ভারতের কলকাতায় খুন হওয়া সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের আওয়ামী লীগের হয়ে রাজনৈতিক জীবন ২৮ বছরের। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রথমে কালীগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপর কালীগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান ও পরবর্তীকালে ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য হন। এরপর ২০১৮ ও ২০২৪ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় আওয়ামী লীগসহ দলমত নির্বিশেষে সবার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। তার মৃত্যুর খবর শুনে গতকাল বুধবার সকালে কালীগঞ্জ শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকার বাড়ির সামনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভিড় করেন এবং তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আনারের পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে। তার জন্ম ৩ জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে। ১৯৮৬ সালে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। এরপর ’৮৮ সালে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের সঙ্গে থেকে রাজনীতি করতে থাকেন। ১৯৯২ সালে কালীগঞ্জ পৌরসভা গঠিত হলে তিনি প্রথম পৌর কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৯৫ সালে আবদুল মান্নান বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিলে আনোয়ারুল আজিমও আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী হন। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তারা দুজনই এলাকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এলে আনার ভারতে চলে যান। সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থানকালে ২০০৪ সালে কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর দেশে ফিরে আসেন। ২০০৯ সালে তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের সময়ে আবদুল মান্নান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে এমপি আর দলের সমর্থনে আনার কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় আবদুল মান্নানের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়। ২০১৪ সালে তিনি আবদুল মান্নানকে পেছনে ফেলে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই থেকে পরপর তিনবার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য তিনি।
গত ১২ মে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন আনার। ১৫ মে নিখোঁজ হন, তার ফোনও বন্ধ ছিল। ২০ মে পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। গতকাল (২২ মে) তার মৃত্যুর খবর আসে।
এদিকে আনারের মৃত্যুর খবর পেয়ে গতকাল বেলা ১১টার পর কালীগঞ্জ শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকার বাড়ির সামনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ওই এলাকা লোকারণ্য হয়ে যায়। পাশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে নেতাকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। দুপুর ১২টার দিকে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ও কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবু আজিফসহ প্রশাসনের নানা স্তরের কর্মকর্তারা।
আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য ব্যবহারসংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৬ সালে ইন্টারপোলের তালিকায় আনারের নাম ওঠে। ২০০৯ সালে ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড তালিকা থেকে নাম প্রত্যাহার হওয়ার পর এলাকায় ফিরে আগের মতোই কর্মকান্ড শুরু করেন। আনারের বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য ও স্বর্ণ চোরাচালান, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং চরমপন্থিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে ৯টির বেশি মামলা ছিল। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ধীরে ধীরে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো কমে যেতে শুরু করে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হলে ক্ষমতার দাপটে বেশিরভাগ মামলা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন।