পরিবর্তনশীল বিশ্বে বৈশ্বিক মান বজায় রাখতে সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বহুমাত্রিক ও সৃজনশীল করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করেছি যাতে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।’
গতকাল সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের (পিএমইএটি) মাধ্যমিক থেকে স্নাতক (পাস) এবং এর সমমানের অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তি ও টিউশন ফি বিতরণের উদ্বোধনকালে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সরকারপ্রধান বলেন, তার সরকার ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে ২৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৫৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক চাহিদা অনুধাবন করে তার সরকার কৃষি, পশুচিকিৎসা, প্রাণিবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসা, ডিজিটাল ইসলামিক, আরবি, টেক্সটাইল, সামুদ্রিক, বিমান চলাচল, মহাকাশ এবং ফ্যাশন ও প্রযুক্তি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে বহুমাত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাকে তার সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তির জ্ঞান ছাড়া কোনো দেশই পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। তাই আমরা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা নিয়েছি।’
১৯৭৫ সালের পর তার সরকারের প্রথম বাজেটে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ করার কথা জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, তার সরকার গবেষণা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারের জন্য বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।
সরকারপ্রধান বলেন, মেধাবী অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মেধাকে দেশ ও মানবকল্যাণে কাজে লাগানো এবং তাদের প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘দারিদ্র্য কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না’ উক্তির স্মরণ করেন।
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও সমমানের ৬৪ লাখ ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ২ হাজার ২০৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হবে।
অর্থ বিতরণের উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তি ও টিউশন ফির অর্থ বিতরণ করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’
শেখ হাসিনা ১৫ জন শিক্ষার্থীকে বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল প্রতিভা অনুসন্ধান পুরস্কার-২০২৪ (ক্রিয়েটিভ ট্যালেন্ট সার্চ অ্যাওয়ার্ড-২০২৪) এবং ২১ শিক্ষার্থীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্কলার পুরস্কার-২০২৩ প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু ক্রিয়েটিভ ট্যালেন্ট সার্চ পুরস্কারপ্রাপ্তদের সনদপত্র ও ২ লাখ টাকা করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্কলার পুরস্কারপ্রাপ্তদের সনদপত্র ও ৩ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বেগম শামসুন নাহার ও শিক্ষা সচিব সুলেমান খান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন।
হাজারীবাগ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত জাহান মালিহা, দিনাজপুরের আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী আতিফা রহমান ও খুলনার সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র পিনাক মুগ্ধ দাস ‘বঙ্গবন্ধু ক্রিয়েটিভ ট্যালেন্ট সার্চ পুরস্কার গ্রহণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম রাইসা ও আল ফয়সাল বিন কাশেম কানন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্কলার অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে তারা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রিয় শিক্ষার্থীদের বলব, আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষাক্রম সবকিছুতে পরিবর্তন এনেছি। আমরা পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৃজনশীল শিক্ষার ব্যবস্থা, মেধা অন্বেষণ, মেধার মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও আপন করে নেওয়া, আনন্দমুখর পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ সেই পদ্ধতিটাতে আমরা নিয়ে আসতে চাই।’
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এখন যদি সারাক্ষণ কেউ বলে পড়ো, পড়ো, পড়ো এটা কি ভালো লাগে বলো? মোটেই ভালো লাগে না। এটা কিন্তু বাস্তব কথা, যাওবা একটা পড়ার ইচ্ছে থাকে তাও নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্য এমনভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাটা করা, যাতে আগ্রহ নিয়েই ছেলেমেয়েরা পড়বে। পড়ো, পড়ো করতে হবে না বা ধরে পেটাতে হবে না। নিজেরাই পড়বে, নিজেদের মধ্যেই সেই আকাক্সক্ষাটা থাকবে। আমরা সেই সিস্টেমটাই তৈরি করতে চাই।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘জানি, একটা পরিবর্তন এলে অনেকেই নানা ধরনের কথা বলে। তাছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ, সোশ্যাল মিডিয়ায় যার যা মনে আছে সমালোচনা করতে পারলেই খুশি। আমরা বাঙালিরা আবার পরচর্চা খুব পছন্দ করি। পরচর্চা ছাড়া তো আসরই জমে না। যে যা মনে করে লিখে দেয়।’
আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মবিশ্বাসই মানুষকে শক্তি দেয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নিজের মনে আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। নিজের ওপর বিশ্বাস থাকতে হবে। কেউ একটু সমালোচনা করলেই ওমনিই সেটার জন্য ভীত হয়ে যেতে হবে আমি এটা বিশ্বাস করি না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি আমাদের শিক্ষার্থীদের এটাই বলব, সবসময় এই চিন্তাটাই করতে হবে। কে কী বলল সেটা শুনে ওমনিই চোখের পানি ফেলানো, মুখ লুকানো তা নয়। নিজের বিশ্বাস থেকে চলা শিখতে হবে। তাহলে এই দেশকে তোমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের সেবা করা, জনগণের পাশে দাঁড়ানো, জনগণের জন্য কল্যাণ করা এটাই হবে মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। খালি আমি নিজে শিক্ষিত হব, নিজে অর্থ কামাই করব, নিজেই ভালো থাকব, আমি দেশকে কিছু দেব না, আশপাশের মানুষ দরিদ্র থাকবে এটা হয় না। সবাই মিলেই আমাদের চলতে হবে, সবাই মিলে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সেই নির্দেশনাটা জাতির পিতা দিয়ে গেছেন, আমরা সেটাই অনুসরণ করি।’ শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সব বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা আমাদের তরুণ সমাজই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
ভারত সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন আজ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে আজ মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, বেলা ১১টায় গণভবনে এ সংবাদ সম্মেলন হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ২১ জুন দুদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি যান।
লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোট টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করার পর ভারতে কোনো সরকারপ্রধানের এটিই প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। এ ছাড়া এ সফরটি ছিল ১৫ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে ভারতের রাজধানীতে শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সফর; তিনি ৯ জুন মোদির শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিশিষ্টজনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে আরও সুসংহত করতে সাতটি নতুন এবং তিনটি নবায়নসহ ১০টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহায়তা কামনা : রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধানে চীনের সহায়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘সমাধানের অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে খুবই চিন্তিত। কারণ, এরই মধ্যে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে আসার ছয় বছর পার হয়ে গেছে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ জিয়ানচাও গতকাল প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সংসদ ভবন কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় তিনি এ সহায়তা কামনা করেন।
সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে বলেন, এটা (রোহিঙ্গা সংকট) আমাদের জন্য খুবই হতাশা ও উদ্বেগজনক।
প্রধানমন্ত্রী চীনের মন্ত্রীকে বলেন, ‘এটি রোহিঙ্গা সংকটের সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধানের জন্য আমার (প্রধানমন্ত্রীর) পক্ষ থেকে চীনের প্রেসিডেন্টকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ বার্তা।’ তিনি আরও বলেন, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) চীনের মন্ত্রীকে তার নিজের পক্ষ থেকে এবং বাড়তি আগ্রহ নিয়ে কিছু করারও অনুরোধ করেন।
লিউ জিয়ানচাও বলেন, চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে কীভাবে পরিস্থিতির উন্নতি করা যায়, তা খুঁজে বের করতে মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করছে। রোহিঙ্গা ইস্যুটি জটিল এবং সেখানে অভ্যন্তরীণভাবে তা অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে চীনা মন্ত্রী বলেন, ‘এমনকি, মিয়ানমার সরকারেরও (এ ইস্যুটি সম্পর্কে) কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো অবস্থান নেই। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে (সেখানে) গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি একটি জটিল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, চীন বুঝতে পেরেছে যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের মানবিক উপায়ে সহায়তা করছে বলে তার দেশ অত্যন্ত প্রশংসা করে।
আগামী মাসে শেখ হাসিনার চীন সফর প্রসঙ্গে লিউ জিয়ানচাও বলেন, ‘এতে দুই দেশের মধ্যে অসাধারণ বন্ধুত্ব আরও জোরদার হবে। এ সফর আমাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।’
বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নে অভিভূত হয়ছেন উল্লেখ করে চীনের মন্ত্রী বলেন, তার দেশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে চীনের অর্থনৈতিক অবস্থাও মন্থর।
পার্টি টু পার্টি (চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও আওয়ামী লীগ) সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। চীনা মন্ত্রী অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও পার্টি টু পার্টি সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
অ্যামবাসাডর অ্যাট লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন ও মুখ্য সচিব এম তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বাসস