পেনশন-কোটাবিরোধী আন্দোলনে উত্তপ্ত হবে জুলাই!

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে অস্থিরতা। একদিকে শিক্ষকদের সর্বজনীন পেনশনের অন্তর্ভুক্ত করে জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিতে টানা কর্মসূচি, অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে দেশের অন্তত ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। দাবি আদায় না হলে আসছে ১ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে অনড় অবস্থানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে বলে মনে করেন শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টরা।

সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা ‘প্রত্যয় স্কিম’ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাহার, সুপার গ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তনের দাবিতে দুই মাস ধরে আন্দোলন করে আসছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বৃহৎ আন্দোলনে যাওয়ার আগে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন তারা। এ সময়ের মধ্যে দাবি আদায় না হলে ১ জুলাই থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষকনেতারা। এ দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন তারা। কর্মবিরতিতে যাওয়ার আগে ২৫ জুন থেকে টানা তিন দিন অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করবেন শিক্ষকরা। ৩০ জুন পূর্ণদিবস কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন তারা। তারপরও দাবি আদায় না হলে ১ জুলাই থেকে টানা সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে যাবেন শিক্ষকরা। তবে ১ জুলাইয়ের আগে ক্লাস বর্জন করলেও পরীক্ষা চলবে। সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু হলে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের নেতারা।

এর আগে শিক্ষকদের সর্বজনীন পেনশনের অন্তর্ভুক্ত করে জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিতে গত ৩০ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষকদের স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি পালিত হয়। যাতে ১ হাজার ৬১ জন শিক্ষক সই করেন। পরে শিক্ষক ফেডারেশনের ডাকে গত ২৬ মে ঢাবি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। এরপর ২৮ মে সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি এবং ৪ জুন অর্ধদিবস কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিলেও সমস্যা সমাধানে এখনো পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি। আমরা আমাদের অবস্থানে অনড়, ১ জুলাই থেকে কোনো অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলবে না।’

একই ধরনের তথ্য জানান ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা। তিনি বলেন, ‘আগামী ১ জুলাই থেকে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ডিনকে বলা হয়েছে, তারা যেন সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। লাইব্রেরি, ল্যাব, সেমিনার সব বন্ধ রাখা হবে। কোনো প্রাধ্যক্ষ হলে যাবেন না।’

অন্যদিকে গত ৫ জুন সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্র বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট। ফলে পুনর্বহাল হয় সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ শতাংশ কোটাসহ সর্বমোট ৫৬ শতাংশ কোটা। রায়ের পর ওইদিন সন্ধ্যায় তাৎক্ষণিক মিছিল বের করে শিক্ষার্থীরা। এরপর কয়েক দিন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। এরই মধ্যে যদি হাইকোর্টের রায় বাতিল না হয় তাহলে ১ জুলাই থেকে সর্বাত্মক ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, আন্দোলন এবং অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে এ আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

কোটা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এ আন্দোলনকে আরও জোরদার করার জন্য জুলাই থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার যদি কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয় তাহলে জোরালো আন্দোলন, ক্লাস বর্জন, অবস্থান কর্মসূচি, ধর্মঘট করা হবে। আমরা দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

এ আন্দোলনের আরেক সংগঠক রিফাত রশিদ বলেন, ‘২০১৮ সালে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল সেই পরিপত্রে যদি আবার কার্যকর না করা হয়, তাহলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব। আমরা এখনো আমাদের দেওয়া আলটিমেটামে অনড় রয়েছি। দাবি আদায় না হলে দেশ জুড়ে আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব। ইতিহাস সাক্ষী, যতবার এ দেশের ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমেছে, ততবারই তারা দাবি আদায় করেই রাজপথ ছেড়েছে। এবারও আমরা আমাদের দাবি আদায় করেই রাজপথ ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’

শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটা এবং পেনশন স্কিমের এ আন্দোলন জোরালো হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। আর তাতে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। জুলাইয়ের শুরু থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ১০টি বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষার শিডিউল রয়েছে, অন্যান্য ক্যাম্পাসগুলোর পরিস্থিতিও প্রায় একই। টানা আন্দোলন হলে বিপাকে পড়বেন শিক্ষার্থীরা এবং সেশনজটের কবলে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষাগুলোও বর্জন করা হবে। কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না, নতুন কোনো পরীক্ষার ঘোষণাও দেওয়া হবে না। আমরা বাধ্য হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বৈষম্যমূলক প্রত্যয় স্কিম বাতিল করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনবেন।’