এক অক্লান্ত প্রেসিডেন্টের বিদায়

ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিসহ তার সঙ্গীরা মর্মান্তিকভাবে নিহতের  ঘটনায় ইরানজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এখন প্রস্তুতি চলছে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং তার অন্যতম সহচরদের দাফন কাফনের। শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শোক নেমে এসেছে। শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের নেতারা।

১৯৬০ সালের ১৪ ডিসেম্বর মাসে ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন ইব্রাহিম রাইসি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। এই সময় তিনি ইরানের বিচার বিভাগে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং মানবিক ভূমিকা পালন করেন যার কারণে সারা দেশে বিচারপতি হিসেবে তিনি প্রশংসিত হন। ২০১৪ সালে তিনি ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন এবং ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। 

এরপর রাইসি ইরানের মাশহাদ নগরীর ইমাম রেজা (আ.) এর মাজারের কাস্টোডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি মাজারে এমন কিছু কাজ করেন যা এর আগে কখনোই করা হয়নি। 

২০১৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ইব্রাহিম রাইসিকে দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের পরপর রাইসি দেশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অত্যন্ত প্রশংসনীয় সব উদ্যোগ নেন এবং নারীর অধিকার ও পারিবারিক সহিংসতা রোধের বিষয়ে বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেন। 

প্রধান বিচারপতি হিসেবে অত্যন্ত প্রশংসার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করার সময় রাইসির জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। মূলত এর মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় খুলতে শুরু করে। ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান প্রার্থী এবং এ সময় দেশ ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মুসলিম বিশ্বে তার কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ওই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির বিপরীতে তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে থাকেন। ২০১৭ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ভোট পান দুই কোটি ৩৫ লাখ এবং ইব্রাহিম রাইসি ভোট পান ১ কোটি ৫৭ লাখ। 

কিন্তু ২০২১ সালে তিনি দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন করতে এসে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০২১ সালে ৩ আগস্ট থেকে দেশের অষ্টম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি দায়িত্ব পালন শুরু করেন। 

নির্বাচিত হওয়ার পর রাইসি তার বক্তব্যে বলেন, আমি আমাদের প্রিয় দেশের মানুষের সেবা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমনকি যারা আমাকে ভোট দেয়নি, আমিও তাদের সেবক।

প্রেসিডেন্ট রাইসি যখন দায়িত্ব পালন শুরু করেন তখন ইরান বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। তার মধ্যে যেমন ছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জন্য অর্থনৈতিক সংকট, তেমনি ছিল দুর্নীতির প্রশ্ন।
২০২১ সালের নির্বাচনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ছিল তার নির্বাচনী প্রচারণা প্রধান বিষয়বস্তু।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি ইরানের যুব সমাজকে দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে প্রশংসা করেন এবং অর্থনীতির জন্য ‘চালিকা শক্তি’ বলে অভিহিত করেন। রাইসি আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সংশোধন, দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জড়তা মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। এর পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি একক অঙ্কের স্তরে নামানোর প্রতিশ্রুতি দেন। 

প্রেসিডেন্ট রাইসি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নস্যাৎ করতে এবং ইরানের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নতির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, "নিষ্ঠুর" নিষেধাজ্ঞাগুলো অপসারণ করা তার প্রশাসনের জন্য একটি "দায়িত্ব" হবে। প্রেসিডেন্ট রাইসি ইরানের বৈদেশিক নীতিতে বিশেষ করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য আমেরিকা ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সাথে আলোচনায় একটি দৃঢ় এবং বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করেন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে চুক্তিটি লাইনচ্যুত করেছিলেন তা রক্ষা করার জন্য ইব্রাহিম রাইসির মেয়াদ নতুন আলোচনার সাক্ষী ছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অপসারণে মার্কিন বিলম্বের কারণে সেই প্রচেষ্টা আবার বাধাগ্রস্ত হয়।

এগুলোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনাবলীতে রাইসি সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শক্ত এবং প্রশংসনীয়। ইরানের ইতিহাসে রাইসির আমলেই ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাথে ইরানের সরাসরি সীমিত মাত্রায় সামরিক সংঘাত হয় যার প্রতি জনগণের ব্যাপক সমর্থন ছিল। এজন্য রাইসি সরকার সারা বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসা পায়। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ঘটনাবলীতে রাইসি সরকারের ভুমিকা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল ও গৌরবময়।

রোববার (১৯ মে) ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আজারবাইজান প্রদেশে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে রাইসির বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের।