ওসমানী মেডিকেলে হাঁটু পানি, দুর্ভোগে রোগীরা

ভারী বৃষ্টিপাতে তীব্র জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে পড়েছেন সিলেট নগরবাসী। নগরীর সুরমা তীরবর্তী বাসা-বাড়িতে পানি জমেছে। এছাড়া তুলনামূলক নিচু এলাকার পাড়া-মহল্লার বাসা-বাড়ির নিচতলায় পানি উঠেছে। অনেক সড়ক ডুবে যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়ে পড়েছে। বাসা-বাড়ি, দোকানপাটের মূল্যবান জিনিসপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে।

গতকাল রবিবার রাত ১টার দিকে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়ে একটানা চলে কয়েকঘণ্টা। আর এতেই সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতার। রাত ২টার দিকেই অনেকের বাসায় পানি উঠতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে পানির উচ্চতা। ফলে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন নগরীর কয়েক হাজার মানুষ। আজ সোমবার সকালেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি আরও বাড়তে থাকে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নীচতলায়ও পানি উঠে যায়। এতে অনেক রোগীকে স্থানান্তর করতে হয়েছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা লোকজনও দুর্ভোগে পড়েন। একইসঙ্গে জলমগ্ন ওয়ার্ডগুলোতে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকটও। সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কয়েকটি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ভারী বৃষ্টিপাতে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি

তবে দুপুরের দিকে বৃষ্টি বন্ধ হলে ধীরে ধীরে কমতে থাকে নগরীর কিছু এলাকার পানি। সিলেট আবহাওয়া অফিস জানায়, সোমবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নগরীতে ৪৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ২২৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।

আজ সোমবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর শাহজালাল উপশহর, সোবহানীঘাট, তেররতন, যতরপুর, মাছিমপুর, ছড়ারপাড়, চালিবন্দর, মিরাবাজার, তালতলা, জামতলা,  ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেতেরবাজার, বাগবাড়ি, শেখঘাট, কাজিরবাজার, কলাপাড়া, বাদামবাগিচা, ইলাশকান্দিসহ আরও বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ি, দোকানপাট, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভেতর-বাইরে পানি জমেছে। শাহজালাল উপশহরের অনেক জায়গায় হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি উঠেছে। অনেকে বাধ্য হয়ে নোংরা পানি মাড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটেছেন। জলাবদ্ধতা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, পরিকল্পিত পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বর্ষায় তাদেরকে এই দুর্ভোগে পড়তে হয়। অথচ সিলেট সিটি করপোরেশন নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতিবছর বিপুল অর্থ খরচ করে। কিন্তু এতে কোন সুফলই মিলছে না। 

সরেজমিনে দেখা যায়, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রবেশ ফটক থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভবন, কলেজ ফটক, ছাত্রীনিবাস ও ছাত্রাবাসেও পানি উঠেছে। ফলে রোগী, স্বজন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন জানায়, সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৮টি ওয়ার্ডসহ ৯টি উপজেলার ৫৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা বন্যা কবলিত হয়েছে। এছাড়া ৯টি উপজেলার ৭৬১টি গ্রামের ৬ লাখ ১৪ হাজার ২৮২ জন বন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ১ হাজার ৩৮৪ জন অবস্থান করছেন। গত ১২ ঘণ্টায় ২৭৮ জন আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নিজেদের ঘরে ফিরে গেছেন। জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় এরই মধ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত ৪০০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১ হাজার ৪০০ বস্তা শুকনো খাবার, শিশু খাদ্যের জন্য ৯ লাখ টাকা ও গো খাদ্যের জন্য ৯ লাখ টাকা উপজেলা প্রশাসনের অনুকূলে উপবরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য ২৫ মেট্রিক টন চাল ও ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি চারটি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ও সিলেট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুশিশয়ারা নদীর অমলশিদ পয়েন্টে পানির বিপদসীমা ১৫ দশমিক ৪০ সেন্টিমিটার। সেখানে সোমবার সকাল ৯টায় ১৫ দশমিক ৯৩ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছিল। কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমা ৯ দশমিক ৪৫ সেন্টিমিটার। সেখানে সোমবার সকাল ৯টায় ৯ দশমিক ৬২ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছিল পানি।

ভারী বৃষ্টিপাতে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি

নগরীর জামতলা এলাকার বাসিন্দা ও সিলেট সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি রজতকান্তি গুপ্ত জানান, রবিবার রাতে তার ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করে। এর আগে ২০২২ সালের বন্যার সময়ও পানি ঢুকেছিল। অথচ তখন বন্যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে বার—বার এই দুর্ভোগ পোহাতে হত না।

মির্জাজাঙ্গাল এলাকার বাসিন্দা আইনজীবী দেবব্রত চৌধুরী লিটন বলেন, ‘আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় আরেকটি নির্ঘুম রাত কাটল রবিবার। রাত একটায় একবার ঘরে পানি ঢুকে। ঘরের সবাই মিলে পানি সেচে বের করি। ভোর ৪ টার দিকে আবার ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। ঘরের সব আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে।’

নগরীর যতরপুর এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরেই রাস্তাঘাটে পানি ছিল। কিন্তু গতকাল রাতের বৃষ্টির পর এখন বাসার ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। রাত থেকেই বাচ্চাদের নিয়ে কষ্ট করছি। পানি কমার কোন লক্ষণ নেই, কেবল বেড়েই চলছে’।

নগরীর শাহজালাল উপশহরের ডি ব্লকের বাসিন্দা শাহাজান আহমদ জানান, তার ঘরের ভেতরে হাঁটু পানি, সড়কে কোমর সমান পানি। না ঘরে থাকতে পারছেন, না বাইরে বের হতে পারছেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. শিশির রঞ্জন চক্রবর্তী জানান, মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে পানি জমে থাকায় সোমবারের ক্লাস ও পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। অবস্থা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা সাজলু লস্কর জানান, রবিবার মধ্যরাত থেকে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে বন্যার কারণে সুরমা নদীর পানিও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নগরের পানি ছড়া—খাল দিয়ে নদীতে গিয়ে নামতে পারছে না। কোথাও কোথাও বরং নদীর পানি ছড়া দিয়ে নগরে ঢুকেছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্র চালু, শুকনো খাবার বিতরণসহ অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সিটি করপোরেশন।