জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলী ও পাথর্শী ইউনিয়নে টিসিবির পণ্য ক্রয়ের ফ্যামিলি কার্ড তৈরিতে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা (মেম্বার) অবৈধভাবে এসব টাকা আদায় করছেন বলে অভিযোগ নিম্ন আয়ের মানুষদের।
চিনাডুলী ইউনিয়ন পরিষদের টানা তিনবারের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং পাথর্শী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইফতেখার আলম ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেয় সরকার। এর আওতায় চিনাডুলী ইউনিয়নে ২ হাজার ৩০০টি এবং পাথর্শী ইউনিয়নে ২ হাজার ১৫০টি পরিবার এ সুবিধা ভোগ করছেন। গত মার্চ থেকে ওই তালিকার হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু হয়। সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, নতুন করে তালিকায় নাম ওঠাতে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে মেম্বাররা এসব টাকা তুলছেন। ওই টাকার কোনো রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। টাকা না দিলে তালিকায় না রাখার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
চিনাডুলীর ছোট দেলিরপাড় গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম (৪০) ফ্যামিলি কার্ডের তালিকায় নাম ওঠাতে গত কয়েক দিন ধরে চেয়ারম্যান-মেম্বারের কাছে ঘোরাঘুরি করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে কার্ড করতে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার দেলোয়ারের কাছে গেলে ৩০০ টাকা চান। গরিব মানুষ কৃষি কাজ করে সংসার চালাই। ৩০০ টাকা কোথায় পাব। পরে চেয়ারম্যান সালামের কাছে গেলে তিনি বলেন এসব কার্ডের হিসাব তার বউ দেখেন। পরে তার বউয়ের কাছে গেলে তিনিও কার্ড দিলেন না। অথচ চেয়ারম্যানের আত্মীয়-স্বজনরা এই কার্ড পাচ্ছেন।’
একই ইউনিয়নের আকন্দবাড়ি গ্রামের গৃহবধূ সাহিদা বেগম (৪৪) বলেন, ‘গত বছর আমি কার্ড পাইছি। এর মধ্যে মেলা টাকা এই কার্ডের পেছনে খরচ করছি। এখন আবার ৭০০ টাকা করে চাচ্ছেন চেয়ারম্যান-মেম্বার। টাকা না দিলে নতুন তালিকায় নাম দেবে না। এত টাকা দিতেও পারমু না, কার্ডও লাগব না।’
ঘোনাপাড়া গ্রামের হালিমা বেগম (৫৫) বলেন, ‘অনেক আগেই স্বামী মারা গেছে। বয়সের কারণে কাজকর্ম করতে পারি না। সবাই ৭০০ টাকা দিয়ে নতুন করে নাম লেখাচ্ছে। চেয়ারম্যানের বাড়ি গিয়েছিলাম। চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্যরা খারাপ ব্যবহার করে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।’
পাথর্শী ইউনিয়নের মহিষবাথান গ্রামের ষাটোর্ধ্ব মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ বয়সে তো কাজ করা সম্ভব না। টাকা দিয়ে নতুন করে নাম তোলা আমার পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না। কার্ড দিলে দেবে না দিলে নাই।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চিনাডুলী ইউপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেন উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে এমন একজনকে আমার সামনে নিয়ে আসেন। আমার বিরুদ্ধে কথা বলবে এমন মেম্বার আমি না।’ বলে ফোন রেখে দেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে চিনাডুলী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুস সালাম বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ষড়যন্ত্র করে এসব ছড়াচ্ছে। পুরো ইউনিয়নে প্রায় ২৩ হাজার ভোটার। বেশিরভাগ মানুষ হতদরিদ্র। কাকে রেখে কাকে দেব এমন অবস্থা। কারও কাছে টাকা চাওয়া হয়নি।’
পাথর্শী ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আলম বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড হালনাগাদের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। আরও যাচাই-বাছাই করে কার্ড দেওয়া হবে। টাকা নেওয়ার প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ওই তালিকা শুধু হালনাগাদ করা হচ্ছে। এখানে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। টাকা নেওয়ার বিষয়ে কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলে তদন্ত করে দেখা হবে।’