বিজেপির ২৭২ এবার অনেক দূর!

ভারতে এবারের লোকসভা নির্বাচন শুরুর আগে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্লোগান দিয়েছিলেন ‘আব কি বার চারশো পার’ অর্থাৎ বিজেপি জোট এবার চারশো আসন অতিক্রম করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু সাত দফার নির্বাচনে চার দফার ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন বিজেপি নেতারাও সে কথা মুখে আনছেন না। বিরোধী ইনডিয়া জোট প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছে বিজেপির আসনসংখ্যা দুশোরও নিচে নেমে আসবে!

ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরাও মোটামুটি একমত যে প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বে বিজেপি জোট এখনো অবশ্যই এগিয়ে। তবে এপ্রিল মাসে ভোট শুরুর আগে যে অবস্থা ছিল তা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে চারশো তো দূরের কথা, গত নির্বাচনে এককভাবে বিজেপি যে ৩০৩টি আসনে জিতেছিল, এবার সেটা ধরে রাখাও তাদের পক্ষে খুবই কঠিন হবে। এমনকি একক গরিষ্ঠতা পেতেও হয়তো তাদের বেগ পেতে হতে পারে। অর্থাৎ লোকসভায় মোট ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৭২টি আসনে জেতাটাও সহজ হবে না দলটির জন্য।

একই অবস্থা অবশ্য বিরোধী জোট ইনডিয়ারও। নানা কারণে তারাও সরকার গঠনের সম্ভাবনা থেকে এখনো অনেক দূরে। বিবিসি বলছে, এবারের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্য পূরণে কোনো চ্যালেঞ্জ আসতে পারে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও বিজেপি নেতারা তা ভাবতেও পারেননি। চার দফায় দেশের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসনে ভোট হয়ে যাওয়ার পর বিজেপি নেতাদের গলায় ভোটের আগে আত্মবিশ্বাসী সুর আর শোনা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি দেখে এখন মনে হচ্ছে বিজেপি জোটের পক্ষে গরিষ্ঠতা অর্জন করাই খুব মুশকিল। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে দেশটির শেয়ার বাজারে যে আকস্মিক পতন লক্ষ করা গেছে, সেটাকেও অনেকে এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন বলেই ব্যাখ্যা করছেন। বিজেপি কোনো কারণে গরিষ্ঠতা না পেলে তা বাজারে অস্থিরতা ডেকে আনবে, এই আশঙ্কা থেকেই বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ বা ‘নিফটি’তে দরপতন হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা অনেকে মনে করছেন।

মাস দুয়েক আগে তফসিল ঘোষণার সময়ও যে নির্বাচনে বিজেপির নিশ্চিত জয় ভাবা হচ্ছিল হঠাৎ করেই সেই ভাবনা বদলে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, এই নির্বাচনেও অবাক করার মতো ফল হতে পারে। কিন্তু কেন আর কীভাবে সেই অবস্থার বদল হলো তার পাঁচটি কারণ বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি। এই পাঁচ কারণ হচ্ছে রামমন্দিরের আবেদন মøান, কেজরিওয়াল প্রভাব, পশ্চিমবঙ্গে নতুন মোড়, সাত দফার দীর্ঘ নির্বাচন এবং কর্নাটক, বিহার ও মহারাষ্ট্রে নড়বড়ে জোট। 

রামমন্দিরের আবেদন ম্লান : গত ২২ জানুয়ারি অযোধ্যাতে ভেঙে ফেলা বাবরি মসজিদের জায়গায় নির্মিত নতুন রামমন্দিরে প্রধানমন্ত্রী মোদি যখন বিগ্রহের ‘প্রাণপ্রতিষ্ঠা’ করেন, সে রকম জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে খুব কমই হয়েছে। দেশের শাসক দল বিজেপি তখন খুব গর্বের সঙ্গে বলেছিল, তারা ক্ষমতায় ছিল বলেই চারশো বছরের পুরনো একটা ‘ঐতিহাসিক ভুল’-কে শুধরে নিয়ে হিন্দু দেবতা রামচন্দ্রকে তার জন্মস্থলে সসম্মানে অধিষ্ঠিত করা গেল। বস্তুত বহু বছর ধরে বিজেপির যে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা কাশ্মীরের বিশেষ স্বীকৃতি বিলোপ, অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা ও ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা এর মধ্য দিয়ে তার দুটির কাজ শেষ হয়ে গেল, এটাও বলার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু সেই ঘটনার তিন-চার মাসের মাথায় এসেই দেখা যাচ্ছে, রামমন্দির কিন্তু দেশের নির্বাচনে সেভাবে আর সাড়া ফেলতে পারছে না।

