ঝিনাইদহের-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম আনারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আখতারুজ্জামান শাহীনের বাংলোতে গভীর রাতে চোরাচালানের লেনদেন হতো নিয়মিত। পাচার হতো সোনা ও হীরার চালান। ইতিমধ্যে বাংলোর চারপাশ ও ভেতরের অন্তত ১০টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজে চালান পাচার ও রাজনীতিবিদ, আমলা ও পুলিশের কিছু কর্মকর্তার অবাধ যাতায়াতের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে নিউ টাউনের সঞ্জিভা গার্ডেনের ফ্ল্যাটের সেপটিক ট্যাংক থেকে মাংসের দলা উদ্ধার করেছে বাংলাদেশের ডিবি পুলিশ ও কলকাতার সিআইডি। তবে দলাটি আনারের লাশের খন্ডিত অংশ কি না, তা ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তাছাড়া গতকাল নিউ টাউনের হাতিরলেক এলাকা থেকে সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। যশোর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে শিমুল ভূঁইয়ার সহযোগী সাইফুল আলম ওরফে সাইফুল মেম্বারকে।
এদিকে এমপি আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন দুদিন আগে কলকাতা পৌঁছেছেন। তার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মাংসের দলার ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে বাংলাদেশ ডিবি পুলিশের দলটি বৃহস্পতিবার নাগাদ দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আনার হত্যাকান্ডে মামলার বাংলাদেশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা গতকাল সকালে কলকাতার সিআইডির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেছেন। সিআইডির কর্মকর্তারা ডিবির কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, কসাই জিহাদ হাওলাদার তাদের জানিয়েছেন, আনারের মাংসগুলো টুকরো টুকরো করার পর ওজন মাপার মেশিন দিয়ে মাপা হয়। এ তথ্য পেয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা অনেকটা হতভম্ব হয়ে পড়েন। তারা সিআইডিকে বলেছেন, বাথরুমে মাংস কাটার পর কিছু টুকরো কমোডের ভেতর দিয়ে ফ্ল্যাশ করেছেন। আর এ কারণে নিউ টাউনের ওই ফ্ল্যাটের সেপটিক ট্যাংকিতে তল্লাশি চালাতে হবে। পুলিশের এ প্রস্তাবে সিআইডির কর্মকর্তারাও সায় দেন। তাছাড়া সন্দেহভাজন পলাতক চার আসামিকে ভারতের যেকোনো স্থানে দেখামাত্র ধরার নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। তাদের ছবিও ইমিগ্রেশন ও সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়ে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার এলাঙ্গী গ্রামের আসাদুজ্জামান কাটুর পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ আখতারুজ্জামান শাহীন। শাহীন ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। ১৯৮৫ সালে কোটচাঁদপুর পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর কেএমএইচ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এলাকায় লেখাপড়া শেষ করে চিটাগাং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারে ভর্তি হন। সেখানে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে। বছর দুয়েক চাকরিও করেন। শিপের চাকরি করার সময় ১৯৯৫ সালে ডিভি লটারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর সেখানেও শিপে চাকরি করেন। অর্থের নেশায় চোরাকারবারিতে জড়িয়ে পড়েন। চোরাকারবারিদের সঙ্গে আঁতাত হলে চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। গড়ে তোলেন একটি বিশাল চোরাচালান চক্র। আবার আগে থেকেই সখ্য ছিল আনারসহ অন্তত পাঁচজন শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে। চোরাচালানের টাকায় ক্রয় করেন এলাঙ্গী গ্রামের বাংলোর জায়গা। এ ছাড়া ঢাকার গুলিস্তান ও বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বার ব্যবসা শুরু করেন। সেখানে বসত মদের আসর। কোটচাঁদপুর থেকে ভারত সীমান্ত বেশি দূরে না হওয়ায় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন শাহীন। গড়ে তোলেন টাকার পাহাড়।
যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও বাংলাদেশে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। কোটচাঁদপুরে তার ছিল ব্যাপক প্রভাব। কাউকে শত্রু মনে করলে তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হতো। এমনকি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বিরোধীদলীয়দের বিভিন্ন মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দিতেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলে প্রায়ই শাহীন থাকতেন বাংলোতে। তিনি আসার পর মাঝেমধ্যে গাড়িতে করে আসা-যাওয়া করত অনেকেই। বাংলোতে রয়েছে নিজস্ব বাবুর্চি। রান্না করে চলত খাওয়াদাওয়া ও ভূরিভোজ। রাতে মাঝেমধ্যে শোনা যেত বাদ্যবাজনা ও গানবাজনা।
গভীর রাতে বাংলোতে চোরাচালানের লেনদেন: পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শাহীনের বাংলোতে এমন কোনো অপরাধ নেই যে হতো না। আনারকে কলকাতায় নিয়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠায় কিছুদিন আগে আমরা বাংলো থেকে ১০টির মতো সিসি ক্যামেরা জব্দ করি। ক্যামেরার ফুটেজে চোরাচালান পাচার ও লেনদেনের ছবি দেখা গেছে। একটি ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ২টার দিকে ল্যান্ড ক্রুজারে করে দুই ব্যক্তি বাংলার ভেতরে প্রবেশ করছেন। তারা দ্বিতীয়তলার বারান্দায় কিছুক্ষণ বসে ড্রিংকস করেন। ওই সময় আনার ও শাহীনকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। কালো রঙের পোঁটলা নিয়ে গেছেন ওই ব্যক্তিরা। আবার দেখা গেছে, তারা শাহীনের হাতে একটা ছোট ব্যাগ দিয়েছেন। আমাদের ধারণা, ওই ব্যাগে মোটা অঙ্কের অর্থ ছিল। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাংলোটি অপরাধের আখড়া। সেখানে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা, আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, নায়ক, নায়িকা, মডেল ও সাংসদ আনারের যাতায়ত ছিল নিয়মিত। ফুটেজেও তাদের আসা-যাওয়ার ছবি দেখা গেছে। আবার কিছু ছবি স্পষ্ট দেখা গেছে। যারা ওইসব বাংলোতে আসা-যাওয়া করেছেন, তাদের তালিকা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ঝিনাইদহের গেদে সীমান্ত, জীবননগর, মহেশপুর জিন্নানগর, সামান্তা, মাটিলা, যাদবপুর, সামুন্দা বাগাডাঙ্গা, শ্যামকুড় সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের সাবস্টেশন হিসেবে ব্যবহার করা হয় এ বাংলো। চারদিকে কাঁটাতারবেষ্টিত বাংলো। পাচারের সোনা এনে জড়ো করা হতো এ বাড়িতেই। পরে কোটচাঁদপুরের কিছু নির্দিষ্ট লোকজন সোনার চালান নিয়ে সীমান্তে চলে যেত। শীর্ষ মাদক কারবারিরাও বাংলোতে যাতায়াত করতেন।
সেপটিক ট্যাংকে মিলল মাংসের দলা : গতকাল বিকেলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের নেতৃত্বে ডিবির একটি টিম ও কলকাতা সিআইডি পুলিশের উপস্থিতিতে সঞ্জিভা গার্ডেনের সেপটিক ট্যাংকিতে তল্লাশি চালিয়ে মাংসের দলা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দলাটি আনারের দেহের খ-িত অংশের কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এজন্য কয়েক দিন লেগে যেতে পারে। এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল দিনভর সঞ্জিভা গার্ডেনের সেপটিক ট্যাংকি ও স্যুয়ারেজ লাইন ভাঙা হয়। সেখানে মানুষের মৃতদেহের অংশসাদৃশ কিছু বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা সেটা পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছি। তারা ডিএনএ পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেবে। রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ওই