চার বছরে শিল্পে প্রবৃদ্ধি কমে অর্ধেকে

বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে আছে। করোনার সময় শিল্পে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি দেশের ব্যবসায়ীরা। করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, জাহাজ ভাড়া ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডলারের উচ্চমূল্যে বিপাকে পড়ে যায় দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাত, যা থেকে এখনো উত্তরণ ঘটেনি, বরং পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। সরকারি হিসেবেই শিল্প ও উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি গত চার বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে।

গত সোমবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তথ্য দিয়েছে। এতে শিল্পের প্রবৃদ্ধির এ চিত্র উঠে এসেছে। তবে ব্যবসায়ীরা সরকারি এ হিসাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, ডলার ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, গ্যাস-বিদ্যুতের অপ্রতুলতায় উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এর বিপরীতে পণ্যমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে সমন্বয় করতে না পারায় অনেক শিল্প পড়েছে লোকসানে। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারার খেসারতও তাদের দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে পড়েছে অনেক শিল্প।

বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ। ওই বছরই সারা বিশ্বে করোনা মহামারী হানা দেয়। প্রভাব পড়ে দেশের শিল্প খাতেও। মহামারীর প্রভাবে অনেক শিল্পই সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিশেষ ব্যবস্থায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিতে ফেরেনি শিল্প। তবে করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পুরো বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনে। করোনা ও যুদ্ধের কারণে প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে কমছে এ খাতের প্রবৃদ্ধি।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, করোনার পরও দেশের শিল্পে প্রবৃদ্ধি কমলেও বিশেষ ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা কিছুটা ধরে রাখতে পেরেছিল বাংলাদেশ। ফলে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য নেমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে।

তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে হেলে পড়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ওই বছর ছিল ৮ দশমিক ৩৭। কিন্তু চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে এ খাতের প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে নামবে বলে প্রাক্কলন করেছে বিবিএস।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার সংকট, গত এক বছরে নতুন কোনো গ্যাস সংযোগ না দেওয়া, কাঁচামাল আমদানি করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে দেশের শিল্প খাতের এমন দুরবস্থা। এ ছাড়া সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি না থাকায় দেশে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ডলারের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় বিদেশি বিনিয়োগেও বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিবিএস শিল্পের প্রবৃদ্ধির যে তথ্য দিয়েছে তা সত্য নয়। তারা কীভাবে এ প্রতিবেদনকে ইতিবাচক দেখিয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। শিল্পের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় গিয়েছে। গত এক বছরে কোনো শিল্পেই নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। উৎপাদন বাড়বে কীভাবে, প্রবৃদ্ধি কীভাবে হবে?’

এ ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় বিবিএসের একই প্রতিবেদনে। বিবিএস বলছে, চার বছর আগেও করোনা মহামারীর বছরে দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ, কিন্তু চলতি অর্থবছরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ধারায় যাবে বলে ধারণা দিয়েছে সংস্থাটি। চলতি অর্থবছর শেষে জ্বালানি সরবরাহের এ খাতে প্রবৃদ্ধি নেমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশে দাঁড়াবে বলে মনে করে সংস্থাটি।

বিবিএস বলছে, করোনা মহামারীর বছরেও দেশের উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ, সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে চলতি অর্থবছর উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নেমে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে। অর্থাৎ চার বছরের মাথায় দেশের উৎপাদন নেমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে।

চলতি বছরের জানুয়ারির পর শিল্প-কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কারখানা চালানোয় খরচ বেড়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের অধিকাংশ এলাকা এবং মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জসহ অন্যান্য গ্যাসপ্রধান শিল্প এলাকায় গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

গ্যাস সংকটের কারণে গাজীপুর জেলা ও মহানগরের হাজারো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমেছে। এলপিজি, ডিজেল ও সিএনজি গ্যাসে চালু রাখতে হয়েছে এসব কারখানা। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে বহুগুণ। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিল্পকারখানা মালিকরা।

ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘যেহেতু নতুন করে কোনো স্পেশাল ইকোনমিক জোন রেডি হয়নি, কোনো ব্যাংকের কাছে এখন কোনো তহবিল নেই, তাই ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করতে পারছেন না। এরই মধ্যে পুরনো বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আর নতুন কোনো কারখানা তৈরিই হয়নি।’ এমন পরিস্থিতিতে দেশের এ শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়ার কথা, কিন্তু বিবিএস ধনাত্মক হিসাব দেয় কীভাবে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক নীতি বিনিয়োগবান্ধব ছিল না, এর মধ্যে ডলার ক্রাইসিস, কাঁচামালের সংকট তো ছিলই, তাহলে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।’

শিল্পমালিকরা বলছেন, গাজীপুরে প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। অথচ সরবরাহ হচ্ছে অর্ধেকের কম। এ ছাড়া সিএনজি পাম্পগুলোতে চাপ কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন তারা। ফলে পাম্পগুলোতে নেই গাড়ির চাপ। এতে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

শিল্পের উৎপাদনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে বড় ও মাঝারি শিল্পে। করোনা মহামারীর বছরে বড় শিল্পগুলোর উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ছিল লক্ষণীয়, ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে পরের অর্থবছরও এ খাতের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ হয়েছিল। কিন্তু এ বছর বিবিএসের হিসাবে তা কমে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে।

গত ১৬ মে শিল্পের সংকট নিয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, আমরা এখন অস্তিত্বহীন হওয়ার শঙ্কায় আছি। কীভাবে টিকে থাকব জানি না। একদিকে ইডিএফ ফান্ডকে সংকুচিত করা হয়েছে, অন্যদিকে সুদের হার দুই অঙ্কের ঘরে চলে গেছে। তিনি আরও বলেছিলেন, ব্যাংকে আমাদের যে ঋণের ঊর্ধ্বগতির সীমা ছিল ১০০ কোটি টাকা, তা এখন ৪০ শতাংশ কমে ৬০ কোটি টাকায় নেমেছে। ডলারের দাম বাড়ার কারণে আগে ১০০ কোটি টাকার যে মাল আনতাম, এখন তা ৬০ কোটি টাকার আনতে পারি।

এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ক্রমান্বয়ে শিল্পের গ্যাসের দাম যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, পাওয়ার প্ল্যান্টের ভর্তুকির টাকা কে দেবে। সার বানাতে গিয়ে ১৫ টাকা দিচ্ছেন, সে টাকা কোথা থেকে দেবে। ১০ বছর ধরে ৪ টাকা করে গ্যাস পোড়াল সরকার, এ টাকা কে ভর্তুকি দেবে। যখন সরকারের লোকসান হয়, এই টাকাটা কে দেয়।