আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘স্মার্ট সরকার, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সোসাইটি গড়ে তুলব। বিশ্বে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে, প্লাটিনাম জুবিলিতে এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।’
গতকাল রবিবার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দলের আয়োজিত আলোচনা সভায় এ প্রতিজ্ঞা করেন টানা চারবারের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। বিকেল ৩টা ৩৬ মিনিটে সভামঞ্চে আসেন শেখ হাসিনা। স্লোগান দিয়ে তাকে বরণ করেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এরপর জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, বেলুন-পায়রা উড়িয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন দলপ্রধান। অনুষ্ঠানে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা হয়। আলোচনা সভায় পরিবেশিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন শেখ হাসিনাসহ দলটির নেতাকর্মীরা।
বিকেল ৫টার পর সভাপতির বক্তৃতা শুরু করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। ৩১ মিনিট বক্তব্য রাখেন। রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত আলোচনা সভায় দুপুর ১২টা থেকে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে মিছিল নিয়ে সভাস্থলে যোগ দিতে শুরু করেন আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের উজ্জীবিত করতে গান পরিবেশন করেন দেশবরেণ্য শিল্পীরা।
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০৪১-এ অনেক বয়স হবে আমার, তত দিন হয়তো বেঁচে থাকব না। আজ যারা নবীন, তারা আমার স্মার্ট বাংলাদেশের মূল সৈনিক হবে। আমরা স্মার্ট জনগোষ্ঠী গড়ে তুলব।’
মৃত্যুকে পরোয়া করেন না জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘মৃত্যু যেকোনো সময় হতে পারে। তার জন্য আমি ভীত নই। কখনো ভয় পাইনি, পাবও না। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে আমার বাবার যে চিন্তা ছিল, তার বাস্তবায়ন করে এ দেশের মানুষকে একটা উন্নত জীবন দিয়ে যাব। এটাই আমার লক্ষ্য, এটাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য।’
আওয়ামী লীগের ওপর বারবার আঘাত এসেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘খুব বেশি দিনের কথা নয়, ২০০৭ সালে চেষ্টা করা হয়েছিল আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে কিংস পার্টি গড়ে তোলার। সেটা সফল হয়নি। কারণ আওয়ামী লীগের মূল শক্তি হচ্ছে জনগণ, তৃণমূলের মানুষ, আওয়ামী লীগের অগণিত নেতাকর্মী মুজিবাদর্শের সৈনিক। এ সৈনিকরা কখনো পরাজয় মানে না। মাথা নত করে না।’
আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাওয়া নেতাদের উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘হয়তো ওই নেতারা ভুল করেছেন, কেউ মনে করেছেন আওয়ামী লীগে থাকলে তারাই বড় নেতা; দলের চেয়েও নিজেকে বড় মনে করে দল ছেড়েছেন, অন্য দল করেছেন। কেউ দল ছেড়ে চলে গেছেন। তারা ভুল করেছেন। কেন? আকাশে মিটিমিটি তারা জ¦লে। তারা আলোকিত হয় সূর্যের দ্বারা। যেসব নেতা ভুল করেছিলেন তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে, তারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিলেন বলেই আলোকিত ছিলেন। এখান থেকে চলে যাওয়ার পর তারা আর জ্বলেননি, আস্তে আস্তে মিইয়ে গেছেন।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘কেউ ভুল বুঝে ফেরত এসেছে, আমরা নিয়েছি। আবার কেউ এখনো বিভিন্নভাবে আওয়ামী লীগের সরকারের পতন, ধ্বংস কামনা করে যাচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। তা আমরা প্রমাণ করেছি। পঁচাত্তরের পর বারবার ক্ষমতার বদল হয়েছিল এবং তা হয়েছে অস্ত্রের মাধ্যমে, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। জনগণের অধিকার ছিল না। ক্ষমতার বদল তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেনি।’
বাংলাদেশের মানুষের সব অর্জন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বারবার এ দলের ওপর আঘাত এসেছে, এ দলকে খন্ড-বিখন্ড করা হয়েছে। বারবার এ দলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছে। সেই আইয়ুব খানের মার্শাল ল থেকে শুরু...।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ গণমানুষের সংগঠন, জনগণের অধিকার আদায়ের সংগঠন, জনগণের আর্থসামাজিক উন্নতি করার সংগঠন। বারবার আঘাত করেও এ সংগঠনের কেউ ক্ষতি করতে পারেনি। ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে জেগে উঠেছে। আওয়ামী লীগ ফিনিক্স পাখি। আমার একটাই আবেদন : আমাদের সংগঠনের প্রতিটি নেতাকর্মীকে সুসংগঠিত হতে হবে। একজন রাজনীতিকের জীবনে সংগঠনটা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী, দৃঢ় ভিত্তি। যদি সংগঠন শক্তিশালী হয় আর দেশের মানুষের সমর্থন পাওয়া যায়, তাহলে যতই ষড়যন্ত্র হোক সব ব্যর্থ হবে।’
আওয়ামী লীগ জনগণের শক্তিতে বিশ্বাসী উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৯৬ সালে সরকারে এসে আমরা অনেক দূর এগিয়েছিলাম। কাজ করেছি। বাংলাদেশের মানুষ প্রথম উপলব্ধি করেছিল একটি দলের কাজ হলো জনগণের সেবা করা।’
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রত্যেককে বলব, আপনারা চিন্তা করে দেখুন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কত কষ্ট করেছে। বারবার আঘাত এসেছে। পরিবারগুলো কষ্ট করেছে। কিন্তু এ সংগঠন ধরে রেখেছে। কাজেই সংগঠন যেমন করতে হবে, সেভাবে জনগণের আস্থা-বিশ্বাস আমাদের অর্জন করতে হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জনগণের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি বলেই বারবার জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে বলেই আজ আর্থসামাজিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নতি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে রোল মডেলের স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বে আজ মাথা উঁচু করে চলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের আস্থা-বিশ্বাসকে ধরে রেখেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’
আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ ও উপ-প্রচার সম্পাদক আবদুল আউয়াল শামীমের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় নেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ ১৪ দলীয় জোটের শরিক বিভিন্ন দলের নেতারা। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন বিদেশি মিশনের কূটনীতিকরাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।