দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অন্তত দুই বছর আগে থেকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল বিএনপি। নির্বাচনের গত বছরের শেষের দিকে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে এক দফার আন্দোলন শুরু করে দলটি। কিন্তু অক্টোবরের শেষদিকে মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় সরকারের ধরপাকড়ের মধ্যে টানা হরতাল অবরোধ করেও সফল হয়নি বিএনপি। আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পেছনের কারণগুলো খুঁজতে গিয়ে দলটির নেতারা বেশ কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ছাত্র ও শ্রমিকদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত না করতে পারা।
দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে আন্দোলন পর্যালোচনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। শ্রমজীবীদের সুংসগঠিত ও ছাত্র আন্দোলন জোরালো করতে পারলে সফল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো বলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি মনে করে। গত সপ্তাহে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠক হয়।
বৈঠকে থাকা একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, দলীয় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন নিয়ে বৈঠকে আলোচনার এক পর্যায়ে উঠে এসেছে যে, দেশের সবচেয়ে বড় অংশ খেটেখাওয়া দিনমজুররা এখন বিচ্ছিন্ন। তারা সংগঠিত নয়। এককভাবে প্রতিবাদ করার অনেকের সাহস থাকলেও কার্যকরী ভূমিকা তারা নিতে পারছে না। তারা মৌলিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কৃষি, প্রবাসী আয় ও তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। অথচ এ খাতগুলোর সঙ্গে জড়িত শ্রমজীবীরাই দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপকভাবে অবহেলিত। তারা তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাচ্ছে না। হয়রানির শিকার হচ্ছে পদে পদে। তাদের বিএনপি ঘোষিত এক দফার আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা যায়নি। জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে তাদের অধিকাংশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আন্দোলনের ফল ঘরে তোলার সুযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক দফার আন্দোলনের ব্যর্থতা খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু কারণ আমরা পেয়েছি। তার মধ্যে ছাত্র ও শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকা অন্যতম কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। আমরা আন্দোলনের মধ্যেই আছি। এটি আরও কঠোর করা হবে সেপ্টেম্বরের দিকে।’
বিএনপি এখন শ্রমজীবীদের সংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর দায়িত্বে থাকা বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, “বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘তিনি একজন শ্রমিক এবং এই পরিচয়ে তিনি গর্বিত’। শহীদ জিয়া শ্রমজীবী মানুষকে সম্মানিত করেছিলেন। তার আদর্শকে সামনে রেখে আমরা নতুন করে শ্রমজীবীদের সংঘবদ্ধ করতে চাই।”
শ্রমজীবীদের জাগিয়ে তোলার বিষয়ে বিএনপি হাইকমান্ডের নির্দেশনার পর ইতিমধ্যে কাজও শুরু করেছে দলের একটি কমিটি। ওই কমিটিতে শ্রমিক দলের নেতারা ছাড়াও বিএনপির সিনিয়র নেতারা যুক্ত আছেন, যাদের শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সারা দেশের ১০টি বিভাগে শ্রমজীবীদের নিয়ে কর্মশালা করার উদ্যোগ নিয়েছে ওই কমিটি। জানা গেছে, ২৯ জুন চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মশালার মধ্য দিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হবে। পরে ৬ জুলাই ময়মনসিংহ, ১৩ জুলাই খুলনা, ৩০ জুলাই সিলেট, ২৭ আগস্ট রাজশাহী ও ৭ সেপ্টেম্বর এ কর্মসূচি হবে।
এসব তথ্য জানিয়ে শ্রমিক দলের দপ্তর সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাকি তিনটি বিভাগে ভেন্যু পাওয়া সাপেক্ষে তারিখ নির্ধারণ করা হবে।’ তিনি জানান, পর্র্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলায়ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রত্যেক থানা-উপজেলা, পৌর এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এক দিনের এ কর্মশালায় আন্দোলন-সংগ্রামে শ্রমিকদের শক্তি ও দুর্বলতা নির্ধারণ, নিবন্ধিত শ্রমিক সংগঠনের সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা ও পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য করণীয় কৌশল নির্ধারণ নিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
এসব কর্মসূচি পালনের জন্য বিএনপি গঠিত কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শ্রমিক দলের প্রধান উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান। তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকছেন শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম, দপ্তর সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু প্রমুখ।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক দলের নেতারা জানান, বিভাগওয়ারি প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। সারা দেশে কর্মশালা শেষে তারা শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করবেন। আগামী এক বছরের মধ্যে ওই কাউন্সিল হবে বলে তারা আশা করছেন।
শ্রমিক দলসংশ্লিষ্ট নেতারা আরও বলছেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশ-বিদেশে এখন শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে ১ কোটি শ্রমিক শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই কর্মরত। আর ৪০ লাখ কাজ করছে সারা দেশের গার্মেন্ট সেক্টরে। আবার প্রায় এক কোটি শ্রমিক নিবন্ধিত শ্রমিক সংগঠনের আওতায় থাকলেও বাকিরা বিক্ষিপ্তভাবে রয়ে গেছে। তাদের কোনো সংগঠন নেই, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্ল্যাটফর্মও নেই। নিবন্ধিতদের মধ্যে গার্মেন্ট, পরিবহন, হকারসহ অনেক সংগঠন রয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সবাইকে টার্গেট করা হয়েছে। তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন করতে, দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে নিজেদের অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার করতেই এ কর্মসূচি নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।
ওই নেতারা বলছেন, দিনমজুররা মৌলিক ও নাগরিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। শ্রমিকদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা গেলে জাতীয় বেতন স্কেল, মজুরি কমিশন, সব ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা, শ্রমিক শোষণ বন্ধ, ধনী-গরিবের আয়-ব্যয়ের বৈষম্য দূরীকরণ, পাট, চিনিসহ বন্ধ মিলকারখানা চালু, শ্রমিকের জন্য রেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা, শ্রমিকের সন্তানদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থার দাবিসহ বাংলাদেশের হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনে একটি ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা সম্ভব।
শিমুল বিশ্বাস জানান, অতীতে ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তাও আলোচিত হয়েছে। যেকোনো পরিবর্তন দ্রুত ও অপরিহার্য করতে ছাত্রদের পাশাপাশি শ্রমিকদের ভূমিকা লাগবে। ছাত্রদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত করা গেলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এর প্রভাব পড়তে পারে।’