডানহাতি আর দুজন বাঁহাতি। স্পিনারও চারজন; দুজন বাঁহাতি স্পিনার, একজন লেগস্পিনার ও একজন অফস্পিনার। পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে কাজে লাগানো যাবে সৌম্যকেও। উইকেটরক্ষক দুজন, লিটন এবং জাকের আলি অনিক। উদ্বোধনী জুটিতে সৌম্য-লিটনের কেউ একজন খারাপ করলে বিকল্প তানজিদ হাসান তামিম। সব মিলিয়ে বেশ ভারসাম্যপূর্ণ দল। অভিজ্ঞতা, তারুণ্য, বৈচিত্র্য সবই আছে। ২০২২ সালের সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দল থেকে একেবারেই বাদ গেছেন ইয়াসির আলি, নুরুল হাসান সোহান, এবাদত হোসেন, নাসুম আহমেদ, মেহেদি হাসান মিরাজ, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। আফিফ হোসেন এবং হাসান মাহমুদও ছিলেন ২০২২-এর বিশ্বকাপ দলে, এবার তারা যাচ্ছেন ট্রাভেলিং রিজার্ভ হিসেবে। আগের আসরের ৮ জন দুই বছরের মাথায় দলের বাইরে, অধিনায়ক থেকে শুরু করে প্রধান কোচ এবং সাপোর্ট স্টাফদের তালিকাও বদলে গেছে। এত সব পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভাগ্যটাও যদি বদলায়!

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দল

নাজমুল হোসেন (অধিনায়ক), তাসকিন আহমেদ (সহ-অধিনায়ক), লিটন দাস, সৌম্য সরকার, তানজিদ হাসান, সাকিব আল হাসান, তাওহীদ হৃদয়, মাহমুদউল্লাহ, জাকের আলী, তানভীর ইসলাম, মেহেদি হাসান, রিশাদ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, শরিফুল ইসলাম, তানজিম হাসান।

রিজার্ভ : হাসান মাহমুদ, আফিফ হোসেন।