ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া সিয়ামকে নেপালে আটক করা হয়েছে। তাকে আনার জন্য গতকাল শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল নেপালে গেছে। তারা সিয়ামকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি সন্দেহভাজন আরও একাধিক আসামির অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করবে।
আনার হত্যাকা- তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপালে ডিবির চার সদস্যের এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। এই দলে ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার আব্দুল আহাদ, অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শাহেদুর রহমান ও ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখার একজন কর্মকর্তা রয়েছেন।
নেপাল যাওয়ার আগে ডিএমপি ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এমপি আনার হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আখতারুজ্জামান শাহীনের অন্যতম সহযোগী সিয়াম নেপালে আটক হয়েছেন। এই খুনের সঙ্গে জড়িত আরও আসামি নেপালে আত্মগোপন করে থাকতে পারেন। সেসব বিষয়ে খোঁজ নিতে তদন্তের কাজের অংশ হিসেবে আমরা নেপাল যাচ্ছি।’
এর আগে গত ২৬ মে খুনের ঘটনা তদন্তে ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গে যায় ডিবির তদন্ত দল। সেই দলের নেতৃত্ব দেন ডিবিপ্রধান। সেখানে আটক হওয়া কসাই জিহাদ হাওলাদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তারা। আনারের মরদেহের অংশবিশেষ উদ্ধারের জন্য ভারতে থাকা জিহাদ ও বাংলাদেশে থাকা আসামিদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যে সঞ্জিভা গার্ডেনের সেপটিক ট্যাংক থেকে মাংস, হাড় ও চুলের কিছু অংশ উদ্ধার হয়; যা এমপি আনারের বলে ধারণা ডিবির। উদ্ধার হওয়া আলামত ঢাকায় এনে ডিএনএ টেস্টসহ ফরেনসিক পরীক্ষা করতে চায় ডিবি। সেই লক্ষ্যে তারা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে চিঠি দেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, আনারকে হত্যার পর তার মরদেহের কিছু অংশ বাইরে ফেলতে কসাই জিহাদ ও সিয়ামের বড় ভূমিকা রয়েছে। ঘটনার পর ভারত থেকে নেপালে পালিয়ে যান সিয়াম। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় আরেক ঘাতক মুস্তাফিজুর রহমানও নেপালে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিয়ামকে যদি দেশে ফেরানো যায়, তাহলে হত্যাকা-ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
ডিবির ভাষ্য, আনার হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া তিন থেকে চারজন এখনো গ্রেপ্তার হননি। তারা প্রত্যেকে নেপালে আত্মগোপন করে থাকতে পারেন। আবার নেপালের পার্শ্ববর্তী ভুটানসহ আশপাশের দেশগুলোয় পালিয়ে যেতে পারেন।
ডিবির পক্ষ থেকে ঘটনা জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবিকে গত ২৫ মে একটি চিঠি দেওয়া হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, ডিবির অনুরোধের পর পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি থেকে ভারত, নেপাল ও যুক্তরাষ্ট্রে এমপি আনার হত্যায় পলাতক আসামিদের অবস্থান এবং তাদের গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চেয়ে ইন্টারপোল সদর দপ্তরে ইতিমধ্যেই চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে আসামিদের নাম-পরিচয় এবং তাদের অপরাধের বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখার এআইজি মো. আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, কোনো অপরাধের ঘটনায় বিদেশে পালিয়ে যাওয়া অথবা আত্মগোপনে থাকা আসামিদের গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চেয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের যেকোনো ইউনিট যদি সহযোগিতা চায়; তাহলে এনসিবি শাখা থেকে সহযোগিতার বিষয়ে সমন্বয় করা হয়। এনসিবির কাজ হলো অন্যান্য দেশে ইন্টারপোলের মাধ্যমে আত্মগোপনে বা পালিয়ে যাওয়া যেকোনো আসামিকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চাওয়া। এমপি আনার হত্যায় কয়েকজন আসামির অবস্থান জানা ও তাদের গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চেয়ে সেই কাজটি করেছে এনসিবি।
কে এই সিয়াম
পুলিশ জানিয়েছে মো. সিয়াম হোসেনের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায়। এলাকায় সবাই তাকে চেনেন সাগর নামে। মূলবাড়ি বরিশালে হলেও বাবা মো. আলাউদ্দিন বালি ৪০-৪২ বছর আগে চাকরির সুবাদে বোরহানউদ্দিনে গিয়ে সেখানেই স্থায়ী হন। তারা বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভাড়া বাসায় থাকতেন। আনার খুনে সিয়ামের নাম আসার পর চার-পাঁচ দিন আগে বাসা পরিবর্তন করে স্থানীয় অন্য একটি বাসায় ওঠেন। সিয়াম এলাকায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিত।
