ঈদের সড়কে ঝরল ১২ প্রাণ সাত দুর্ঘটনার ৬টিই সকালে

দেশের বিভিন্ন স্থানে ঈদযাত্রার ব্যস্ত সড়কে দুর্ঘটনায় নারী শিশুসহ ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে আরও ১৭ জন। তাদের গুরুতর অবস্থায় বিভিন্ন হাসপালে ভর্তি করা হয়েছে। দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ, একটির সঙ্গে আরেকটির ধাক্কা, বাসচাপায় প্রাণ হারাতে হয়েছে ১২ জনকে। সাতটি দুর্ঘটনার ছয়টিই সকালে।

এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার সকালে বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে একটি থ্রি-হুইলার ও অটোরিকশার সংঘর্ষে শিশুসহ দুজন নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও চারজন।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নড়াইল-ঢাকা মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক তরুণ নিহত হয়েছে। ঈদে চাচার বাড়ি থেকে তার গ্রামের বাড়ি লোহাগড়ার কাশিপুর যাচ্ছিল। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি কাভার্ড ভ্যানকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে প্রাণ হারিয়েছে কাভার্ড ভ্যানের চালক।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও মির্জাপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে আরও তিনজন। ময়মনসিংহের নান্দাইলে বাসচাপায় এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শিশুসহ আরও নয়জন আহত হয়েছে। ঈদ স্পেশাল সার্ভিস নামে একটি বাসের চাপায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। গাজীপুর সদর উপজেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন।

বিকেলে নরসিংদীতে কাভার্ড ভ্যানের চাপায় এক রিকশা আরোহী নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও একজন।

বরিশালে শিশুসহ নিহত ২ : বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কের বাখরকাঠি এলাকায় সিএনজিচালিত একটি থ্রি-হুইলার ও অটোরিকশার সংঘর্ষে শিশুসহ দুজন নিহত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে বাকেরগঞ্জ থানাধীন বাখরকাঠি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে (শেবাচিম) ভর্তি করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন থ্রি-হুইলার চালক বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরাদী এলাকার সাইদুল ইসলাম (৪০)। একই উপজেলার বাগদিয়া এলাকার মেজবাহ উদ্দিন অপুর ছেলে ও থ্রি-হুইলারের যাত্রী শিশু জায়ান (৪)।

বাকেরগঞ্জ থানার ওসি আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, সকাল ৭টার দিকে তিনটি যানবাহনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুজন নিহত ও দুজন আহত হওয়ার খবর রয়েছে। নিহতদের মরদেহ শেবাচিমের মর্গে রয়েছে। তবে কীভাবে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে তা তদন্ত না করে বলা সম্ভব নয়।

হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আবুল কালাম হতাহতদের বরাতে জানান, নিহত জায়ান সাইদুল ইসলামের সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলারের যাত্রী ছিল। সাইদুলকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। জায়ান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।

নড়াইলে কিশোর নিহত : নড়াইলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নাঈম শেখ (১৭) নামে এক কিশোর নিহত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নড়াইল-ঢাকা মহাসড়কের সদর উপজেলার হাওয়াইখালী সেতু এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নাঈম নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ঈশানগাতী গ্রামের ওহিদ শেখের ছেলে।

পুলিশ ও নিহতের পরিবার জানায়, নাঈম শেখ শুক্রবার সকালে নড়াইল শহরে তার চাচা তুষার শেখের বাড়ি থেকে গ্রামের বাড়ি নড়াইল থেকে মোটরসাইকেলে ঈশানগাতী গ্রামে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে হাওয়াইখালী সেতু এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিকআপের পেছনে ধাক্কা দেয়। এ সময় নাঈমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। প্রচন্ড রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই নাঈমের মৃত্যু হয়।

চৌদ্দগ্রামে কাভার্ড ভ্যান চালক নিহত : কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি কাভার্ড ভ্যানকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে প্রাণ হারিয়েছে কাভার্ড ভ্যানের চালক। তার নাম বাহাদুর মিয়া (৩২)। গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আমানগন্ডা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল ৭টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আমানগন্ডা এলাকায় ঢাকামুখী লেনে ঢাকাগামী একটি কাভার্ড ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনের চলন্ত অন্য একটি গাড়িকে ধাক্কা দেয়। এতে কাভার্ড ভ্যানের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং চালক বাহাদুর মিয়া ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

টাঙ্গাইলে নিহত ৪ : টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও মির্জাপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে আরও তিনজন। গতকাল শুক্রবার ভোরে টাঙ্গাইল-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বাগুটিয়ার বঙ্গবন্ধু টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (বিটেক) সামনে প্রাইভেট কার ও গরুভর্তি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছে। যাত্রীবাহী প্রাইভেট কার কুমিল্লা থেকে জামালপুরে যাচ্ছিল।

