বাবর আলী। ১৯ মে বাংলাদেশের ষষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেছেন। এর দুই দিন পর এভারেস্টের সঙ্গে লাগোয়া চতুর্থ শীর্ষতম পর্বতশৃঙ্গ লোৎসের চূড়ায় উঠলেন, দেশকে নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায়। তার আগে দেশের কারও একই সঙ্গে দুটি আট হাজার মিটার চূড়ায় ওঠার রেকর্ড নেই। পেশায় চিকিৎসক, নেশায় পর্বতারোহী এই অভিযাত্রী করেন লেখালেখিও। দেশে ফিরে শুনিয়েছেন বরফ দেশের উষ্ণ অভিজ্ঞতা। তরুণোদয়ের বন্ধুদের জন্য সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নাজমুস সাকিব রহমান
প্রত্যাবর্তন
দুই মাস পর দেশে ফিরেছি, অসাধারণ লাগছে। আমি জানতাম না আমার অভিযান নিয়ে এত মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হবে, যেহেতু এটা একটা ইন্ডিভিজুয়াল স্পোর্টস। এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না।
বান্দরবানে পায়েখড়ি
যদি ট্রেকিংয়ের কথা বলি সেটার শুরু ২০১০ সাল থেকে। আমাদের আছে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস, বান্দরবান। বান্দরবানেই আমাদের সবার পায়েখড়ি। হাতেখড়ি বলব না, ট্রেকিংয়ে পায়েখড়ি। আমাদের ওখানেই যাত্রা শুরু। ওখানে যেতে যেতে আমার আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে বেড়েছে। ২০১০ সাল থেকে ১৪ বার। ’১২, ’১৩, ’১৪ এই সময়টায় আমি প্রচুর ট্রেক করেছি। যেতে যেতে মনে হলো, আরে, আমি তো এখন পরের ধাপে যেতেই পারি! মনে হলো, অতি উচ্চতায় কখনো যাইনি, ওখানে আমার কেমন লাগে সেটা ফিল করতে চাই! বান্দরবান আমার ট্রেক লাইফ, মাউন্টেনারিং লাইফের অংশ। এটা বাদ দিয়ে আমি নই। এরপর শুরু হলো হিমালয় যাত্রা, যেটাকে আমরা বলি পর্বতযাত্রা।
সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৃথিবী দেখা
এভারেস্টে যাব এটা মাথায় আসে প্রথম যখন হিমালয়ে যাওয়া শুরু করি। অবচেতনভাবে একটা সংকল্প, একটা আকাক্সক্ষা ছিল। জীবনে কোনো একটা সময় পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতায় দাঁড়িয়ে বাকি পৃথিবী দেখার। ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করা শুরু করি, ২০১৪ সাল থেকে। প্রথমবার নেপাল যাওয়ার পর থেকে। প্রত্যেকবার যেটা করি পাহাড়টা আরেকটু চ্যালেঞ্জিং, আরেকটু টাফ খুঁজতাম। এভাবেই এগোতে এগোতে প্রতিবছর অভিযানে গিয়েছি। মাঝখানে কভিড-১৯ দুটো বছর কেড়ে নিয়েছে। ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করে এই জায়গায় এনেছি।
জুড়ে টাকা আনা পাই
পর্বতারোহণ খুব এক্সপেনসিভ স্পোর্টস। এর জন্য অলরেডি ৪৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বড় টাকা গিয়েছে নেপাল গভর্মেন্টের কাছে। পারমিট বাবদ পয়সা দিতে হয়। দুুটি পর্বতের ক্ষেত্রেই। এ ছাড়া ইন্স্যুরেন্স আর এসপিসিসি ফি। নানা ধরনের ফি আর কী। আমি এতদিন যা অ্যাডভেঞ্চার করেছি নিজের পয়সায়, এবারই প্রথম আমার নিজের সামর্থ্য নেই, এত টাকা দেওয়ার। আমার কিছু সেভিংস ছিল। বাকিটার জন্য, জীবনে প্রথমবারের মতো স্পন্সর খোঁজায় আগ্রহী হলাম। কীভাবে প্রপোজাল বানায় শিখলাম। বিভিন্ন কোম্পানির কাছে গেলাম। কিছু জায়গায় সাড়া পেয়েছি। বেশিরভাগ জায়গায় যেটা হয়ে থাকে, অনন্ত নীরবতা। পরে কিছুটা ক্রাউড ফান্ডিংও করেছি। আমার কিছু লোনও আছে।