সিয়ামের বাবার সহকর্মী ও প্রতিবেশীরা বলেন, তারা জানেন সিয়াম ঢাকার একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে ভালো বেতনে চাকরি করেন এবং চাকরির সুবাদে প্রায়ই ভারত ও নেপাল যান। বরিশাল, বোরহানউদ্দিন ও ঢাকায় সিয়াম প্রচুর জমি কিনেছেন। সম্প্রতি ২২ লাখ টাকা দিয়ে বরিশালেও একটি জমি কিনেছেন সিয়াম।
শাহীনকে ফেরাতে ভারত আবেদন করবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আনার হত্যাকান্ডের বিষয়ে গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যের হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে ভারতে। তাই হত্যা মামলাটিও ভারতে হয়েছে। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিবিনিময় চুক্তি রয়েছে। কাজেই ভারত সরকার তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) কাছে আবেদন করবে। যেহেতু ঘটনা ঘটেছে তাদের দেশে। আমাদের দেশে হলে আমরা আবেদন করতাম। তখন মূল মামলাটা আমাদের থাকত।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই উদ্বিগ্ন, যারা অপরাধী, যারা এই খুন করেছেন কিংবা যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদের আইন অনুযায়ী বিচার করা হবে। নেপালে যিনি (সিয়াম) আছেন, তাকে ফিরিয়ে আনতে সবধরনের ব্যবস্থা করা হবে।’
গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। সেখানেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। ১৮ মে পশ্চিমবঙ্গের বরানগর থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন তার বন্ধু বরানগরের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস। ২০ মে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে আনারকে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করার তথ্য জানায় ভারতীয় পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ঘাতকদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, ১৩ মে দুপুরেই আনারকে হত্যা করা হয়েছে।
আনার হত্যায় জড়িত সন্দেহে ঢাকায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন শিমুল, শিলাস্তি রহমান ও তানভীর ভূঁইয়াকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া মুম্বাইয়ের কসাই জিহাদ ১২ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, আনার হত্যাকান্ড নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। গতকাল কালীগঞ্জ সদরের ভূষণ স্কুলমাঠে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়নে নির্বাচিত সব প্রতিনিধি। জনপ্রতিনিধিদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম জাহাঙ্গীর সিদ্দিক ঠান্ডু।
লিখিত বক্তব্যে জাহাঙ্গীর সিদ্দিক আনারকে টানা তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য উল্লেখ করে বলেন, তার আগে পৌর কমিশনার ও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন আনার। তিনি নিখোঁজ বা হত্যার শিকার হতে পারেন, তা মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা আনারের ব্যবহৃত পাসপোর্ট, ঘড়ি, আংটি, চশমাসহ অন্যান্য জিনিসপত্র এবং কথিত রক্তমাখা পোশাক উদ্ধারের দাবি জানান।
আনারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলোর সর্বশেষ অবস্থান দফাওয়ারি তথ্য প্রকাশ করতে হবে। এই হত্যাকান্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক মৃত্যুর তথ্য প্রচার করা হয়েছে, যা জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এমতাবস্থায় হত্যাকান্ডের তদন্তপূর্বক সঠিক তথ্য প্রকাশের দাবি জানান তারা। খুনি জিহাদ মুম্বাইয়ে কখন থেকে কার অধীনে কসাইগিরি করতেন, তাও প্রকাশের দাবি জানান জনপ্রতিনিধিরা। খুনিরা হত্যাকান্ডে যেসব অস্ত্র ব্যবহার করেছেন, তার তথ্য এবং সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান তারা।
এ ছাড়া আনার সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার অনুরোধ জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে জাহাঙ্গীর সিদ্দিক ঠান্ডু বলেন, ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা মামলা ছাড়া আনারের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা ছিল না। আনারের বিরুদ্ধে কথিত মাদক, হুন্ডি, সোনা চোরাচালানের কোনো মামলার প্রমাণ থেকে থাকলে তা প্রকাশের দাবি জানান তিনি।