গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিএনপির বিভিন্ন স্তরে হতাশা থাকলেও সেটা প্রকাশ না করে দেশটির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কই বজায় রাখতে চায়। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নানামুখী তৎপরতা চালিয়েছে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক নানা প্রেক্ষাপটে হয়তো তারা চূড়ান্তভাবে সফল হতে পারেনি। তবে নির্বাচন ও মানবাধিকার ইস্যুতে তাদের অবস্থান বদলায়নি। আগামী দিনেও তারা তাদের ভূমিকা রেখে যাবে।
বিএনপি মনে করছে, কোন দেশের সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রা কেমন হবে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের নিজস্ব কূটনৈতিক পলিসির বিষয়। তবে তারা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে নানামুখী তৎপরতার মধ্য দিয়ে যে আশার বীজ বপন করেছে, তা থেকে তারা পিছপা হবে না এমনটাই প্রত্যাশা বিএনপির।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদী অর্থনীতির দেশ হলেও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও বটে। বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে তাদের অবস্থান মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে। কাজেই ডোনাল্ড লুর এবারের সফর নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই। ডোনাল্ড লু তার আলোচনায় এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র উত্তরণের যে সংগ্রাম, সে গণতন্ত্রের নীতিতে তারা অবিচল।’
দলটির নেতারা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগে যুক্তরাষ্ট্রের দৌড়ঝাঁপে বিএনপিতে একধরনের পরিবর্তন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। দলটি মনে করেছিল, র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নির্বাচন নিয়ে ভিসানীতি প্রয়োগ, শর্ত ছাড়া সংলাপের আহ্বানসহ অবাধ, শ্রম আইনের ডিক্রি জারি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়বে। বিএনপি নেতাকর্মীদের কথায়ও এমন মনোভাবের বিষয়টি তখন ফুটে উঠেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন হতে দেখা যায়নি। নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড লু’র সফরে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সরকারকে নানা পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকটা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সরকার গঠিত হয়। বিএনপির প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের হতাশ হতেও দেখা যায়।
সেই ভোটের প্রায় চার মাস পর ফের ঢাকায় সফর করেছেন ডোনাল্ড লু। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে লু’র সফর নিয়ে বিএনপির যে উচ্ছ্বাস ছিল, এবার তার বিন্দুমাত্র দেখা যায়নি। বরং এ সফরের বিষয়টি দলটির দায়িত্বশীল নেতারা সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কৌশল নিয়েছেন।
লু’র সফর প্রসঙ্গে বিএনপির বিদেশবিষয়ক কমিটির একাধিক নেতারও ভাষ্য হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের আগে সংলাপ ইস্যুতে ডোনাল্ড লু’র ভূমিকায় হতাশ বিএনপি। দলটির দায়িত্বশীল নেতারাও মনে করেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। ফলে যুক্তরাষ্ট্র শেষ সময়ে ধীরে চলেছে। নির্বাচনের আগে কোনো পদক্ষেপ বা নিষেধাজ্ঞার মতো কোনো ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসেনি।
নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য সমমনা ও শরিক দলসহ ভোট বর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করছে বিএনপি। তবে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অত্যন্ত কম হওয়ায় বিএনপির ভোট বর্জনের রাজনীতি সফল হয়েছে বলে দলটির শীর্ষ মহল মনে করে।
সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির শরিকদের সঙ্গে চার দিন ধরে ধারাবাহিক বৈঠকে একাধিক জোটনেতা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মার্কিনিদের ভূমিকার বিষয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন সামনে রেখে মার্কিন ভিসানীতি ঘোষণার পর জোটনেতাদের প্রত্যাশা ছিল, একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিতে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। অভিন্ন দাবিতে পরিচালিত যুগপৎ আন্দোলনে সেটা সহায়ক শক্তি হিসেবে থাকবে। কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত চুপ ছিল। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও প্রত্যাশা না রাখার পরামর্শ এসেছে বলে জানা গেছে।
তবে লু’র সাম্প্রতিক সফল নিয়ে বিএনপির মূল্যায়ন হচ্ছে, এবার তার যে কর্মসূচি, সেটি হয়তো বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই নির্ধারণ করা হয়েছে। লু’র সফর নিয়ে তাই বিএনপির শীর্ষ নেতারা কৌশলী বক্তব্য রেখেছেন। গত রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘তার (লু’র) আগমন নিয়ে আমরা কেউ ইন্টারেস্টেড (আগ্রহী) নই। আমাদের ভরসা জনগণের ওপর, সেই আস্থার ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি।’
আগের দিন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমাদের কাছে লু অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
দলটির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে কিংবা পরে মার্কিনিদের ভূমিকা যাই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আগের মতো স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে নেবে বিএনপি। পিটার হাসের পরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ডেভিড মিল বাংলাদেশের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, তার সঙ্গে গভীর যোগাযোগ স্থাপন করা হবে।