রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এক পুলিশ কর্মকর্তার বাবা-মাকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মাতুয়াইলের পশ্চিম মোমেনবাগের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ২ নম্বর হোল্ডিংয়ের ক্ষণিকালয় নামে একটি বাড়ির নিচতলা ও দোতলার ফ্ল্যাট থেকে তাদের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন জনতা ব্যাংকের সাবেক গাড়িচালক শফিকুর রহমান (৬০) ও তার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন (৫০)।
জোড়া এ হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তবে ধরন ও আলামত দেখে ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছে পুলিশ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে র্যাব, পুলিশ, পিবিআই ও সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা। আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডি ও পিবিআই।
এলাকাবাসী জানায়, চারতলা ওই বাড়ির সীমানা প্রাচীর থাকলেও তার ওপর দিয়ে খুব সহজেই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করা যায়। বাড়ির নিচতলায় শফিকুর রহমানের ও দোতলায় শয়নকক্ষে ফরিদার মরদেহ পাওয়া গেলেও বাড়িটির চারতলা পর্যন্ত রক্তাক্ত পায়ের ছাপ দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ঢাকায় তাদের সঙ্গে কারও শত্রুতা না থাকলেও ফেনীতে জমিজমা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তারই জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
পুলিশ জানায়, সকালে জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের একটি দল। ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা বাসার নিচতলার পার্কিংয়ে শফিকুরের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পায়। তার শরীরে বিভিন্ন স্থানে ও গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পরে দোতলায় গিয়ে শয়নকক্ষে মশারির ভেতর শফিকুরের স্ত্রী ফরিদার লাশ পাওয়া যায়। তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। চারতলা ওই বাড়ির দোতলায় পরিবারসহ বাস করতেন শফিকুর। বাড়ির নিচতলার এক পাশ এবং তিন ও চারতলা ভাড়া দেওয়া। এ দম্পতির একমাত্র ছেলে পুলিশের বিশেষ শাখার (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) এসআই আল-আমিন ওরফে ইমন ও তার স্ত্রী একই বাসায় বসবাস করেন। গত বুধবার ইমন তার দাদাবাড়ি ফেনী এবং ইমনের স্ত্রী নিজের বাবার বাড়িতে চলে যান। নিহত শফিকুরের মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তিনি ও তার স্বামী মোমেনবাগের ওই বাড়ির কাছেই বসবাস করেন।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ঘটনাটি ভোরে ঘটেছে। সকালে লোকজন স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ দেখতে পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবার নম্বরে কল করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। চারতলা ওই বাড়ির ভাড়াটিয়ারা দাবি করেছেন, তারা কেউ বিষয়টি টের পাননি। কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড, কে বা কারা এতে জড়িত তা এখনো জানা যায়নি। এটি আগের বিরোধ না ডাকাতির ঘটনা সেটি তদন্তে বেরিয়ে আসবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘পারিবারিক জমিসংক্রান্ত বিরোধকে আমরা তদন্তের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিচ্ছি। তবে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলা যায় না। যাদের সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের একজন দেশের বাইরে থাকেন।’
