‘গাছ তারকাঁটামুক্ত হলে মনে হয় শরীর ব্যথামুক্ত হলো’

সড়কের ধারে বিভিন্ন গাছে সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপনের প্রচার, স্টিকার লাগাতে পেরেক ও তারকাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে গাছ। অথচ গাছেরও জীবন আছে। মানুষের ন্যায় উদ্ভিদেরও অনুভূতি শক্তি আছে, যদিও তা প্রকাশ করতে পারে না। গাছের এই অব্যক্ত ব্যথা দূর করতে রংপুরে অভিযানে নেমেছে ‘ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা’। ‘একটি গাছ একটি প্রাণ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রংপুর নগরীর সব গাছ তারকাঁটামুক্ত করতে তারা শুরু করেছে অভিযান। এই অভিযানে হিজড়া জনগোষ্ঠীর ২২ জন কাজ করছেন। গত ২ মে রংপুর নগরীর মডার্ণ মোড়ে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সংগঠনটির রংপুর শাখার সভাপতি ও গত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে রংপুর ৩ আসনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আনোয়ারা ইসলাম রাণী। ইতিমধ্যে নগরীর মডার্ণ মোড় থেকে সাতমাথা, মাহিগঞ্জ থেকে ফায়ার সার্ভিস মোড় পর্যন্ত গাছের পেরেক ও তারকাঁটামুক্ত করেছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, হলুদ টি-শার্ট পরে দুজন শাবল দিয়ে খুঁজে খুঁজে গাছের কাঁটা খুলছেন। কেউ মই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। গাছে বড় পেরেক দিয়ে লাগানো সাইনবোর্ড হলে তা অপসারণ করছেন। কেউ গাছ থেকে খোলা তারকাঁটা ব্যাগে রাখছেন। এভাবেই তারকাঁটামুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন গাছ। এই কাজ ছোট ছোট কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে করছেন হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। লক্ষ্য তাদের রংপুর নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডের সব গাছ তারকাঁটামুক্ত করা। তাদের সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং শাবল, হাতুড়ি, মই দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আনোয়ারা ইসলাম রাণী।

নগরীর টাউনহল চত্বরে গাছের তারকাঁটা তুলতে দেখা যায়, তৃতীয় লিঙ্গের শাহাজাদী আক্তার সানি, সোহেলী সাথী এবং রত্নাকে। জানতে চাইলে শাহাজাদী আক্তার সানি বলেন, ‘সত্যি বলতে ছোট থেকেই দেখছি, গাছে তারকাঁটা দিয়ে সাইনবোর্ড, স্টিকার, বিলবোর্ড লাগানো হয়। ছোটবেলায় সেই বোধটুকু কাজ করেনি। তবে আমাদের সভাপতি আনোয়ারা ইসলাম রানী বিষয়টি নিয়ে যখন আমাদের সঙ্গে মিটিং করলেন, তখন আমাদের বিষয়টি বোধে এসেছে। আমি এজন্য গাছ তারকাঁটামুক্ত করার অভিযানে অংশ নিয়েছি। যখন একটা একটা করে তারকাঁটা তুলে ফেলি এবং যখন গাছ তারকাঁটামুক্ত হয়, তখন কেন জানি আমাদের ভালো লাগে। শরীর ব্যথামুক্ত হলে যেমন লাগে, ঠিক তেমনি আমাদের অনুভূতি হয়।’

সোহেলী সাথী বলেন, ‘একবার ভাবুন তো আপনার শরীরে যদি তারকাঁটা কেউ ঢুকিয়ে দেয়, তাহলে কেমন ব্যথা লাগবে বলেন? আমি বিষয়টাকে এভাবেই চিন্তা করি। সেই অনুভূতি থেকেই কাজটা করছি। কাজটাতে একটা তৃপ্তি আছে।’

ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা রংপুরের সভাপতি আনোয়ারা ইসলাম রাণী বলেন, ‘সারা দেশের মতো রংপুর নগরীর সড়কের পাশের গাছে গাছে তারকাঁটা ও পেরেক দিয়ে সাইনবোর্ড ও স্টিকার লাগানো হয়েছে। এতে গাছগুলো ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পাশাপাশি বেড়ে ওঠায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে অনেক গাছ মারাও যাচ্ছে। শত শত পেরেক ও তারকাঁটায় বিদ্ধ হয়ে যে গাছগুলো বেঁচে থাকছে, সেগুলোও বয়স ফুরানোর পর কাঠ হিসেবে ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে। তাই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’