মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দিঘুলিয়া ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামে অবৈধভাবে গাছের গুঁড়ি ও কাঠ পুড়িয়ে কৃত্রিমভাবে কয়লা তৈরি হচ্ছে। এতে হুমকিতে পড়েছে দিঘুলিয়ার পরিবেশ।
কারখানার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দূরের কথা, কোনোপ্রকার নিয়মনীতির বালাই নেই। চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, ফসল নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া আশপাশের এলাকার মানুষ কাশিসহ নানা সমস্যায় ভুগছে এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে দেখা যায়, ধলেশ্বরী নদীবেষ্টিত সাটুরিয়া উপজেলার দিঘুলিয়া ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল ধলেশ^রী নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে কৃত্রিমভাবে কয়লা তৈরি করার কারখানা। চারদিকে বিভিন্ন ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি। নদী ঘেঁষা কারখানায় প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বিভিন্ন বনজ ও ফলজ গাছ কেটে বিশেষভাবে তৈরি চুলায় কাঠ পোড়ানো হয়। এ সব চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় পরিবেশ ও নদীর জীববৈচিত্রের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য এবং কমে যাচ্ছে জমির ঊর্বরতা।
দেখা গেছে, ইট দিয়ে চুল্লি বানিয়ে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। চুল্লির চারদিকে রাখা গাছের গুঁড়ি ও শুকনো কাঠ-লাকড়ি। দুটি চুল্লিতে আগুন দিলে কালো ধোঁয়ায় চারদিক ছেয়ে যায়। চারপাশে বিভিন্ন আকারের গাছের গুঁড়ি রাখা। প্রতিটি চুল্লিতে ১৫০-২০০ মণ কাঠ ফেলে আগুন দেওয়া হয়।
কারখানার শ্রমিক ফারুক বলেন, ‘ইট দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে চুল্লি তৈরি করা হয়েছে। প্রথমে সাটুরিয়ার বিভিন্ন গ্রাম থেকে কাঠ সংগ্রহ করা হয়। চুল্লির মধ্যে সারিবদ্ধভাবে কাঠ সাজিয়ে একটি মুখ খোলা রেখে অন্য মুখগুলো মাটি ও ইট দিয়ে বন্ধ করে দিই। এই প্রক্রিয়া করতে দুই থেকে তিনদিন লাগে। এরপর বিভিন্ন ক্যামিকেল দিয়ে পাঁচ থেকে সাতদিন সময় নিয়ে কাঠ পোড়াই। তখন কাঠ থেকে কয়লা হয়ে যায়। আগুন নেভানোর তিনদিন পর চুল্লি থেকে কয়লা বের করি। প্রতিটি চুল্লিতে প্রতিবার ২০০ থেকে ৩০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। এই কয়লা শীতল করে পরিষ্কার করে কেজিতে ওজন দিয়ে বস্তাবন্ধি করি। এক মণ কাঠ পুড়িয়ে পাঁচ-ছয় কেজি কয়লা পাওয়া যায়। এ কয়লা মহাজন এসে নিয়ে যায়। আমাদের এসব কয়লা বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁর মালিকরা কিনে নেন। হোটেল মালিকরা এ কয়লা দিয়ে রুটি ও নান রুটি তৈরিতে ব্যবহার করেন।’
সবুজ পরিবেশ আন্দোলনে মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি রাজ্জাক হোসেন রাজ বলেন, এমনিতেই গাছ কাটা ও তা জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উপরন্তু, কালো ধোঁয়া পরিবেশ ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বনজ সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অপরদিকে ধোঁয়ার কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত নানা রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
স্থানীয়রা বলেন, জালশুকা গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন কৃত্রিমভাবে কয়লা তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছেন। এখানে গাছের গুঁড়ি ও কাঠ দিয়ে কয়লা তৈরি হচ্ছে। পাবনা জেলা থেকে শ্রমিক নিয়ে এসে কাজ করা হচ্ছে। ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে এ অবৈধ কয়লার কারখানা।
কারখানার মালিক আবুল হোসেন স্বীকার করেন, ‘কারখানায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেই। ভাই, ব্যবসা করে খাইতেছি। কারও তো কোনো ক্ষতি করছি না।’
দিঘুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম জুয়েল বলেন, ‘এলাকাবাসী শত শত ব্যক্তির স্বাক্ষর নিয়ে লিখিত অভিযোগ আমাকে এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় একাধিকবার তুলে ধরেছি। তারপরও এ কয়লা তৈরির কারখানা বন্ধ হয়নি।’
সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শান্তা রহমান বলেন, ‘জালশুকা গ্রামে কাঠ দিয়ে কয়লা তৈরির বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি দ্রুত খোঁজ-খবর নিয়ে ওই সব কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’