রাইসির হেলিকপ্টার থেকে সংকেত আসছিল না

ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি দুর্ঘটনার কারণ জানিয়েছে দেশটি। গত রবিবার দুর্ঘটনার প্রাথমিক কারণ হিসেবে বৈরী ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কথা বলা হলেও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ বাঘেরি।

হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা নিয়ে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘যান্ত্রিক ত্রুটির’ কারণে রাইসির হেলিকপ্টার ভেঙে পড়েছিল পাহাড়ে। বিবিসি ও গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, হেলিকপ্টার থেকে সংকেত আসছিল না।

দুর্ঘটনার কবলে পড়া হেলিকপ্টারটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বেল ২১২ মডেলের। এ কারণে ইরান নাকি এই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘সাহায্য’ চেয়েছিল; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে তারা সাহায্য করতে পারছে না।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর সেটি খুঁজে পেতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিল ইরান সরকার। সোমবার ইরানের পক্ষ থেকে সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও তেহরান কীভাবে ওয়াশিংটনের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠিয়েছে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার জানান, এ ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত বলছেন না। তবে ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চেয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বেল ২১২ হেলিকপ্টার সত্তর দশক থেকে ইরানে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের বহরে এ ধরনের বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার যুক্ত হয়। তবে বিপ্লবের পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ কিনতে বেগ পেতে হয় তেহরানকে। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি দুর্ঘটনায় পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বিধ্বস্ত ওই হেলিকপ্টারে রেডিও সংকেত পাঠানোর ‘ট্রান্সপন্ডার’ ছিল না বা বন্ধ ছিল বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে তুরস্ক।

হেলিকপ্টারটি উদ্ধারে অংশ নেওয়া তুরস্কের দলের প্রাথমিক তদন্তে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী আবদুল কাদির উরালো লু।

তুরস্কের এ মন্ত্রী বলেন, হেলিকপ্টারের ট্রান্সপন্ডার থেকে পাঠানো সংকেত থেকে সেটির উচ্চতা ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানা যায়। বিধ্বস্ত হওয়া হেলিকপ্টারটি থেকে এমন সংকেত খোঁজার চেষ্টা করেছিল তুরস্ক। তবে তা পাওয়া যায়নি। মনে করা হচ্ছে, দুর্ভাগ্যবশত ওই হেলিকপ্টারে ট্রান্সপন্ডার ছিল না বা বন্ধ ছিল।

তুরস্কের দেওয়া এ তথ্যও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পুরনো হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আনছে। এসব হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সরকারকে দুটি রুশ হেলিকপ্টার কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইরানের কর্মকর্তারা। ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জাফরি বলেছেন, রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্তের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী। কারণ, দেশটির নিষেধাজ্ঞার কারণে হেলিকপ্টারটির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

একই ভাষ্য রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভেরও। গতকাল কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বেসরকারি আকাশযানের সরঞ্জাম সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে মার্কিন সরকার।’

গত রবিবার দুপুরে ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের ভারজাগান এলাকায় প্রেসিডেন্ট রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। এতে রাইসি ছাড়াও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসাইন আমির আবদোল্লাহিয়ান ও ছয় আরোহী ছিলেন। গত সোমবার সকালে দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলের ভেতরে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটির খোঁজ পাওয়া হয়। এরপর সব আরোহীর মৃত্যু খবর নিশ্চিত করে তেহরান।

সোমবার গঠন করা ওই তদন্ত দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইরানের সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আলি আবদুল্লাহি। দলটি এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এদিকে তদন্তে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া।

নিজ শহরে কাল রাইসির দাফন : হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির জন্য দেশটির কয়েকটি নগরীতে শোক মিছিল ও জানাজার আয়োজন করা হয় গতকাল মঙ্গলবার। প্রথম শোক মিছিলটি শুরু হয় উত্তর-পশ্চিমের নগরী তাবরিজে সকাল সাড়ে ৯টায়। দুর্ঘটনাস্থল থেকে গত সোমবার রাইসিসহ ওই দুর্ঘটনায় নিহত অন্যদের মৃতদেহ উদ্ধারের পর তাবরিজে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল বিকেলে তাবরিজ থেকে রাইসির মৃতদেহ নেওয়া হয় শিয়া মুসলমানদের পবিত্র নগরী কোমেতে। সেখানেও হয় শোক মিছিল। কোম থেকে রাইসি ও অন্যদের মৃতদেহ নেওয়া হবে রাজধানী তেহরানে। সেখানে আজ রাইসি এং অন্যদের জানাজা পড়াবেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাইসিকে তার নিজের শহর মাশহাদে দাফন করা হবে।

এদিকে রাইসির মৃত্যুতে ৫ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে ইরানে। আজ বুধবার দেশটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আর সাত দিন দেশটিতে সব ধরনের সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ইরান ছাড়াও এশিয়ার বেশিভাগ দেশ ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।