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন ভোর ৫টার দিকে পানির পাম্প চালু করতে দোতলা থেকে নিচে নামতেন নিহত শফিকুর। এ ছাড়া ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যেতেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভোরে দোতলার বাসা থেকে শফিকুর নিচতলায় নামলে সেখানে আগে থেকে লুকিয়ে থাকা দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। তারপর টেনে পাশে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। এরপর দোতায় গিয়ে তার স্ত্রীকে কুপিয়ে পালিয়ে যায় খুনিরা। বাড়ির নিচের প্রধান ফটক ও ঘরের দোতলার দরজা খোলা ছিল। আলমারিও খোলা পাওয়া গেছে। তবে বাসা থেকে কোনো মালামাল খোয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ডেমরা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) নাহিদ ফেরদৌস বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি পরিকল্পতি হত্যাকাণ্ড। আগের কোনো বিরোধের জের ধরে এটি ঘটে থাকতে পারে।’
গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, ওই বাড়িটি ঘিরে উৎসুক মানুষের ভিড়। থানা পুলিশ ও পিবিআইর কর্মকর্তারা আলামত সংগ্রহ করছেন। মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই রক্তের দাগ চোখে পড়ে। রক্তের লম্বা দাগ ধরে নিচতলার পেছন দিক গিয়ে ছোপ ছোপ রক্ত দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, শফিকুর রহমানের মৃত্যু নিশ্চিত করতে হত্যাকারীরা টেনেহিঁচড়ে সেখানে নিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর দোতলার গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষ এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে, সেখানে রক্তের দাগ দেখা গেছে। খুনিরা দোতলার এই কক্ষে ফরিদাকে হত্যার পর চারতলা ভবনটির ছাদে গিয়ে পাশের নির্মাণাধীন ভবন হয়ে পালিয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশের ওই ভবনের সিঁড়িতেও রক্তমাখা হাতের ছাপ দেখা গেছে। এ ছাড়া পুরো সিঁড়িতে রক্তমাখা পায়ের ছাপ দেখা যায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান শেলী বলেন, ‘চুরি বা ডাকাতির কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। নিহতদের সঙ্গে স্থানীয় কারও বিরোধও ছিল না। আমরা জানতে পেরেছি গ্রামের বাড়ি ফেনীতে জমি নিয়ে নিহত শফিকুরের পারিবারিক ঝামেলা ছিল, যা নিয়ে একাধিক মামলাও চলছিল। এ বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া খুনিদের শনাক্ত করতে আশপাশের ভবনের সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
জানা গেছে, নিহত শফিকুর রহমানের দীর্ঘদিন ধরে ফেনীতে গ্রামের বাড়িতে জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছিল চাচাতো ভাইয়ের ছেলেদের সঙ্গে। তার নামে ওই জমির বিরোধের চারটি মামলা করেছে তারা। মামলাগুলোর মধ্যে দুটি খারিজ হয়ে গেছে, আর দুটি মামলার তদন্ত চলমান।
এ বিষয়ে শফিকুর রহমানের আপন ভাই মফিজুর রহমান বলেন, ‘যাদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ তারা আমাদের শরিক ও ভাগীদার হলেও খুবই দুষ্টপ্রকৃতির লোক। আমাদের চাচাতো ভাইয়ের এক ছেলে শফিকুর ভাইয়ের থেকে জোর করে কিছু জমি কিনতে চেয়েছে কয়েকবার, কিন্তু ভাই সেটা দেননি। এটা নিয়েই একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়েছে তারা।’
তবে নির্দিষ্ট কাউকে সন্দেহ করতে পারছেন না নিহতের একমাত্র সন্তান পুলিশ কর্মকর্তা ইমন। তিনি বলেন, ‘আমি কাউকেই সন্দেহ করতে পারছি না। আমি এই এলাকায় ছোট থেকে বড় হয়েছি। ২৮ বছর ধরে এই এলাকায় বাস করি। সবাই আমাকে, আমার বাবাকে চেনে। কারও সঙ্গে কোনো দিন উচ্চবাচ্যও হয়নি আমাদের। কিন্তু কীভাবে কী ঘটল এখনো বুঝতে পারছি না। জমিজমাকেন্দ্রিক ঝামেলায় আমরা ছাড়াও আরও অনেকে জড়িত। এ হত্যাকাণ্ড ওটা কেন্দ্রিক কি না, সেটাও বুঝতে পারছি না।’
ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে দুজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ডাকাতি বা চুরির ঘটনা বলা যাচ্ছে না কারণ নিহত নারীর গলায় স্বর্ণের চেইন ও মোবাইল ফোন অক্ষত, খোয়া যায়নি। তবে বাসার ভেতর সব আলমারি খোলা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় জমিসংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন বিষয় সামনে রেখে আমাদের তদন্ত চলছে, তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলে হত্যার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’