মতিউরের সঙ্গে পারেননি এনবিআর চেয়ারম্যানও

সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আর তাই এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর বদিউর রহমান একটি বদলির তালিকা করেছিলেন। যেখানে নাম ছিল ছাগলকা-ে আলোচনায় আসা এনবিআর সদস্য মতিউর রহমানের। সে সময় মতিউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে যুগ্ম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

মতিউরকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাজশাহীতে নিয়মিত বদলির জন্য প্রস্তাব করেন সেই সময়ের এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। তবে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন বোর্ডের চার সদস্য। তবে এমন মন্তব্যকে কড়াভাবে গ্রহণ করে সেদিনই মতিউরসহ অন্যদের বদলির আদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর তারপরই একের পর এক ধাক্কা খেতে শুরু করেন বদিউর রহমান।

সব সময় সব সরকারের উচ্চপর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে মতিউর গড়ে তুলেছিলেন সখ্য। যে কারণে কাউকে পরোয়া করতেন না সদ্য এনবিআরের সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া মতিউর রহমান। সেই প্রভাব বলবৎ ছিল সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকারের সময়েও। ব্রিগেডিয়ার থেকে সেনাপ্রধান সবাই হয়েছিলেন তার কাছের মানুষ।

মতিউরকে বদলি না করতে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এসেছিলেন সেই সময়ের বিশেষ বাহিনীর এক কর্মকর্তা। তার অনুরোধেও অবস্থান পরিবর্তন করেননি বদিউর রহমান। এরপর আর্ম ফোর্সেস ডিভিশন থেকে মতিউরের বদলি বাতিল করতে নির্দেশ আসে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে। সেখানেও তিনি পরিবর্তন করেননি নিজের অবস্থান। এরপর বদিউর রহমানকে ফোন করে বদলি বাতিল করতে তদবির করেন জেনারেল মাসুদ। সেখানেও সিদ্ধান্তের পরিবর্তন না আসায় সর্বশেষ বার্তা আসে সেই সময়ের একটি বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে। করা হয় একই সুপারিশ। তাতেও বদিউর রহমান সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি। উল্টো প্রস্তাব দেন তিনি সরে যাওয়ার পর যেন মতিউরকে পুনর্বহাল করা হয়।

এমন পরিস্থিতির পর নিজেই চাকরি থেকে অবসরে চলে যান বদিউর রহমান। তার অবসরে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও চট্টগ্রাম বন্দরে যোগ দেন মতিউর রহমান। এ ঘটনাগুলো নিজের লেখা দুটি বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান।

এরপর সবাই বুঝে নিল মতিউরের জন্যই চাকরি ছেড়েছেন বদিউর রহমান।

এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আমার জায়গায় অনড় এবং সঠিক ছিলাম। তাই আমি থাকতে আমার দেওয়া বদলির চিঠি প্রত্যাহার করিনি। আমি স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়েছি। কিন্তু বদলির নির্দেশ প্রত্যাহার করিনি।’

মতিউরকে নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মতিউর কেইপাবল। মতিউর নোউজ হাউ টু ম্যানেজ। আর এভাবেই তার কাজ তিনি সবার প্রশ্রয়ে করে গেছেন।’

মতিউরের এমন উত্থানের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের ফাঁকফোকরে এরা সুযোগ পেয়ে বড় হয়। তা ছাড়া সমাজ অনিয়ম-দুর্নীতি করা মানুষদের প্রত্যাখ্যান করতে ভুলে গেছে। এখন যারা যত অনিয়ম-দুর্নীতি করে, তারা তত প্রশংসিত হয়। তারা তাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।’

এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিয়ে বদিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুদক এখন লক্ষ্মীন্দরের বাসরঘরে পরিণত হয়েছে। এর আগেও মতিউরের নামে চারবার অভিযোগ পড়েছিল, সেখানেও সে মুক্তি পেয়েছে। এখন আবার গণমাধ্যমে নতুন করে এসেছে। তারাই (দুদক) জানেন, তারা কী করবেন।’

দিনে দিনে মতিউর তার অবস্থান আর ব্যক্তিগত যোগাযোগে অন্য কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে জায়গা করে নিয়েছেন রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের পদধারীদের সঙ্গে। আর তাই সব সময় ছিলেন ক্ষমতার সঙ্গে। আর সেই ক্ষমতার ব্যবহার করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান হয়েও বনে গেছেন শতকোটি টাকার মালিক।

১৬ জুন রাতে দেশ রূপান্তরের অনলাইন ও ডিজিটাল সংস্করণে ‘রাজস্ব কর্মকর্তার ছেলের অর্ধকোটির কোরবানি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা আলোচনায় আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুশফিকুর রহমান ইফাত নামের এক তরুণ ১২ লাখ টাকায় একটি ছাগলসহ অর্ধকোটি টাকার কোরবানির পশু কেনেন। এই তরুণের অর্থের উৎস জানতে গিয়ে জানায় যায়, ইফাত রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় সন্তান।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হতে থাকলে মতিউর প্রথমে এই সন্তানকে অস্বীকার করেন। তবে একের পর এক তথ্য সামনে আসায় পরিচয় গোপনের তার সেই চেষ্টাও বৃথা যায়। এরপর আড়ালে চলে যায় মতিউর পরিবার।

ছাগলকান্ড আলোচনায় আসার পর একের পর এক ফাঁস হতে থাকে মতিউর রহমানের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদে হদিস। এর মধ্যে রয়েছে নরসিংদীর রায়পুরার মরাজালে শতবিঘা জমির ওপর থাকা ওয়ান্ডার পার্ক, গাজীপুরের পুবাইলে আপন ভুবন পিকনিক অ্যান্ড শুটিং স্পট, ৪টি বিলাসবহুল গাড়ি, রাজধানীতে ১০টির বেশি ফ্ল্যাট, সাভার, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, বরিশালে রয়েছে তার বিপুল সম্পত্তি। এ ছাড়া স্বজনদের নামে শতকোটি টাকা মূল্যের শেয়ার তো রয়েছেই।

দুদকের আবেদনে দেশত্যাগে মতিউর, তার প্রথম স্ত্রী লাকী ও দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে ইফাতে দেশত্যাগে আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে তার আগে মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রী ও ছেলে ইফাত দেশ ত্যাগ করেন। খোঁজ মিলছে না মতিউর রহমানের। এর আগেই রাজস্ব বিভাগের সদস্য পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে। খোয়া যায় সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদও। তাকে ওএসডি করে যুক্ত করা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে।

এরই মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ছাগলকা-ের মতিউর রহমান। প্রশাসন তার অবস্থানের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।