রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি বেড়ে ৮৫ হাজার কোটি

নানা আলোচনা-সমালোচনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ির মধ্যেই আবারও খেলাপি ঋণ বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৮৭০ কোটি। গত ডিসেম্বর চেয়ে খেলাপি বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। ৩ মাসের ব্যবধানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি বেড়েছে ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর মধ্যে টাকার অংকে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি জনতা ব্যাংকের। তবে শতাংশের হিসেবে বেসিক ব্যাংক শীর্ষে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৬৩ শতাংশই খেলাপি। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি বেড়েছে ৮৮ কোটি টাকা বা ১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৮ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।

গত ডিসেম্বরে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১৭ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। কিন্তু মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি বেড়েছে ১২ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বা ৭৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। খেলাপিতে পরের অবস্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। মার্চ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৮ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে যা ছিল ১৮ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি বেড়েছে ২ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণে টাকার অংকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। তিন মাসে ব্যাংকটির খেলাপি বেড়েছে ১ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা বা ১৪ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশই খেলাপি।

রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে রূপালী ব্যাংক। গত মার্চ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমান দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২১ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি—মার্চ) রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি কমেছে একমাত্র বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল)। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৯৮২ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৭৪ কোটি টাকা। সে হিসেবে ব্যাংকটির খেলাপি কমেছে ১০৮ কোটি টাকা বা ১১ শতাংশ। যদিও এই ব্যাংককেই জোর করে একীভূত করা হচ্ছে সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের সদিচ্ছা যদি থাকে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যদি শক্ত অবস্থান নেয়, তাহলেই খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বলে দেয়, খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারলে পারফরম্যান্স নেতিবাচক ধরে সব রকম সুযোগ—সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হবে, তাহলেই খেলাপি ঋণ আদায় কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো ঋণখেলাপিদের আরও ছাড় দেওয়া, সময় বাড়িয়ে দেওয়া, সহজ শর্তে পুনঃতপশিল করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের যে অভাব সেটা দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। যেসব কর্মকাণ্ড আগে ঘটে গেছে তা আস্তে আস্তে বড় হয়ে আসছে এবং নতুন নতুন কর্মকাণ্ড ঘটছে। যেহেতু পুরনো অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে না কাজেই নতুন অপরাধী জন্ম নিচ্ছে। এটা বিভিন্নভাবে আমাদের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ব্যাংকিং খাতটাই ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে। মানুষ যদিও এখন ভালো ব্যাংকগুলাতে টাকা রাখছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব ভালো ব্যাংকগুলোর ওপরও পড়তে পারে। যদি পুরো ব্যাংকিং খাত ধসের মুখে পড়ে তবে ভালো ব্যাংকগুলোও নিরাপদ থাকবে না। তাই এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।

ঋণ অবলোপন, পুনঃতফসিল, উচ্চ আদালতে মামলার কারণে খেলাপি না দেখানো ও ঋণ পুনর্গঠন মিলিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানায় সিপিডি। দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত খেলাপি ঋণের তথ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বরাবরই আপত্তি জানিয়ে আসছে।