উদ্ভট সিদ্ধান্তের পর অদ্ভুতুড়ে ব্যাটিংয়ে ৫০ রানের হার

ভারতের কাছে সুপার এইটের ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছে ৫০ রানে। হারাটাই স্বাভাবিক, ভারত বিশ্বের শক্তিশালী দলগুলোর একটি এবং আইসিসির টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল। এই ম্যাচের আগে ১৩ দেখায় বাংলাদেশ ভারতকে হারাতে পেরেছে মাত্র একবার। শক্তি, সামর্থ্য, সম্ভাবনা এবং দক্ষতা; সব সূচকেই ভারত এগিয়ে। তবুও মাঠে যখন দুটো দল মুখোমুখি হয়, তখন হারজিতের একটা সমান সমান সম্ভাবনা তৈরি হয়, একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশ সেই অনিশ্চয়তা, সেই রোমাঞ্চটা নষ্ট করে দেয় অতি অল্পে, অতিসহজে। সিদ্ধান্তে এবং প্রয়োগে।

গ্রুপ পর্বে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও এত সহজে রান করেনি ভারত, যতটা সহজে বাংলাদেশের বিপক্ষে করেছে অ্যান্টিগায়। দিনের বেলায় খেলা, ব্যাটিং সহায়ক উইকেট। এমন উইকেটে টসে জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ে আমন্ত্রণ জানানো আর খাল কেটে কুমির আনায় কোনো তফাত নেই। তবু যদি হতো যে একাদশটা বোলিং শক্তিতে বলবান। তা-ও নয়, তাসকিন আহমেদকে বাদ দিয়ে নেওয়া হয়েছে জাকের আলি অনিককে। যার বৈশিষ্ট্য শেষ দিকে কিছু এলোপাতাড়ি ব্যাটিং, যদিও ১৪ রানের বেশি করেননি বিশ্বকাপে। শরিফুল ইসলাম বসে রইলেন দর্শকের আসনে। শেখ মেহেদি হাসানকে দলে নেওয়ার কারণ, তিনি নাকি পাওয়ার প্লেতে ভালো বল করেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই বাঁহাতি ছিলেন, ভারতে দুই ডানহাতি। ফলাফল একই। ৪ ওভারে ২৮ রান দিয়েছেন, কোনো উইকেট নেই। দুটো ম্যাচে বল করলেন মেহেদি, উইকেটের দেখা নেই। সাকিব আল হাসানকে প্রস্তুতি ম্যাচে বেদম পিটিয়েছিলেন ঋষভ পান্ট, শনিবারে রোহিত-কোহলি-শিভম দুবে মিলে পেটালেন। বাংলাদেশে আজকাল রাসেল ভাইপার সাপ মনে করে লোকজন সাপ পেলেই পেটাচ্ছে। বাংলাদেশের বোলিং দেখে মনে হলো, ঢোঁড়া সাপের ধোলাই চলছে। কোনো ফোঁসফাঁস নেই। সাকিব তাও রোহিতের উইকেটটা নিয়েছিলেন, মোস্তাফিজ নিঃশব্দে ৪ ওভারে ৪৮ রান বিলিয়ে চলে গেলেন। ৫ খানা বাউন্ডারি, সঙ্গে দুটো ছক্কা। রিশাদ হোসেন বাংলা ছবির নায়কের মতো মার খেয়ে ফিরে এসে উইকেট তুলে নিয়েছেন। ৩ ওভারে ৪৩ রান দিয়ে ৪ খানা ছক্কা হজম করলেও ২ খানা উইকেটও নিয়েছেন।

হার্দিক পান্ডিয়া ২৭ বলে হাফসেঞ্চুরি করলেন মোস্তাফিজের করা ইনিংসের শেষ ওভারে ১৭ রান নিয়ে। ভারত করল ২০ ওভারে ৫ উইকেটে ১৯৬ রান। যারা ব্যাট করেছেন, তাদের মধ্যে একদম শেষে ৫ বল খেলা অক্ষর প্যাটেল বাদে বাকি সবার স্ট্রাইক-রেট দেড়শর আশপাশে। কারও ২০০ ছুঁই ছুঁই। বিরাট কোহলির ফর্মটা খারাপ যাচ্ছিল, বাংলাদেশকে পেয়ে ২৮ বলে ৩৭ রান করে ৩ খানা ছক্কা মেরে সেমিফাইনালের আগে ঠিক ছন্দ ফিরে পেয়েছেন।

এবারে বাংলাদেশের ব্যাটিং। এটা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে টি-টোয়েন্টির ব্যাটিংয়ের যে ধারা, বাংলাদেশ চলে তার প্রতিকূলে। এখানে পাওয়ার প্লেতে মেডেন দেওয়া হয়, টি-টোয়েন্টিতেও ধরে খেলার মন্ত্র দেওয়া হয়। এমন উদ্ভট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দলের ব্যাটিংও যে অদ্ভুতুড়ে হবে, সেটা নতুন কী! তানজিদ তামিম ৩১ বলে খেলেছেন ২৯ রানের ইনিংস, ১৫টা ডট বল আউট হওয়ার আগে। ১৯৭ রান তাড়ায় উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান যদি এভাবে খেলেন, তাহলে বুঝতে হবে সেই দলের রানটা তাড়া করার কোনো ইচ্ছে নেই। জোড়া শূন্য পিঠে নিয়ে আসা তামিম হয়তো চেয়েছেন শেষ ম্যাচের দলে একাদশে থাকতে, তাই এই স্বার্থপর ব্যাটিং। আগের দিনে স্বার্থপর ব্যাটিং করা লিটন ক্রমেই মিডউইকেটে ক্যাচ দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মিডউইকেটে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছিলেন, অ্যাডাম জাম্পার বলে সøগ সুইপ খেলতে গিয়ে বোল্ড আর ভারতের বিপক্ষে হার্দিক পান্ডিয়ার আগের বলেই ছয় মারার পর ঠিক পরের বলটাই সেøায়ারে বোকা বনে ক্যাচ দিলেন। তানজিদ তামিম ও তাওহিদ হৃদয়, দুজনই কুলদীপ চাহালের বলে এলবিডব্লিউ হয়েছেন। দুজনই রিভিউ নিয়েছেন, কেউই বাঁচেননি। অধিনায়ক শান্ত ভালো ব্যাটিং করছিলেন, আসরের শেষ দিকে এসে তার ব্যাটিংটা ভালো হচ্ছে। তবে সেসব দলের কোনো কাজে আসছে না। ৩২ বলে ৪০ করে বুমরাহর বল আকাশে তুলে দিয়ে আউট হয়েছেন। ব্যাটিংয়ের জন্য দলে ঢোকা জাকের আলি করেছেন ১। রিশাদ কিছুক্ষণ বিনোদন দিয়ে ৩ ছক্কায় ১০ বলে ২৪ রান করে বিদায় নিয়েছেন। এমন ব্যাটিং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কোথায় ছিল, সেটাই জানার ইচ্ছে অনেকের। মাহমুদউল্লাহ আর মেহেদি শেষ পর্যন্ত থেকেছেন। তাদের ব্যাটিং ম্যাচের ফলে কোনো প্রভাব ফেলেনি, ব্যক্তিগত রান কিছু বাড়িয়েছে। আর্শদীপকে হঠাৎ পুল করতে গিয়ে কেন যে আউট হলেন মাহমুদউল্লাহ, তাও ম্যাচশেষের ১ বল আগে, সেটাই হয়তো ভেবেছেন ডাগআউটে যেতে যেতে। ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৪৬ রান করেছে বাংলাদেশ, হেরেছে ৫০ রানে। তাতেই নিশ্চিত হয়ে গেছে, সুপার এইটের পরে আর আসরে থাকছে না বাংলাদেশ।

খেলায় হারজিত থাকবেই। টি-টোয়েন্টির সফল দল যাদের ধরা হয়, সেই ইংল্যান্ডও হেরেছে আগের রাতে। হেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজও। কিন্তু বাংলাদেশের হার মানে কোনো রোমাঞ্চ নয়, যেন নিয়তির মতোই অবধারিত। থ্রিলার বইয়ের দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতেই যদি জানা হয়ে যায় খুনি কে, তাহলে বাকি অংশটা যেমন পানসে মনে হয় বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ম্যাচ ঠিক সে রকম। খেলার অনিশ্চয়তা, রোমাঞ্চ সবই এখানে অনুপস্থিত। সেই সঙ্গে প্রস্তর যুগের ব্যাটিং, যা টি-টোয়েন্টির সঙ্গে বেমানান। সমস্যা হচ্ছে, এসবকেই ক্রিকেট কর্মকর্তারা মনে করেন সাফল্য।