দিল্লিতে তরুণ গবেষক ও সাংবাদিক অয়নাংশ মৈত্রর মতে, রামমন্দিরকে আসলে বিজেপি ‘নির্বাচনী ইস্যু’তে পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছে। মন্দির চালু হওয়ার পর অযোধ্যায় তীর্থযাত্রা বা পর্যটন বাড়াতে অর্থনীতি লাভবান হতে পারে, কিন্তু ভোটের বাক্সে তা বিশেষ ফারাক তৈরি করবে বলে মনে হয় না।

কেজরিওয়াল প্রভাব : নির্বাচনের বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই রাজ্যে রাজ্যে অজস্র বিরোধী নেতার বাড়িতে বা দপ্তরে ইডির মতো এজেন্সিগুলো হানা দিয়েছে, অনেককে আটক করা হয়েছে।  ঝাড়খন্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও তুলে নিয়ে গিয়ে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তবে গত ২১মার্চ দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে গ্রেপ্তার করার পর এই ইস্যুটি একটি নাটকীয় মাত্রা পায়। আম আদমি পার্টির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি কংগ্রেসও রাজপথে আন্দোলনে নামে। রাহুল গান্ধী থেকে মমতা ব্যানার্জি বা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী স্টালিন বিরোধী শিবিরের স্তম্ভরা সবাই তীব্র নিন্দায় সরব হন। এ অবস্থায় দিল্লির সাতটি আসনই বিজেপির দখলে হলেও কংগ্রেস-আপ জোট বেঁধে লড়াই যা ধরে রাখা বিজেপির পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে খেলা ঘুরে গেছে : এবারের লোকসভা নির্বাচনে নিজেদের আসনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য বিজেপি বিশেষ করে যে রাজ্যগুলোকে নিশানা করেছিল, তার মধ্যে একেবারে প্রথমেই ছিল পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু নির্বাচন শুরুর ঠিক আগেও পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন ছিল এখন প্রায় রাতারাতি কিন্তু সেই অবস্থা অনেকটাই পাল্টে গেছে। আর এর পেছনে কাজ করেছে তিনটি ফ্যাক্টর সন্দেশখালিতে নারী নির্যাতন নিয়ে একের পর এক স্টিং অপারেশনের ভিডিও ফাঁস, স্কুলে হাজার হাজার বেআইনি শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে আদালতের রায় এবং সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের রুল জারি। কিন্তু সন্দেশখালিতে নারীদের ওপরে ধর্ষণ আর নির্যাতনের অভিযোগ যে সাজানো ছিল সেটি ফাঁস হয় সেখানকার এক বিজেপি নেতার ভিডিওতে। ফলে বিজেপিও এখন সেটি আর সামনে আনছে না। রাজ্যের ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীর চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনাও খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো বড় ঘটনা। হাইকোর্ট তাদের সবার নিয়োগ বাতিল করে দিলে চাপে পড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সরকার। বিজেপিও বিষয়টি নেয় লুফে। তবে  শেষমেশ সুপ্রিম কোর্টে  হাইকোর্টের রায়ের ওপরে স্থগিতাদেশ দেওয়ায় আপাতত স্বস্তি ফিরেছে বিরোধী শিবিরে। এই রাজ্যের খেলা পাল্টে যাওয়ার আরেক ফ্যাক্টর হলো সিএএ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বা বিজেপির অন্য নেতারাও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের সুফল তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন ভোট ঘোষণার আগে থেকেই। তারা মনে করেছিলেন এই আইনটা হবে তাদের পক্ষে একটা ‘গেম চেঞ্জার’। তবে আইন যখন চালু করা হলো ভোট ঘোষণার ঠিক আগে, তারপর দেখা গেল একজনও সেই আইন অনুযায়ী আবেদনই করলেন না!

