ইসরায়েলকে রাফায় হামলা বন্ধের নির্দেশ আইসিজের

ফিলিস্তিনের রাফাহ শহরে ইসরায়েলের চলমান হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। গতকাল শুক্রবার হেগভিত্তিক জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইসরায়েলকে এ নির্দেশ দেয়।

রাফায় ইসরায়েলের হামলা বন্ধের দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দ্বারস্থ হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই অভিযোগের রায়ে আইসিজের প্রধান বিচারপতি নওয়াফ সালাম গতকাল বলেন, রাফায় তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের যেকোনো হামলা বন্ধ করতে হবে। যে হামলায় গাজার ফিলিস্তিনি ও তাদের অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার দাবি, গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এ কারণে সেখানে হামলা বন্ধ করতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার আবেদন আমলে নিয়ে গতকাল ওই রায় দিল আদালত। বিচারকরা বলেছেন, ইসরায়েল গাজার বাসিন্দাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং রাফাহ থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া ব্যবহার করছে সেটিতে তারা সন্তুষ্ট নন।

বিবিসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যে নির্দেশ দিয়েছেসেটি দেওয়া হয়েছে মূলত যেন গাজার সাধারণ মানুষের অবস্থার আর অবনতি না ঘটে। এ ছাড়া জাতিসংঘের সর্বোচ্চ এ আদালত এবারই প্রথমবারের মতো দখলদার ইসরায়েলকে এমন নির্দেশ দিয়েছে; যেটির মাধ্যমে তাদের সামরিক পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন নির্দেশনা কার্যকর সম্পর্কে অবহিত করতে ইসরায়েলকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ রাফাহ ক্রসিং খুলে দিতেও ইসরায়েলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ১৫ বিচারকের মধ্যে ১৩ বিচারক একমত হয়েছেন যে রাফার বর্তমান পরিস্থিতি সর্বোচ্চ সংকটজনক অবস্থায় পৌঁছেছে।

আদালতের প্রধান বিচারক বলেছেন, রাফাহ থেকে আট লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইসরায়েল এসব মানুষকে নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা দিচ্ছেএমন দাবি তিনি বিশ্বাস করেন না। তিনি জানিয়েছেন, ইসরায়েলের এ দাবির কোনো প্রমাণই তারা পাননি।

আর এ কারণেই বিচারকরা এমন কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন গাজায় গণহত্যার চিহ্ন যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিতে যেন জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সেখানে অবস্থান করতে দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দেওয়া এই রায় এখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করা হবে। সেখানে যদি সব দেশ এতে সম্মত হয়, তাহলে এটি কার্যকর হবে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এই রায়ে ভেটো দেবে।

এদিকে আইসিজের এই রায়ের দিনেই গাজায় হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। গত ২৪ ঘণ্টায় নৌপথ, আকাশ পথ ও স্থলপথে হামলা হয়েছে গাজায়। হামলায় আরও অন্তত ৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ড জুড়ে চালানো পৃথক হামলায় তারা নিহত হয়।

এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফায় হামাস যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাদের ব্যাপক লড়াই চলছে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এবং হামাসের সশস্ত্র শাখা।

এ মাসে গাজার উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে একযোগে ইসরায়েলি হামলার ফলে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে এবং ইসরায়েলি বাহিনী সাহায্য প্রবেশের প্রধান প্রবেশ পথও বন্ধ করে দিয়েছে, যা দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।

ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ছাড়াই রাফাতে স্থল হামলা শুরু করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যরা গাজার দক্ষিণের এই শহরটিতে হামলার জন্য ইসরায়েলকে ব্যাপকভাবে সমালোচনাও করেছে। তবে ইসরায়েল বলেছে, সেখানে হামাস যোদ্ধাদের বেশ কয়েকটি ব্যাটালিয়নের বিরুদ্ধে তাদের অবশ্যই অগ্রসর হতে হবে।

ইসরায়েল অবশ্য কয়েক মাস আগেও এ অঞ্চলে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু এখন তাদের দাবি, হামাসকে সেখানে আবার সংগঠিত হতে বাধা দিতে তাদের আবারও ফিরে আসতে হয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, গত বুধবার যুদ্ধে তাদের আরও তিন সৈন্য নিহত হয়েছে। এতে করে গত ২০ অক্টোবর থেকে গাজায় স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে নিহত ইসরায়েলি সেনাদের সংখ্যা বেড়ে ২৮৬ জনে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনে ৩৫ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও প্রায় ৮০ হাজার মানুষ।