ফ্ল্যাটে তিনটি কমোড রয়েছে, সেগুলো ফ্ল্যাশ করলে ময়লা যেখানে জমা হয় এবং যে স্যুয়ারেজ লাইন, সেটি ভাঙতে পরামর্শ দিই। পরে সে অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংকি খোলা হয় এবং স্যুয়ারেজ লাইন ভাঙা হয়। তিনি আরও বলেন, কলকাতার তদন্তকারী কর্মকর্তারা খুবই আন্তরিকভাবে কাজ করছে। শালা ব্রিজের পাশে খালটিতেও সেখানে তল্লাশি অভিযান চালানো হবে আবার। আমি মনে করি ভারত এবং বাংলাদেশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা পারিপার্শ্বিকতা ডিজিটাল অ্যাভিডেন্স এবং আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে আদালত যে রিপোর্ট প্রদান করবে, সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করা কষ্টকর হবে বলে মনে করি না।
ওজন মাপার মেশিন দিয়ে টুকরোগুলো মাপা হয় : সাংসদ আনারকে হত্যা করার পর মাংসের টুকরোগুলো ওজন মাপার মেশিন দিয়ে মাপা হয়। রিমান্ডে থাকা কসাই জিহাদ পুলিশকে এ তথ্য জানান। এ তথ্য শুনে তদন্তকারী কর্মকর্তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন। মাংসগুলো ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম করে কুচি কুচি করা হয়। সোমবার জিহাদকে নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে কীভাবে আনারকে হত্যা ও মাংসগুলো খন্ডিত করা হয়েছে তা তিনি অভিনয় করে দেখিয়েছেন। আনারের দেহ থেকে প্রথমে মুন্ডু, পরে শরীরের প্রতিটি অংশ থেকে মাংস ও হাড় আলাদা করা হয়। সেগুলোকে ছোট ছোট টুকরো বা কার্যত ‘কিমা’ বানানোর বিস্তারিত বিবরণ পাক্কা ৪০ মিনিট ধরে তদন্তকারীদের জানান জিহাদ। কোন জায়গায় দেহাংশ রাখা হয়েছিল এবং প্যাকেট কীভাবে করা হলো, সেটিও তুলে ধরেন জিহাদ। পুরো বিষয়টি ভিডিও রেকর্ডিং করেন পুলিশ কর্মকর্তারা। নিউ টাউনের ফ্ল্যাট থেকে ভিডিও কলে ধরা হয় বাংলাদেশ পুলিশের হেফাজতে থাকা আমানুল্লা, শিলাস্তি রহমান ও ফয়সাল সাজিকে। জিহাদের দেওয়া তথ্যগুলোর সঙ্গে আমানুল্লার বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হয়।
হাতিরলেক থেকে সন্দেহভাজন ২ জন আটক : গতকাল দুপুরে কলকাতার সিআইডি পুলিশ নিউ টাউন এলাকায় হাতিরলেক এলাকা থেকে সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করেছে। দুই দেশের তদন্তকারী সংস্থাগুলো জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত কি না, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যশোর থেকে শিমুলের সহযোগী গ্রেপ্তার : গতকাল রাত ১০টার দিকে যশোর শহরের চাঁচড়া বাবলাতলা এলাকা থেকে শিমুলের সহযোগী পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা সাইফুল মেম্বারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। সাইফুল যশোরের অভয়নগর উপজেলার দামুখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য। তিনি ওই ইউনিয়নের দত্তগাতি গ্রামের বাসিন্দা। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে বোমা তৈরির ৯৬০ গ্রাম বিস্ফোরক জব্দ করা হয়েছে। সাইফুল তিন হত্যা ও একটি অস্ত্র মামলার আসামি। এ মধ্যে দত্তগাতি গ্রামের সুব্রত ও রফিকুল হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি সাইফুল ও শিমুল। পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
‘আশা করি কিছু পাব’, আনারের মরদেহ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘আমরা আশাবাদী আনারের মরদেহ পাব। আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, বসে নেই। বাংলাদেশ থেকে তিনজন গোয়েন্দা সদস্য সেখানে গেছেন।’
মরদেহ না পেলে তার আসন শূন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে না এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেটি স্পিকার জানেন। সংবিধান অনুযায়ী তিনি সিদ্ধান্ত দেবেন।’