সাত দফার দীর্ঘ নির্বাচন : ভারতের নির্বাচন কমিশন যখন টানা প্রায় দেড় মাস ধরে সাত দফার সুদীর্ঘ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে, ক্ষমতাসীন বিজেপি সেই পদক্ষেপের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদি বা অমিত শাহ-জে পি নাড্ডার মতো দলের তারকা প্রচারকরা এর ফলে সারা দেশে ঘুরে ঘুরে অজস্র জনসভা আর রোড শো করার সুযোগ আর সময় পাবেন, তখন এটাই ছিল দলের প্রাথমিক ক্যালকুলেশন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যত ভোট এগোচ্ছে, দেশে তাপপ্রবাহও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এবং ভোট পড়ার হারও গতবারের তুলনায় অনেক কম হচ্ছে। এখন এই কম ভোট পড়ার হার ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যাবে, না কি বিপক্ষে সেটা বলা খুব মুশকিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি বা বিজেপির পক্ষেও যে খুব উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিতে মানুষ এগিয়ে আসছেন না সেটা দলের নেতাদের কাছেও স্পষ্ট। কিংবা হয়তো দলের সমর্থকরাও অনেকে ভাবছেন বিজেপি তো জিতেই বসে আছে, আমি ভোট দিতে না গেলেও বা কী এসে যায়!

তিন রাজ্যে নড়বড়ে জোট : এবারের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি শেষ পর্যন্ত গতবারের তুলনায় কীরকম ফল করে, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে নির্দিষ্ট কয়েকটি রাজ্যের ওপর। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মহারাষ্ট্র, কর্নাটক ও বিহার। গত নির্বাচনে বিজেপি জোট কর্নাটকে ২৮টির মধ্যে ২৫টি, মহারাষ্ট্রে ৪৮টির মধ্যে ৪১টি ও বিহারে ৪০টির মধ্যে ৩৯টি আসন জিতেছিল। ভারতে প্রবীণ সাংবাদিক রাজদীপ সারদেশাইয়ের মতে, মহারাষ্ট্র হলো এবারে গোটা দেশের প্রধান ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট’ অর্থাৎ ওই রাজ্যটিতেই বিজেপি জোটের সঙ্গে বিরোধীদের সবচেয়ে কঠিন লড়াই হচ্ছে। কিন্তু বিজেপি যেভাবে মহারাষ্ট্রে অন্য দলগুলোকে ভাঙিয়ে সরকার গড়েছে এবং রাজ্যে বিজেপি ও তার জোটসঙ্গীদের যা পারফরম্যান্স তাতে রাজ্যের মানুষ এবারে তাদের ওপর কতটা ভরসা রাখবেন আমি নিশ্চিত নই।

কর্নাটকে ভোটের মাঝপথে যেভাবে বিজেপির জোটসঙ্গী জনতা দল (সেকুলার)-এর নেতা প্রাজ্জ্বল রেভান্নার ‘সেক্স ভিডিও’ ফাঁস হয়েছিল এবং অভিযোগ উঠেছিল বিজেপি নেতৃত্ব সব জেনেশুনেও ওই দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন সেটাও দলের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেনি। রাজস্থানেও রাজপুতদের মধ্যে বিজেপি-বিরোধী ক্ষোভের আঁচ এবার ভালোই মিলেছে, যার প্রভাব পড়তে পারে আসন সংখ্যাতেও। ফলে দেশে এ রকম অন্তত তিন-চারটি বড় রাজ্য আছে, যেগুলোকে রাজনৈতিক প-িতরা বিজেপির জন্য লোকসানের খাতাতেই ধরছেন। তবে এত হিসাব-নিকাশের পরও বিজেপি জোট প্রতিপক্ষ ইনডিয়া জোটের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে এটা অবশ্য বিশ্লেষকরা কেউই বলছেন না। কিন্তু নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি যারা খুব খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন, তারা অনেকেই ধারণা করছেন বিজেপির জন্য ২৭২-এর ম্যাজিক নম্বরে পৌঁছানোটাও হয়তো শেষমেশ বেশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।