সাংবাদিক নাদিম হত্যার বছরপূর্তি: হয়নি চার্জশিট, হতাশায় পরিবার

জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম হত্যার এক বছর অতিবাহিত হলেও মামলায় নেই কোনো অগ্রগতি। এক বছরেও এই আলোচিত মামলার চার্জশিট দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মামলার প্রধান আসামি মাহমুদুল হাসান বাবু চেয়ারম্যান কারাগারে থাকলেও তার ছেলে ফাহিম ফয়সাল রিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, রয়েছেন ধরছোঁয়ার বাইরে। এদিকে জামিন পেয়েছেন অনেক আসামি। এ অবস্থায় বিচার পাওয়া নিয়ে হতাশায় নাদিমের পরিবার।

মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৪ জুন সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কমের সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম। পরের দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ১৭ জুন নাদিমের স্ত্রী বাদী হয়ে মাহমুদুল হাসান বাবু চেয়ারম্যান ও তার ছেলে ফাহিম ফয়সাল রিফাতসহ ২২ জনের নামে ও ২০/২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় প্রধান আসামি বাবু চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন কারাগারে থাকলেও জামিনে রয়েছেন অনেকে। এখনো মামলার দ্বিতীয় আসামি চেয়ারম্যানের ছেলে রিফাত রযেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামলাটি প্রথমেই পুলিশ ও পরে পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিবি) তদন্তের করেন। বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন। এ হত্যা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। মামলার অনেক আসামি জামিনে থাকায় এবং চার্জশিট দিতে বিলম্ব হওয়ায় বিচার পাওয়া নিয়ে হতাশায় রয়েছেন সাংবাদিক নাদিমের পরিবার। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সাংবাদিক নেতারাও।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) উপ-পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘র‌্যাব ও পুলিশ বিভিন্ন সময় এজাহারভুক্ত ১৮ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড শেষে তাদের জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত ২ জন আসামি পলাতক রয়েছে। এ মামলার তদন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা সাংবাদিক হত্যা মামলা। ২০২৩ সালের সবচেয়ে আলোচিত মামলা। প্রকৃত দোষীরা কেউ এ মামলা থেকে ছাড় পাবে না। পলাতক দুই আসামি দেশের বাইরে আছেন কিনা? এ বিষয়ে তাঁর জানা নেই বলে জানান তিনি।’

এদিকে জামালপুর কারাগারের জেলার আবু ফাতাহ বলেন, ‘সাংবাদিক নাদিম হত্যা মামলায় অনেকই জেলহাজতে আছেন। আবার অনেকেই জামিনে চলে গেছেন। বর্তমানে ওই হত্যা মামলার প্রধান আসামি বাবু চেয়ারম্যানসহ ৭ জন কারাগারে রয়েছেন।’

সাংবাদিক নাদিমের প্রতিবেশি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে নাদিমদের বাড়ির সামনে দিয়ে মসজিদে যাই। প্রতিটি দিন, প্রতিটি সময় নাদিমের মায়ের কান্না কানে আসে। সবার কান্না থামলেও তাঁর কান্না যেন থামছেই না। আর থামবেই কি করে একমাত্র সন্তান হারানো বেদনা কি ভোলা যায়।

এ বিষয়ে নিহত সাংবাদিক নাদিমের মা আলেয়া বেগম বলেন, আমরা খুব অসহায়। আমার একটা ছেলে ছিল, তাও নৃশংসভাবে হত্যা করেছে বাবু চেয়ারম্যান ও তার লোকজনরা। কিন্তু এমন একটা আলোচিত মামলার কোনো কূল-কিনারা দেখছি না। যেভাবে মামলার সকল আসামি জামিন পাচ্ছে, তাতে কি আমরা সঠিক বিচার পাব? আমি কি আমার একমাত্র ছেলে হত্যার বিচার পাব না? এ নিয়ে আমরা খুব চিন্তায় আছি।

এ ব্যাপারে নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বলেন, একবছর হয়ে গেল। এখনো চার্জশিট বা মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয় নাই। মামলার দ্বিতীয় আসামি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। আমার স্বামী হত্যা হওয়ার পর মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে নেওয়ার কথা বলেছিলেন আইনমন্ত্রী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা নেওয়া হয় নাই। আমি আমার স্বামী হত্যার সঠিক বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা ও ভয়ের মধ্যে আছি।

বাদী পক্ষের আইনজীবি ইউসূফ আলী বলেন, ‘মামলার তদন্ত কাজ ধীরগতিতে চলছে। এতে মামলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একবছরেও মামলার অভিযোগপত্র দিতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে বিলম্ব ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছে। এতে সঠিক বিচার প্রাপ্তিতে সমস্যা হওয়ার কথা মনে করছেন তিনি।’

এ বিষয়ে জামালপুর অনলাইন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘সাংবাদিক নাদিম হত্যাকাণ্ড একটি আলোচিত ঘটনা। এই আলোচিত মামলার অভিযোগপত্র দিতে গরিমশি করা হচ্ছে। এ নিয়ে আমরা খুবই হতাশ। আমরা এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি। ঘটনার সিসি টিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। আসামি সনাক্ত করে এবং হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের দাবি জানান তিনি।