এভারেস্টের চূড়ায় ৭০ মিনিট
একটা কথা বারবার মনে হচ্ছিল। এই চোখের অনেক কিছু দেখার বাকি ছিল। পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় দাঁড়িয়ে বাকি দুনিয়া দেখা। তিব্বতের দিকটায়, যেটা নেপাল-তিব্বতের বর্ডারে পড়েছে; আমার এত দারুণ লেগেছে। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি দিগন্ত পর্যন্ত। অসম্ভব ভালো লাগার। পাহাড়ই দেখা যায় চারপাশে। আমি যে কোনো চূড়ায় প্রথম দাঁড়ানোর পরেই ব্যাকপ্যাক থেকে যে জিনিসটা বের করি সেটা ডেফিনেটলি লাল-সবুজ পতাকা। যদিও এটি ইন্ডিভিজুয়াল স্পোর্টস। দলগত না। কিন্তু আমি কোনো চূড়ায় উঠলে দেশ তো খানিকটা হলেও ওপরে ওঠে। এটুকুই বিশ্বাস করি।
ফেরার পথে তুষার ঝড়ে
তুষার ঝড়ের মুখোমুখি হই এভারেস্টের চূড়া থেকে নামার সময়। তখন বেশিরভাগ কঠিন ধাপগুলো শেষ করে এসেছি। কিন্তু ব্যালকনি নামে একটা জায়গা আছে, যার ওপর গিরিশিরা আছে। মানে দুদিকে স্লোপি জায়গা, মাঝখানে হাঁটার জায়গা। ওই জায়গায় প্রথম তুষার ঝড়ের মুখে পড়ি। কিছু জিনিস থাকে যেগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কারণ প্রকৃতির ওপর কারও হাত নেই। মনে হচ্ছিল থেমে যাবে। কিন্তু এটা মোটামুটি আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। আমার সঙ্গে যে ক্লাইম্বিং গাইড ছিলেন তিনি বলছিলেন যে, আর এক-দেড় ঘণ্টা ঝড় যদি চলত তাহলে তুষার ধসে আমাদের মৃত্যু হতে পারত। অসম্ভব কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে ঝড়টা। চোখে মুখে বাতাসের ঝাপটা, তুষারের ঝাপটা। এমন একটা জায়গায় ছিলাম তখন যেখানে লুকানোর জন্য কোনো পাথর নেই। লুকানো বলতে আশ্রয় নেওয়া আর কী। আড়াই ঘণ্টা পর ঝড় থামলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম সবাই।
অতঃপর লোৎসে
এভারেস্ট চূড়া থেকে নেমে যাত্রা শুরু করার কথা লোৎসের উদ্দেশ্যে। লোৎসে অভিযানের জন্য দুদিন লাগার কথা ছিল না। প্ল্যান অনুযায়ী ২০ মে ক্লাইম্ব করতে পারতাম। আড়াই ঘণ্টা তুষার ধসে আটকে থাকা এবং ক্যাম্পে ফেরার পর আবহাওয়া বিগড়ে যাওয়ায় সময় বেশি লেগেছে। আমার ওইদিন লোৎসে ক্যাম্প করে চলে আসা লাগে। এটা যেহেতু আর হয়ে ওঠেনি আমার বেশ কিছুটা সময় কিল হয়। আমি ওইদিন এভারেস্টের ক্যাম্প ফোরের দিকে যাই।
শিক্ষা, পেশা, অগ্রাধিকার
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস করেছি। এরপর স্পেশালাইজেশন ডিগ্রি। এমপিএইচ করেছি। সেটি নিয়ে কাজ করেছি। আর থিতু ওইভাবে না হলেও আমি নানা জায়গায় চাকরি করেছি। অনেক আইএনজিও, কিছু ইউএনএ এজেন্সি; আমি এই মুহূর্তে আমাদের যেটা সবচেয়ে বড় রিফিউজি ক্যাম্প কক্সবাজারে সেটাতে কাজ করেছি। আইসিডিডিআরবিতেও কাজ করেছি। কিন্তু যখনই অ্যাডভেঞ্চার আর জবের মধ্যে বেছে নিতে হয়েছে, অ্যাডভেঞ্চার প্রায়োরিটি পেয়ে এসেছে।
এভারেস্টযাত্রা নিয়ে বই
আমার এভারেস্টযাত্রা নিয়ে আমি অনেক দিনলিপি লিখেছি। সেগুলো দিয়ে পরে বই করার ইচ্ছা আছে। এখন আমার হাতে আরও দুটি বইয়ের কাজ পেন্ডিং আছে। একটা কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী সাইকেল রাইড। আরেকটা আমা দাবলাম অভিযানের। সেগুলোও শেষ করতে হবে। তারপর আসবে এভারেস্টের পালা।
শ্রুতিলিখন : সুমন বৈদ্য
ছবি : আবুল কালাম আজাদ