ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে দেশের বড় একটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল সোমবার রাত আটটায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২ কোটি ৭১ লাখের বেশি গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে। দেশে বিদ্যুতের মোট গ্রাহক ৪ কোটি ৭০ লাখ। সে হিসেবে অর্ধেকের বেশি গ্রাহক অন্ধকারে ছিলেন।
এ ছাড়া প্রবল ঝড়-বৃষ্টির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত দুই বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির বৈদ্যুতিক তার ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্টের ফলে অন্তত ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে বিদ্যুৎ না থাকা এবং ঝড়ের প্রভাবে দেশের মোট মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক টাওয়ারের প্রায় ৪৯ শতাংশ অচল হয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দুর্যোগপূর্ণ এলাকার মানুষেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। রবিবার রাত থেকেই অনেকে মোবাইল ফোনে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। মোবাইল ইন্টারনেটের বাইরে উপকূলীয় এলাকায় অন্তত প্রায় ৩ লাখ গ্রাহক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত আছেন। যন্ত্রপাতির ক্ষতি হওয়ায় বিটিসিএলের টেলিফোন সেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। আর মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বিকল্প উপায়ে নেটওয়ার্ক চালু রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে অনেক এলাকার বিদ্যুৎ-সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় গাছ পড়ে লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে সরবরাহ বন্ধ হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন জানান, ঝড়-বৃষ্টির কারণে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীন ৮০ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে ৬৫টির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে কোথাও আংশিক বা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। সব মিলে ২ কোটি ৬৬ লাখের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের খুঁটি, ট্রান্সফরমার, তার, ইনস্যুলেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ায় প্রাথমিক হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির ৭৯ কোটি ২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ওজোপাডিকোর অন্তত ৪ লাখ ৫৩ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় ছিল। তবে দুটি প্রতিষ্ঠানেরই আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সদস্য (পরিচালন ও বিতরণ) দেবাশীষ চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমাদের টিম প্রস্তুত রয়েছে। কয়েক জায়গায় ইতিমধ্যে মেরামতকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঝড় আর বৃষ্টির কারণে পুরোদমে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আশা করছি দুই-তিন দিনের মধ্যে বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তবে পুরোটা স্বাভাবিক হতে সপ্তাহখানেক সময় লাগতে পারে।’
বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়ায় পিডিবির গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় পিডিবির উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৫৬০ মেগাওয়াট। গতকাল বিকেল ৩টায় উৎপাদন নেমে আসে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে।
ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে গভীর সমুদ্রে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হলেও সেটি এখন স্বাভাবিক। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে স্থাপনার কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি। গ্যাস সরবরাহ আস্তে আস্তে বাড়িয়ে গতকাল দুপুর থেকে তা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে।
অর্ধেক মোবাইল টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত : বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্র্তৃপক্ষ (বিটিআরসি) জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে ৬৪ জেলাতেই মোবাইল টাওয়ার কমবেশি অচল হয়ে গেছে। দেশজুড়ে ৪৫ হাজার ৬১০ মোবাইল টাওয়ারের মধ্যে অচল হয়েছে ২২ হাজার ২১৮টি। নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য মোবাইল কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মোবাইল ফোন অপারেটরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, উপকূলে ঝড় শুরুর আগে রবিবার সন্ধ্যায় অনেক এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। টাওয়ারগুলোতে চার ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাটারির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেছে। এ ছাড়া ঝড়ের কারণে অনেক টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন এলাকা দ্রুত সংযোগের আওতায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।