দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট দুই বছর ধরে। শিল্পোদ্যোক্তারা গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে রয়েছেন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে। সরকারি হিসাব বলছে, দেশের সংকটকালে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রবৃদ্ধি কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশে ঠেকেছে। দেশের ডলার-সংকটের কারণে বিদ্যুতের জন্য গ্যাস আমদানি কমিয়ে দিয়েছে সরকার।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এ চিত্র উঠে এসেছে। বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, করোনা মহামারীর বছরেও এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
বাংলাদেশে গ্যাস সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। পেট্রোবাংলার হিসাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চলতি অর্থবছর গ্যাসের চাহিদাই হবে দেড় হাজার মিলিয়ন ঘটফুটের মতো।
তবে উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক চাহিদা হলো ২ হাজার ২৪০ এমএমসিএফডি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে ৭০০-৮০০ এমএমসিএফডি গ্যাস; অর্থাৎ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের যে চাহিদা রয়েছে, সেটির বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৪০ শতাংশের মতো।
দেশে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার গৃহস্থালি, সিএনজিসহ সাতটি সেক্টরে মোট চাহিদা দাঁড়াবে ৩ হাজার ৭১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
পেট্রোবাংলার হিসাবেই বর্তমানে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের ঘাটতি আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্যাসের ঘাটতি আরও বেশি, যা দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।
বিবিএসের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছর শেষে জিডিপিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রবৃদ্ধি কমে ঋণাত্মক ধারায় গিয়ে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশে ঠেকবে। এর মধ্যে বিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি কমে ঠেকবে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২১ শতাংশে, আর গ্যাসের প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশে।
সরকারি হিসাবে এ বছর গরমে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা হতে পারে ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মতো। এ বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস ও বিপুল পরিমাণ কয়লা প্রয়োজন হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিসহ জ্বালানির জন্য ব্যয় করতে হয়েছে ৬১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।
প্রাথমিক জ্বালানির অভাবে ২০২২ সালে ব্যাপক লোডশেডিং করতে হয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি, কয়লার ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত ১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। একপর্যায়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে ডলারের ওপর একটা ব্যাপক চাপ পড়ছে। বর্তমান সংকটের কারণে এ বছর জ্বালানি সংকট পূরণ আরও চ্যালেঞ্জিং হবে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এই মুহূর্তে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক উত্তোলন হচ্ছে কমবেশি ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস। আর ৫০০ এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এলএনজি আমদানির সক্ষমতা অনুযায়ী, দৈনিক সর্বোচ্চ ৮০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি সম্ভব। এখনকার চাহিদা পূরণে আমদানি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই; তবে দীর্ঘ মেয়াদে সমাধানের জন্য সাগরে এবং স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে আছে। করোনার সময় শিল্পে যে ধাক্কা লেগেছিল তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের শিল্প খাত। করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার-সংকটসহ ইত্যাদি কারণে উৎপাদন ব্যাহত। ভুলনীতি, অদূরদর্শিতাসহ বিভিন্ন কারণে দেশের শিল্প ও উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি গত চার বছরে অর্ধেকে নেমেছে।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ। ওই বছরই সারা বিশে^ করোনা মহামারী হানা দেয়। প্রভাব পড়ে দেশের শিল্প খাতেও। এরপরই প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে কমছে এ খাতের প্রবৃদ্ধি। করোনার পরও দেশের শিল্পে কিছুটা প্রবৃদ্ধি কমলেও ধারাবাহিকতা আগের মতোই ছিল; অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য নেমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে।
তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে হেলে পড়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ওই বছর ছিল ৮ দশমিক ৩৭। কিন্তু বছর শেষে এ খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার-সংকট, এক বছরে নতুন কোনো গ্যাসসংযোগ না দেওয়া, কাঁচামাল আমদানি করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে দেশের শিল্প খাতের এমন দুরবস্থা। এ ছাড়া সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি না থাকায় দেশে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিবিএস শিল্পের প্রবৃদ্ধির যে তথ্য দিয়েছে, তা সত্য নয়। তারা কীভাবে এই প্রতিবেদনকে ইতিবাচক দেখিয়েছে, বিশ্বাসযোগ্য নয়। শিল্পের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় গেছে। এক বছরে কোনো শিল্পেই নতুন গ্যাসসংযোগ দেওয়া হয়নি। উৎপাদন বাড়বে কীভাবে, প্রবৃদ্ধি কীভাবে হবে?
এই ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় বিবিএসের একই প্রতিবেদনে। বিবিএস বলছে, চার বছর আগেও করোনা মহামারীর বছরে দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ, কিন্তু এই অর্থবছর এ খাতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় যাবে বলে ধারণা দিয়েছে সংস্থাটি। চলতি অর্থবছর শেষে জ্বালানি সরবরাহের এ খাতে প্রবৃদ্ধি নেমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশে দাঁড়াবে বলে মনে করে সংস্থাটি।