মূল্যস্ফীতি ডলার বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতির চলমান-সংকট ও বিদেশি ঋণপ্রাপ্তি কমে যাওয়ার সম্ভাবনায় আসন্ন বাজেটে আকারের প্রবৃদ্ধি কমছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটের চেয়ে মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। অন্যান্য বছরে অন্তত ১২-১৫ শতাংশ বাড়িয়ে বাজেট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। জিডিপির অনুপাতে ঘাটতি কমিয়ে আনা হচ্ছে। এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি ও বিদেশি মুদ্রার সংকট। সঙ্গে রয়েছে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আয়ের চ্যালেঞ্জ।

তবে আসন্ন বাজেট প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত। ঋণের বিনিময়ে সংস্থাটির শর্ত মানতে গিয়ে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা মূলত সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ঘাড়েই পড়ছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে গিয়ে সাধারণের ওপর করের বোঝা আরও বাড়াতে হচ্ছে। আবার বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে বিদেশি ঋণের চেয়ে এবার অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রতি সরকারকে ঝোঁক বাড়াতে হয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ যেমন কমবে, তেমনি কর্মসংস্থানেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের শিরোনাম ‘সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের শিরোনামের কতটুকু আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য, তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন তৈরি হবে।

চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তা থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনা হয়েছে সংশোধিত বাজেটে। সব মিলিয়ে ২১ হাজার কোটি টাকা কমেছে কর আয়। ফলে সংশোধিত বাজেটের আকার কমিয়ে ৭ লাখ ১৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেটে ব্যয়ের প্রাক্কলন ছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

অন্যান্য বছরের মতো এবারও বাজেট ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মেটাতে হবে ঋণ করে। তবে সেই ঋণও নিশ্চিত নয়, বিশেষ করে বিদেশি ঋণ। চলতি অর্থবছরে কাক্সিক্ষত বিদেশি ঋণ না পাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এ খাতের ঋণপ্রাপ্তি কমানো হয়েছে ২৫ শতাংশের বেশি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি (অনুদান ছাড়া) ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ঘাটতি পূরণে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। যদিও প্রকৃত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। কারণ বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। ঋণের ছাড় আগের তুলনায় খুব একটা না বাড়ায় সংশোধিত বাজেটে এবার বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে ৭৬ হাজার ২৯৩ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মূল বাজেটের চেয়ে ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে সব মিলিয়ে ৬২৮ কোটি ডলারের ঋণ দেশে এসেছে।

ঘাটতি মেটাতে এবারও অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপরই নির্ভরতা বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদেশি ঋণ কম আসায় ব্যাংক খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রার বেশি ঋণ নেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও, সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই আগামী বাজেটে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ব্যাংকঋণ কম নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বেড়ে যেতে পারে। আসন্ন বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ও অন্যান্য উৎস থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যদিও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে সরকারের ৪ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার কর রাজস্ব আদায় করার কথা। সে হিসেবে সরকারের ও আইএমএফের লক্ষ্য কাছাকাছিই থাকছে। আসন্ন বাজেটে এনবিআরবহির্ভূত কর আসবে আরও ১৫ হাজার কোটি টাকা আর কর ছাড়া প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি অনুদান ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

আগামী বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা, যা চলতি মূল বাজেট থেকে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে আয় কমে যাওয়ায় পরিচালন ব্যয় ২২ হাজার ৩৫ কোটি টাকা কমিয়ে আনা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা পরিচালন ব্যয়ের ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। বিদেশি ঋণের সুদ গত দুই বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

অতীতের রেকর্ড ভেঙে বাজেটের প্রায় ৬৪ শতাংশ অর্থ পরিচালন ব্যয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবার। একরকম বাধ্য হয়েই আরও ১৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হবে ঋণের সুদ পরিশোধে। ফলে উন্নয়নে অর্থের বরাদ্দ নেমে এসেছে ৩০ শতাংশের আশপাশে।

অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ১৮ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে এডিপির আকার করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা।