ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তথ্য জমার নির্দেশ

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চূড়ান্ত করার পর তা তাৎক্ষণিকভাবে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিআইবি ডাটাবেইজে বাল্ক আকারে রিপোর্ট করতে নির্দেশনা দিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবির এক প্রজ্ঞাপনে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি কোনো ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহীতা’ শনাক্ত ও চূড়ান্তকরণের পর এ সংক্রান্ত তথ্য ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)-তে রিপোর্ট করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহীতার তথ্য নির্ধারিত ছকে এর নির্দেশনা অনুসরণ করে আগামী ১ জুলাই থেকে সিআইবি ডাটাবেইজে এন্ট্রি বা বাল্ক আকারে ‘রিয়েল টাইম’-এ রিপোর্ট করতে হবে।

দেশের ব্যাংকগুলোতে ঋণখেলাপি একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। খেলাপিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতি বছরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৯ শতাংশ। তবে অবসায়ন ও মামলার মাধ্যমে আদালতে আটকে থাকা মন্দ ঋণের হিসাব আমলে নিলে তা প্রায় চার কোটি হবে বলে মনে করছেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা।

আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির আওতায় আগামী ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকে পাঁচ শতাংশের নিচে এবং সরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংজ্ঞা নির্ধারণের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে এ ধরনের খেলাপি চিহ্নিত ও চূড়ান্ত করতে একটি গাইডলাইন করে দিয়েছে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে আলাদা ইউনিটও গঠন করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংজ্ঞায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কোনো ঋণ গ্রহীতা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি নিজের, তার পরিবারের সদস্যের, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির অনুকূলে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণ, অগ্রিম, বিনিয়োগ বা আরোপিত সুদ বা মুনাফা তার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিশোধ না করলে তিনি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন। এছাড়া জালিয়াতি, প্রতারণা বা মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে বা যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়া হয়েছে সে উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করলে অথবা অন্য কোনো ব্যাংকের জামানতকৃত সম্পদ অনুমতি ছাড়া নতুন ঋণে জামানত হিসেবে দেখালে তাকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ব্যাংকগুলোর আলাদা ইউনিট ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করে তা প্রতিবেদন প্রতি ত্রৈমাসিকে অডিট কমিটির সভায় উপস্থাপন করবে। অডিট কমিটি উপস্থাপিত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা করে গুরুত্ব বিবেচনায় এ বিষয়ে তাদের মতামত বা সিদ্ধান্ত পরবর্তী পর্ষদ সভায় জানাবে। ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত নিয়মিত বা বিশেষ অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহীতার বিষয়ে পর্যালোচনাসহ একটি আলাদা অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তা নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে টীকা আকারে প্রকাশ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, খেলাপিদের ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুতে নিষেধাজ্ঞা এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরকেএসসি) কাছে কোম্পানি নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে তালিকা পাঠাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকা গাড়ি, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদির নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে সংস্থাটি। এ সব সংস্থা তাদের আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি কোনো ইচ্ছাকৃত খেলাপি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা সম্মাননা পাওয়ারও যোগ্য হবেন না বলেও জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানায়, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকায় কারও নাম এলে ঋণ পরিশোধ করে তালিকা থেকে অব্যাহতির ৫ বছরের মধ্যে কোনো ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না।