নিহতরা হলেন জামালপুর জেলা কালচারাল অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুনের ছেলে আবদুল্লাহ আল অক্ষর (৬), ও তার নানিশাশুড়ি হুসেইনে আরা (৬৮), প্রাইভেট কার চালক কুমিল্লার আবদুল কদ্দুস মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৩৮)।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, একটি যাত্রীবাহী প্রাইভেট কার কুমিল্লা থেকে জামালপুরে যাচ্ছিল। প্রাইভেট কারটি টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়কের কালিহাতী উপজেলার বাগুটিয়া এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা গরুভর্তি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাইভেট কার চালক আবুল হোসেন মারা যান। এ ঘটনায় আহত পাঁচজনকে উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশু আল অক্ষর ও হুসেইনে আরা মারা যায়। এ ঘটনায় আহত তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নুরুজ্জামান হুদা নামে একজন প্রাণ হারিয়েছেন। তিনি ঈদে মোটরসাইকেল যোগে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে মোটরসাইকেলটি মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আইল্যান্ডের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।

নরসিংদীতে রিকশা আরোহী নিহত : নরসিংদীতে কাভার্ড ভ্যানের চাপায় নাইম মিয়া (২৮) নামের এক রিকশা আরোহী নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন রিকশাচালক। গতকাল শুক্রবার বিকেলে সদর উপজেলার পাঁচদোনা-টঙ্গী আঞ্চলিক সড়কের নগর পাঁচদোনায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত নাইম মিয়া নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী পৌরসভার টাটাপাড়া এলাকার আনিস মিয়ার ছেলে। তিনি পেশায় খুচরা কাপড় বিক্রেতা।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, মাধবদী থেকে গজ ও প্রিন্ট কাপড় নিয়ে বিক্রির জন্য পলাশের ঘোড়াশাল ভ্রাম্যমাণ কাপড়ের বাজারে যাচ্ছিলেন নাইম মিয়া। তাকে বহনকারী রিকশাটি পাঁচদোনা-টঙ্গী আঞ্চলিক সড়কের নগর পাঁচদোনার পাকিজা গ্রুপের পোশাক কারখানা মমটেক্সের গেটে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কাভার্ড ভ্যান অন্য একটি গাড়িকে পাশ কাটিয়ে সামনে আসার সময় রিকশাকে চাপা দেয়।

নান্দাইলে যুবক নিহত : ময়মনসিংহের নান্দাইলে বাসচাপায় এক যুবক নিহত হয়েছেন। তার নাম মাসুদ মিয়া (৪০)। গতকাল শুক্রবার সকালে নান্দাইল চৌরাস্তা টু কেন্দুয়া রোডের দক্ষিণ বাঁশহাটির বুটান নামক স্থানে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শিশুসহ আরও নয়জন আহত হয়েছে। তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদ সার্ভিস নামে কেন্দুয়া টু ঢাকাগামী যাতায়াত বাসটি বিপরীতমুখী দুটি ইজিবাইককে সরাসরি চাপ দিলে গাড়ি দুটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে তিন শিশু, তিন নারী ও চার পুরুষ গুরুতর আহত হয়। এর মধ্যে কেন্দুয়া উপজেলার মাসুদ মিয়ার হাসপাতালে মৃত্যু হয়।

গাজীপুরে নিহত ২ : গাজীপুর সদর উপজেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় কাওসার (২২) ও আবদুল লতিফ (৪২) নামে দুজন নিহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ভোরে উপজেলার রক্ষিতপাড়া এলাকায় ও বেলা ১১টার দিকে বানিয়ারচালা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার দুটি ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গাজীপুরের সদর উপজেলার জয়দেবপুর থানাধীন রক্ষিতপাড়া এলাকায় ভোর ৪টার দিকে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী একটি মুরগিবোঝাই পিকআপ অলিম্পিক নামের কারখানার সামনে পৌঁছালে গাড়িটি বিকল হয়ে যায়। পরে পিকআপটির গাড়ির হেলপার গাড়িটির পেছনে এসে ধাক্কা দিয়ে মহাসড়কের পাশে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। এ সময় ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী একটি কাভার্ড ভ্যান পেছন দিক থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে মুরগির গাড়ির হেলপার কাওসার ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

অন্যদিকে সদর উপজেলার বাঘের বাজার বানিয়ারচালা এলাকার বেলা ১১টার দিকে পাথর কারখানাসংলগ্ন স্থানে রাস্তা পারাপারের সময় অটোরিকশাচালক দুলু মুন্সী বাঘের বাজার থেকে সাফারি পার্কের দিকে বেপরোয়া গতিতে যাওয়ার সময় আবদুল লতিফকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে আবদুল লতিফ রাস্তার ওপর পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে স্থানীয় ও স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে দুপুর ১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত আবদুল লতিফ বানিয়ারচালা এলাকার স্থানীয় আবদুল আলীমের ছেলে।