পিকে হালদারের কেলেঙ্কারির পর থেকেই নাজুক অবস্থা থেকে বের হতে পারছে না ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই)। ঋণ কেলেঙ্কারি, খেলাপি ঋণসহ নানা অনিয়মের কারণে অনেক এনবিএফআই তারল্য সংকটে ভুগছে, গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে আমানতকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এ খাত থেকে। নতুন আমানতকারী না পেয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের তারল্য পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। আমানতকারী কমে যাওয়ার পাশাপাশি কমছে আমানতের পরিমাণও।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত প্রত্যাহার করে নিয়েছেন প্রায় ৪ হাজার আমানতকারী। কমেছে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি আমানত। তবে আমানত কমে গেলেও বেড়েছে ঋণ বিতরণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলে মোট আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ২২১, যা চলতি বছর মার্চ মাস শেষে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৩৪১। গত তিন মাসের ব্যবধানে খাতটিতে সার্বিক আমানকারীর সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ৮৮০। এরমধ্যে মহিলা আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ৪৯০টি। তবে পুরুষ আমানতকারীর হিসাব বেড়েছে ৪২৮টি।
ব্যক্তির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীও কমেছে এনবিএফআইগুলোতে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে পুরুষদের নেতৃত্বে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী হিসাব কমেছে ১ হাজার ৮২৫টি। আর মহিলাদের নেতৃত্বে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী হিসাব কমেছে ৩টি।
২০২৩ সালের মার্চে এনবিএফআই খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৫৫৪টি। চলতি বছরের মার্চে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৩৪১টি। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে মোট আমানতকারী হিসাব কমেছে ৫৯ হাজার ২১৩টি। এর মধ্যে পুরুষ আমানতকারী হিসাব কমেছে ৪১ হাজার ৯৩০টি। আর মহিলা আমানতকারী হিসাব কমেছে ১৭ হাজার ৫৮৫টি। একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী সংখ্যা কমেছে ১ হাজার ৯৭৬টি। এরমধ্যে মহিলাদের নেতৃত্বে থাকা ১ হাজার ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান এনবিএফআই থেকে আমানত প্রত্যাহার করে হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে টানা কয়েক মাস এ খাতে আমানত বাড়লেও চলতি বছর প্রথম তিন মাসে ৫২৫ কোটি টাকার বেশি কমেছে। গত বছর ডিসেম্বরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা, যা চলতি বছর মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। এ সময় ব্যক্তি খাতের আমানত কমে হয়েছে ৪০ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা গত বছর ডিসেম্বরে ছিল ৪১ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। ফলে তিন মাসের ব্যবধানে ব্যক্তি আমানত কমেছে ৭৬৬ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত বেড়েছে ২৪০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত ছিল ৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা, চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, চলতি বছরের তিন মাসে আট বিভাগের মধ্যে চার বিভাগে আমানত কমে গেছে। এগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ।
মার্চ শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত কমলেও বেড়েছে ঋণ বিতরণ। গত ডিসেম্বরে এনবিএফআই প্রতিষ্ঠানগুলো ৭৩ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছিল, যা চলতি বছরের মার্চে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা। সে হিসেবে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৭৭০ কোটি টাকা।
বর্তমানে দেশে ৩৪টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু আছে। এর মধ্যে তিনটি সরকারি, ১২টি দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানায় এবং বাকিগুলো দেশীয় ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত। এগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে তারল্য সংকট। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে, আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না কেউ কেউ। এর মধ্যে অন্তত ১৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এখন নাজুক, যাদের ৩৩ থেকে ৯৯ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ কারণে ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে এ খাতে টানা কমছে আমানতকারীর সংখ্যা।
বর্তমানে তারল্য সংকট কাটাতে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে ব্যাংকগুলো। তাই আমানতকারীরাও সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।