ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের ঘোষণায় বাড়ে চাঁদার অঙ্ক

রাজধানীতে দিনের বেলায় অলিগলিতে থাকলেও সন্ধ্যার পর ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে আসে প্রধান সড়কে। যদিও দেশে এ যান চলাচলে রয়েছে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা। প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই চলে এ অবৈধ যান। এরই মধ্যে গত বুধবার ঢাকার দুই সিটিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ নির্দেশনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা কম দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগেও ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন লোকদেখানো পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। পরে আগের মতোই সড়কে এসব রিকশা চলতে দেখা গেছে। চালকদের ভাষ্য, তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই সড়কে এ যান চালাচ্ছেন। তবে বন্ধের ঘোষণা এলে চাঁদার রেট বেড়ে যায়। 

জানা গেছে, রাজধানীতে প্রায় দুই লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে।

এগুলোর জন্য একদিকে যেমন বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে অদক্ষ চালক ও বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রায়ই হচ্ছে দুর্ঘটনা। এসব যান নিয়ন্ত্রণে আছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ফলে এসব রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকেও অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, হাজারীবাগ, মগবাজার এবং মিরপুর এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিক্য বেশি। এসব জায়গায় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এসব যান। দিনপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার চুক্তিতে পাওয়া যায় ব্যাটারিচালিত রিকশা। অবশ্য রিকশাপ্রতি মাসে ২ হাজার টাকার মতো চাঁদা গুনতে হয়। 

হাজারীবাগ এলাকায় আবুল কালাম নামের এক চালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) গ্যারেজ থেকে দিনে ৪ থেকে ৫টি গাড়ি (ব্যাটারিচালিত রিকশা) মাত্র বের হয়েছে। রাতে আর কিছু রিকশা বের হবে। তবে অন্য সময় দিনের বেলায় ৫০টির বেশি গাড়ি বের হয়। আর রাতে তো সবাই বিভিন্ন জায়গায় চলে যায় গ্যারেজ থেকে বের হয়ে। কিন্তু বন্ধের ঘোষণা আসলে কয়দিন বন্ধ থাকে, পরে আবার বেশি টাকা দিয়ে ওপর মহল থেকে অনুমতি নিয়ে চালাতে হয়।’

মগবাজারের মধুবাগ এলাকায় মো. মান্না নামে এক চালক বলেন, ‘সরকার যখন বন্ধের ঘোষণা দেয়, এই সুযোগে যারা এসব নিয়ন্ত্রণ করে তারা প্রথমে কয়দিন বন্ধ রাখতে বলে। পরে চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া এই অটো চালিয়ে সংসার চলে। যদি না চালাতে পারি তাহলে সমস্যায় পড়ে যাব।’ 

এদিকে সোহরাব মিয়া নামে প্যাডেলচালিত এক রিকশাচালক জানান, সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা লেগে থাকে। এগুলোর জন্য তাদের আয় আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। মানুষ দ্রুত চলাচল করতে পারায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় উঠতে চায়। এজন্য একদিকে যেমন আয় কমেছে তাদের, অন্যদিকে এগুলোর জন্য মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনায় পড়তে হয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্ট যেখানে এই ব্যাটারিচালিত যান নিষিদ্ধ করেছে, সেখানে সড়কে কীভাবে চলছে? মূলত এই অবৈধ ব্যাটারিচালিত যান দিয়ে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হয়। সেজন্যই এটি বন্ধ হচ্ছে না। কিন্তু সরকারেরই উচিত দেশে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য এই বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত যানের জন্য সড়কে একদিকে যেমন বাড়ছে যানজট, তেমনি দুর্ঘটনার নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকেই এই ব্যাটারিচালিত রিকশা সড়কে বাড়ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করায় সড়কে বেড়েই চলেছে ব্যাটারিচালিত যান।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাটারি, মোটর আমদানি করার নিষেধাজ্ঞা না থাকায় দেশে এসব যান ঢুকে গেছে। তাদের সঙ্গে লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা এই যানগুলো থেকে হয়ে থাকে। মহাসড়কে এসব যান তো চলাচলের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। তবে সিটির বাইরে জেলা শহরে এবং মহাসড়কে সাইড রোডে স্বল্প দূরত্ব বাহন হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা যেত পারে মানবিক দিক বিবেচনায়। কিন্তু কোনোভাবেই সিটিতে চালানো যাবে না।’

দ্রুত সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকা শহর থেকে নির্মূল সম্ভব নয় : ঢাকা শহরে যে পরিমাণ ব্যাটারিচালিত রিকশা বেড়ে গেছে তা দ্রুত সময়ে নির্মূল করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক আহম্মেদ। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে হাইকোর্টের একটা নির্দেশনা ছিল। ট্রাফিক যেসব এলাকাতে থাকে সেসব এলাকাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা যাতে কোনোভাবে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে আমরা অনেক আগে থেকেই সচেষ্ট আছি। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে ট্রাফিক-তেজগাঁও বিভাগ আয়োজিত ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। 

মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার মূল উৎপত্তিস্থল চার্জিং পয়েন্ট এবং যেখানে গ্যারেজ আছে, যেসব ব্যক্তি এগুলোর সঙ্গে জড়িত সেসব ব্যক্তিরও তালিকা প্রণয়নের কাজ ইতিমধ্যে শুরু করা হয়েছে।