দেশে থাকতে অটোরিকশা চালাতেন দিনাজপুরের শমসের আলী। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালোই চলছিল তার সংসার। অটোরিকশা চালিয়ে যা উপার্জন করতেন দৈনন্দিন খরচেই তা শেষ হয়ে যেত। সঞ্চয় করার মতো কিছুই থাকত না। তাই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদি ভাগ্য বদলায়! ২০২২ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় এক দালালের সহযোগিতায় সৌদি আরবে যান। সৌদিতে যেতে তার খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। এনজিও থেকে এবং জমি বন্ধক রেখে এ টাকা জোগাড় করেন তিনি।
সৌদিতে গিয়ে জানতে পারেন তার নির্দিষ্ট কাজ নেই। আর আকামার মেয়াদ মাত্র তিন মাস। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। বিষয়টি গোপন রেখে গাড়ি পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি আরও কিছু কাজ করে মাসিক ৬০০ রিয়াল (১৮,০০০ টাকা) আয় করতেন। হঠাৎ সৌদি পুলিশের হাতে আটক হন। কারণ তার আকামার মেয়াদ শেষ। কিছুদিন জেল খেটে গত বছর শূন্য হাতে বাড়ি ফেরেন। শমসেরের জীবনের গল্প হাজারো অভিবাসীর।
অভিবাসনব্যয় কমাতে শ্রমবাজার-সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) চুক্তি আছে বাংলাদেশের। সে অনুযায়ী দেশভেদে বিদেশে যাওয়ার খরচ নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। তবু দালাল, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে আর কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির কারণে অভিবাসনব্যয় বাড়ছে। ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়ছে না।
অভিবাসন খাত-সংশ্লিষ্টরা বিদেশে শ্রমিকের নিয়োগব্যয় সহনীয় করতে শূন্য অভিবাসনব্যয়ের (জিরো মাইগ্রেশন কস্ট) দাবি জানাচ্ছেন। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে অভিবাসনব্যয় আকাশচুম্বীই রয়ে গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রবাসী কর্মীদের অভিবাসনব্যয় বিষয়ে শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, অভিবাসী ব্যক্তির গড় নিয়োগব্যয় জাতীয় পর্যায়ে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৬৭ টাকা। গড়ে পুরুষ অভিবাসীদের নিয়োগব্যয় ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৩১০ টাকা। পুরুষদের তুলনায় নারী অভিবাসীদের ব্যয় কিছুটা কম। গড়ে নারী কর্মীদের ব্যয় হয় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪২২ টাকা। জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের নিয়োগব্যয় তুলতে সময় লাগে ১ বছর ৬ মাস। আর নারীদের ক্ষেত্রে সময় লাগে ৭ থেকে ৮ মাস।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিবাসনব্যয় কমানোর কিছু পদ্ধতি আছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেগুলো করা হয় না। পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, মেডিকেল ফিসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশগামী শ্রমিকদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেও অভিবাসনব্যয় বাড়ছে। এসব সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন। তাদের নেওয়া ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। ক্রমশ বাড়ছে অভিবাসনব্যয়, তুলনায় আয় কম।’
আইএলওর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যে কর্মী নিয়োগ দেবে তার বিমান ভাড়া ও ভিসা খরচ দেওয়ার কথা, আর শ্রমিক দেবেন যাওয়ার আগে দেশের ভেতরের খরচ। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। সব খরচই শ্রমিককে দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর যেতে সবচেয়ে বেশি ৪ লাখ ৩২ হাজার ৬৭৩ টাকা খরচ হয়। সেখানে মাসিক গড় আয় ৩৮ হাজার ১০৮ টাকা। সৌদি আরবে যেতে লাগে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ২১০ টাকা; সেখানে গড় মাসিক আয় ২৪ হাজার ৯৫৭ টাকা। কাতারে যেতে খরচ পড়ে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫৮ টাকা, গড় মাসিক আয় ২৫ হাজার ৭৮২ টাকা। মালয়েশিয়া যেতে খরচ পড়ে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮৪৮ টাকা, সেখানে গড় মাসিক আয় ২৮ হাজার ৮২২ টাকা। সব থেকে কম খরচ পড়ে ওমানে যেতে : ৩ লাখ ১৯ হাজার ৬৭৭ টাকা। সেখানে মাসিক গড় আয় ২১ হাজার ৮৭৮ টাকা। অথচ এসব দেশে সরকারনির্ধারিত অভিবাসনব্যয় ১ লাখ ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
২০২০ সালে দেশের ৮ হাজার অভিবাসীর পরিবারের ওপর করা বিবিএসের জরিপ বলছে, বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে অভিবাসীরা যে খরচ করেন, তার অধিকাংশই আসে ঋণের উৎস থেকে। ৮১ শতাংশ পুরুষকর্মী অভিবাসনব্যয় মেটাতে ঋণ করেছেন, আর নারীকর্মীদের ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ ঋণ করেন। গড়ে ২১ শতাংশ কর্মী নিয়োগব্যয় মেটানোর জন্য ঋণ করেননি।
ঋণ করার ক্ষেত্রে অর্থের উৎসে দেখা যায়, বন্ধু-আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ, এনজিওর ঋণ ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, মহাজনি ঋণ ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। জমি বন্ধক রেখে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ লোক টাকা জোগাড় করেছেন।
বিবিএসের ওই জরিপ বলছে, অভিবাসী কর্মীদের ঋণ পরিশোধ না করার ব্যর্থতায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। ১২ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষকর্মী ঋণ নেওয়ার পর টাকা ফেরত দিতে না পারায় তাদের সম্পত্তি বা জামানতের মালিকানা হারিয়েছেন। নারীকর্মীদের ক্ষেত্রে এ হার ১৬ শতাংশ। বেশিরভাগ নারীকর্মী বিদেশ যাওয়ার পরও তাদের ঋণের টাকা শোধ করতে পারেন না। এর কারণ অধিকাংশ নারীকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরেন। তারা শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন কর্মসূচির (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিবাসন খরচ বাড়ার প্রধান কারণ ভিসাবাণিজ্য। দেশের বেশ কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি অভিবাসনব্যয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত। তাদের খপ্পরে পড়ে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘একজন মানুষ পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে বিদেশ গেলে, অর্থের বড় একটি অংশ বিদেশে চলে যায়। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে কিছু কোম্পানি নামে-বেনামে কর্মী নেওয়ার কথা বলে ভিসা বিক্রি করে। সে ভিসা কিনে কিছু এজেন্সি। এর প্রভাব পড়ে বিদেশগামীদের ওপর।’
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘একজন মানুষ যদি বিদেশ যাওয়ার জন্য ভিটেমাটি বিক্রি করে, তাহলে তার লাভটা কী? আমরা বিদেশ যাওয়ার খরচ কমানোর চেষ্টা করছি। যাতে একজন গরিব লোক বিদেশে গিয়ে কাজ করে পরিবারকে সহযোগিতা করতে পারেন।’