নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সুসংহত করতে ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন করে সরকার। এ আইনে ৮টি অধ্যায় ও ৩৭টি ধারা রয়েছে। তবে, আইনে শব্দচয়নে কিছু অসংগতি ও অস্পষ্টতা, আইনের প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা ও আপত্তি ছিল সুধীমহলে। এরই ধারাবাহিকতায় আইনটি সংশোধনে তাগিদ অনুভব করছে খোদ তথ্য কমিশন। এই লক্ষ্যে আইন কমিশনের কাছে সুপারিশ ও মতামত চেয়ে চাহিদাপত্র পাঠানোর পর আইন কমিশন তথ্য অধিকার আইন সংশোধনে ধারণাপত্র ও সুপারিশ তৈরি করে তথ্য কমিশনে পাঠিয়েছে। এতে ২০টির বেশি ধারা-উপধারার অস্পষ্টতাসহ মতামত ও প্রস্তাব তুলে ধরেছে আইন কমিশন। কমিশনের অভিমত হলো, ২০০৯-এ আইনটি হওয়ার পর এটি বাস্তবায়নে প্রায়োগিক কিছু বাধা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আইনে অনেক বিষয়ে অস্পষ্টতা, সীমাবদ্ধতাও আছে, যা এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণ ও প্রত্যাশিত ফল লাভে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। ধারণাপত্র ও সুপারিশ তৈরি করতে কিছুদিন আগে আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা (জেলা ও দায়রা জজ) ড. মোহাম্মদ মোরশেদ ইমতিয়াজ, গবেষণা কর্মকর্তা সোনিয়া আহমেদ (অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ) ও অনুবাদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন চৌধুরীর (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দেন কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে প্রস্তাবনা ও সুপারিশ তৈরির পর এটি ইতিমধ্যে আইন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হয়েছে।
তথ্য কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সুপারিশ যাচাই ও পর্যালোচনার লক্ষ্যে তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম ঝিনুকের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির পর্যালোচনা শেষে তা আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হবে। তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম ঝিনুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তথ্য অধিকার আইনটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, এটি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি আরও যুগোপযোগী করলে তথ্যপ্রাপ্তি, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি আরও সহজতর হবে। এর অংশ হিসেবে আইন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা হয়।’ তিনি বলেন, ‘সুপারিশ ও মতামত আমরা পেয়েছি। এটি যাচাই শেষে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’
বাছাই কমিটির সভাপতি হিসেবে স্পিকারের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব : বিদ্যমান তথ্য অধিকার আইনের ১৪(১)(ক) উপধারা অনুযায়ী তথ্য কমিশন গঠনে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতিকে সভাপতি করে বাছাই কমিটি হবে। সুপারিশে বলা হয়েছে, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলার পর্যবেক্ষণ এই যে, ‘প্রশাসনিক বিষয়াদি থেকে বিচারককে বিযুক্ত রাখা সমীচীন।’ এই বিষয়টি বিবেচনায় জাতীয় সংসদের স্পিকারকে বাছাই কমিটির সভাপতি করা যেতে পারে। এ ছাড়া কমিটিতে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী, তথ্য সচিব এবং সরকার কর্তৃক মনোনীত সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধিকে রাখা যেতে পারে।
তথ্য কমিশনার নিয়োগে বয়সসীমায় আপত্তি আইন কমিশনের : বিদ্যমান আইনে ১৫(২) উপধারায় প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার (তিনজনের কমিশন) নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৬৭ বছরের বেশি হবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। আইন কমিশনের অভিমত হলো, এ ধরনের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের কোনো সীমা থাকা উচিত নয়। কারণ এই পদে নিয়োগ লাভের জন্য শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ছাড়া অন্য কোনো বিষয় বাধা হতে পারে না। বয়সসীমার কারণে অধিকতর যোগ্য লোক এই পদে নিয়োগের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিবেচনায় (২) উপধারা বিয়োজন করা যেতে পারে। অন্যদিকে ১৫(৩) উপধারায় প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার নিয়োগ লাভের তারিখ থেকে ৫ বছর কিংবা ৬৭ বছর যেটি আগে পূর্ণ হয়, স্বীয় পদে বহাল থাকবেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন কমিশনের অভিমত হলো, প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার নিয়োগে লাভের পর তিন বছর পর্যন্ত পদে থাকবেন।
কমিশনারদের পুনর্নিয়োগ বারিত (নিষিদ্ধ) না করার প্রস্তাব : বিদ্যমান আইনে ১৫(৪) উপধারা প্রধান তথ্য কমিশনারের ক্ষেত্রে আবার নিয়োগ বারিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন কমিশন মনে করে, এর ফলে অধিকতর দক্ষ, অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তির সেবাপ্রাপ্তিতে এটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংশোধনের তাগিদ দিয়ে কমিশনের অভিমত হলো, যেহেতু প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬৭ বছর বয়সের বাধাটি বিয়োজনের সুপারিশ করা হয়েছে এবং মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে, তাই অধিকতর দক্ষ, অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তির সেবা দীর্ঘ সময় প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সৃষ্ট বাধা অপসারণের লক্ষ্যে প্রধান তথ্য কমিশনার ও অন্য কমিশনাররা একই পদে আবার নিয়োগ লাভে অযোগ্য হবেন না।
জরিমানা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর তাগিদ : বিদ্যমান আইনের ২৭(১) উপধারায় তথ্যপ্রাপ্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান রয়েছে। আইন কমিশনের মতে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি সংশ্লিষ্ট ইউনিটপ্রধানের কারণে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, সে ক্ষেত্রে তথ্য প্রদান ইউনিটের প্রশাসনিক প্রধানকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে এই ধারায় ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ শব্দচয়নের পরে ‘ক্ষেত্রমতে সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রদান ইউনিটের প্রশাসনিক প্রধান’ শব্দ যুক্ত করার কথা বলেছে আইন কমিশন। অন্যদিকে তথ্য প্রদানে ব্যর্থতায় তথ্য অধিকার আইনের ২৭(১) ধারায় উল্লিখিত জরিমানার হার দৈনিক ৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে আইন কমিশন।
কোনো তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়, তা বিস্মৃত করার প্রস্তাব : আইনের ৭ ধারায় ‘কতিপয় তথ্য প্রকাশ বা প্রদান বাধ্যতামূলক নয়’ শিরোনামে প্রদত্ত তালিকা আরও বিস্মৃত করার প্রস্তাব দিয়ে আইন কমিশন বলেছে, ৭(ন) উপধারায়, ‘কোনো রোগীর, রোগ বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো তথ্য, আদালতের আদেশ বা ক্ষেত্রমতে তার স্বামী/স্ত্রী/পুত্র/কন্যা/পিতা-মাতা/বা তাদের অনুপস্থিতিতে ভ্রাতা/ভগ্নির অনুমতি সাপেক্ষে উক্ত তথ্য প্রকাশ করা যাবে।’ এ শব্দচয়ন যুক্ত করা যেতে পারে। এ ছাড়া একই ধারার (ন) উপধারায় ‘মন্ত্রিপরিষদ’ শব্দের পর ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ শব্দচয়নে আপত্তি জানিয়ে কমিশনের যুক্তি হলো, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক শব্দ বাতিল হয়ে যাওয়ায় উপদেষ্টা পরিষদের এখন আর অস্তিত্ব নেই। তাই ‘উপদেষ্টা’ শব্দচয়ন বিয়োজনের তাগিদ দিয়েছে আইন কমিশন।
আইন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, প্রচলিত আইনে কর্মকর্তার সংজ্ঞায় কর্মচারীকেও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হলেও কর্মকর্তা বলতে কী বোঝায় সে বিষয়ে আইনে কোনো ব্যাখ্যা নেই। এ নিয়ে আইন কমিশনের প্রস্তাব হলো, ‘কর্মকর্তা’ অর্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মে বেতনাদিভুক্ত পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত কোনো ব্যক্তি এবং একই অর্থে কর্মচারীও অন্তর্ভুক্ত হবে। এ ছাড়া প্রচলিত আইনে ‘আপিল’র পরিবর্তে ‘রিভিউ’র বিধান ‘দিন’র পরিবর্তে ‘কর্মদিবস’, ‘ফ্যাক্স নম্বর’ শব্দটির পরে ব্যক্তির দাপ্তরিক ও মোবাইল ফোন নম্বর শব্দ অন্তর্ভুক্ত করাসহ বেশ কিছু শব্দচয়ন পরিবর্তন ও সংযোজনের কথা বলেছে কমিশন।
আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা মোরশেদ ইমতিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তথ্য কমিশন চাহিদাপত্র দিয়েছিল। আমরা আমাদের কাজ করে দিয়েছি। এখন পরবর্তী করণীয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন।’