বিএনপি কীসের অপেক্ষায়

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এক দফা দাবির আন্দোলন শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের প্রচার অভিযানের মধ্য দিয়ে তখনকার মতো শেষ করেছিল বিএনপি। তাদের অনুসরণ করে সমমনা দলগুলোও। যদিও বিএনপি বলেছে, তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। কিন্তু নির্বাচনের পর কার্যত তেমন আন্দোলন কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে না দলটির। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, রাজপথে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর কর্মসূচি নেই কেন। কীসের অপেক্ষায় রয়েছে দলটি।

এমন আলোচনার কারণ, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো সরকারের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি করেছিল। তারা বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা জানিয়ে আসছিল। বিবৃতি, আলোচনা, ভিসানীতি ও শ্রমনীতি ঘোষণার মতো পদক্ষেপও নিয়েছে। তাদের এমন তৎপরতা বিএনপিকে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর তাদের দিক থেকেও আর সেই চাপ নেই; বরং যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথা বলছে। গত বুধবার বাংলাদেশ সফর শেষ করে যাওয়ার সময় মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু সামনে তাকানোর কথা বলে সেই বার্তাই দিয়েছেন।

লুর সফর নিয়ে বিএনপির হতাশা থাকলেও তা প্রকাশ না করে সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেছে দলটি।

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের পরে কালো পতাকা মিছিলসহ কয়েকটি কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। এরপর তীব্র তাপপ্রবাহ, রমজান ও ঈদের কারণে কর্মসূচি ছিল না। এখন নতুন করে রাজপথে কীভাবে আবার নামা যায়, শরিক দলগুলোর সঙ্গে সে বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা শেষে নতুন করে কর্মসূচি দেওয়া হবে। 

বিএনপি নেতারা যখন নতুন কর্মসূচি নিয়ে দলের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছেন, এমন পরিস্থিতিতে দলটির

তৃণমূল নেতাকর্মীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সমাবেশের জন্য তারা কয়েকবার ঢাকায় এসেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু দলের নেতৃত্ব আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। আন্দোলন করতে গিয়ে হামলা, মামলাসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। দল সেভাবে তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। আর্থিক ও মানসিকভাবে তারা বিপর্যস্ত। এখন নতুন করে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করলে সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।’

তারা বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে দলের দায়িত্বশীল নেতাদের অনেকেই রাজপথে ছিলেন না। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাদের ফোনে পাননি। কেন্দ্রীয় নেতারা পদ নেবেন। কিন্তু রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকবেন না তাহলে তৃণমূল নেতারা কেন রাজপথে নামবেন। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা মার খাবেন তা হবে না। শুধু তা-ই নয়, কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে চলেছেন বলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনেকেই অভিযোগ করেন। এসব কারণে দলের ওপর ক্ষুব্ধ কেউ কেউ উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। কেউ আবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন। বহিষ্কার করেও কোনো লাভ হবে না। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতারা লিয়াজোঁ করতে পারলে তারা কেন পারবেন না।’

উল্লেখ্য, সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় বিএনপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জন করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। যে কারণে ইতিমধ্যে শতাধিক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের এমন মনোভাবের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মসূচি ছিল না, সেটা ঠিক। তবে বাস্তবতা তো মানতে হবে। কারণ নির্বাচনের আগে ও পরে যেভাবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার ও মামলা করা হয়েছে, তাতে তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নির্বাচনের পর পর কারাগার থেকে অনেকেই বেরিয়ে এসেছেন। তবে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে তাদের সময় দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, এখন আলোচনা চলছে কীভাবে কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামা যায়। কোরবানির ঈদের আগে কর্মসূচি আসতে পারে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা রাগে-ক্ষোভে অনেক কথা বললেও কর্মসূচি ঘোষণা করলে অভিমান ভুলে রাজপথে নেমে আসবেন বলে তিনি মনে করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে রাজধানী ঢাকায় কয়েকটি মহাসমাবেশ করা হয়েছিল। সারা দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ঢাকায় এসেছিলেন। সরকারবিরোধী বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তারা আশায় বুক বেঁধে ছিলেন নির্বাচনের আগে একটা কিছু হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার নির্বাচন করে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে ফেলেছে। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কিছুই করতে পারেনি।’

আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সে তুলনায় কেন্দ্রীয় নেতারা কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এসব কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। চাইলেই এখন কর্মসূচি ঘোষণা করে সারা দেশের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সেই কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা কঠিন হবে।’

গত ২৭ জানুয়ারি দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, অবৈধ সংসদ বাতিলসহ এক দফা দাবি আদায়ে কালো পতাকা মিছিল করে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো।

সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছরের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ পন্ড হওয়ার পর বিভিন্ন মামলায় কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করা শুরু হলে আত্মগোপনে যান অধিকাংশ নেতা। টানা হরতাল-অবরোধের সময়ে এবং নির্বাচন চলাকালেও তাদের দেখা মেলেনি। এরপর আর তেমন কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি। ৮ মে থেকে শুরু হওয়া উপজেলা নির্বাচন সামনে রেখে ভোট বর্জনের দাবিতে জনগণের মাঝে কয়েক দিন লিফলেট বিতরণ করে বিএনপি। সর্বশেষ ১০ মে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মামলা প্রত্যাহারসহ কারাবন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করে দলটি।

দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ নির্বাচনের আগে ও পরে ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে রাজপথে থেকেছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সেভাবে পাওয়া যায়নি। স্বাভাবিক পরিবেশ থাকলে কর্মসূচিতে নেতাদের ভিড় লেগে যায়। মঞ্চে গরম গরম বক্তব্য দেন। দলের কঠিন সময়ে এসব নেতাকে দেখা যায় না; বিশেষ করে গত বছরের ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনের সমাবেশে স্টেজে ধারণ ক্ষমতার বেশি কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর থেকে তারা যে আত্মগোপনে গেলেন, পরে আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ 

ঢাকা সফর করে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ডোনাল্ড লু বলেন, ‘বাংলাদেশ সফরে এসে দুই দেশের জনগণের মাঝে পুনরায় আস্থা স্থাপনের চেষ্টা করছি। আমরা জানি, গত বছর বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অনেক টেনশন ছিল। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন (বাংলাদেশে) অনুষ্ঠানে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলাম। এতে কিছু টেনশন তৈরি হয়েছিল। আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সামনে তাকাতে চাই, পেছনে নয়। আমরা সম্পর্ক জোরদারের উপায় খুঁজে বের করতে চাই।’

ডোনাল্ড লুর এই বক্তব্যের সূত্র ধরে যুবদলের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার যে বক্তব্য তাতে মনে হয় না যুক্তরাষ্ট্র আর দেশে গণতন্ত্র ফেরাতে কোনো ভূমিকা রাখবে। তাই আগামী দিনে আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচি দিলে তাতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আন্দোলন করেছি। কিন্তু দলের হাইকমান্ড সেই আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি; বিশেষ করে দলের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্যরা বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী ভারত, চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ বিএনপির পক্ষে থাকলেও তারা সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী জেলা বিএনপির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে রাজধানী ঢাকায় কয়েকটি সমাবেশ করেছে দল। প্রতিটি সমাবেশে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মী অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু দল সমাবেশের ফসল তুলে আনতে পারেনি।’

২৮ অক্টোবরের সমাবেশের কথা উল্লেখ করে এই নেতা বলেন, সেদিন স্বাভাবিকভাবে বেশি আক্রমণের শিকার হন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। পরের দিন হরতাল ডাকার কারণে সারা দেশের যেসব নেতাকর্মী ঢাকায় এসেছিলেন, তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি। মূলত তখন থেকে তাদের ফেরারি জীবন যাপন করতে হয়েছে। অথচ জ্যেষ্ঠ নেতারাসহ ঢাকার নেতারা রাজধানী ঢাকায় জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেননি।’

বিএনপির কেন কোনো কর্মসূচি নেই, জানতে চাইলে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রমজান, ঈদ, তাপপ্রবাহের কারণে রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচি নেই। তা ছাড়া নির্বাচনের আগে ধরপাকড় যেমন চলেছে এখনো তেমনই চলছে। এর বাইরে ইতিপূর্বে বিভিন্ন মামলায় যাদের সাজা হয়েছে, তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও নিম্ন আদালতে জামিন নিতে গেলে তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কারাভোগের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত নেতাকর্মীরা। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় নেওয়া হচ্ছে। তবে শিগগিরই মাঠে নামার কাজ চলছে।’