বহুল আলোচিত এমপি আনোয়ারুল আজীমকে অপহরণের পর হত্যা মামলার আসামি মোস্তাফিজুর রহমান ও ফয়সাল আলী সাজিকে সীতাকুণ্ডের পাতালকালী মন্দির থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের মধ্যে এমপি আনারকে কলকাতার ফ্ল্যাটে ক্লোরোফরম দিয়ে অজ্ঞান করেন ফয়সাল আর বিবস্ত্র করে চেয়ারে বাঁধার পর ছবি তোলেন মোস্তাফিজ। গতকাল বুধবার দুপুরে তাদের গ্রেপ্তারের পর হেলিকপ্টারযোগে প্রথমে ঝিনাইদহে পরে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গ্রেপ্তার ফয়সাল ও মোস্তাফিজ নাম পরিবর্তন করে পলাশ রায় ও শিমুল রায় নামে গত ২৩ দিন ধরে ওই মন্দিরে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন ডিবির তদন্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে হত্যাকা-ে জড়িত অন্য আসামি গ্যাস বাবুর তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য ঝিনাইদহের একাধিক পুকুরে ডুবুরি নামিয়ে তল্লাশি চালানো হলেও মোবাইল সেট উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ঘাতক দলের সক্রিয় সদস্য মোস্তাফিজ ও ফয়সাল সাজিসহ ১০ আসামির ব্যাংক হিসাব চেয়ে আদালতে আবেদন করে ডিবি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, সন্দেহভাজন আসামিদের মধ্যে মোস্তাফিজুর ও ফয়সাল সংসদ সদস্য খুন হওয়ার আগে গত ২ মে কলকাতায় যান। তারা দেশে ফিরে আসেন ১৯ মে। দুজনের বাড়ি খুলনার ফুলতলায়। খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী হিসেবে চিহ্নিত শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহর বাড়িও একই এলাকায়। ডিএমপির ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের এডিসি জুনায়েদ আলম জানান, আনার হত্যার ঘাতক দলের অন্যতম দুই পলাতক আসামি ফয়সাল ও মোস্তাফিজকে ধরতে খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে হেলিকপ্টার দিয়ে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়।
এখন পর্যন্ত এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন। তারা হলেন আমানুল্লাহ আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, তার ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া ও শিলাস্তি রহমান। পরে গ্রেপ্তার হন জেলা আওয়ামী লীগ নেতা গ্যাস বাবু, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু, মোস্তাফিজুর রহমান ও ফয়সাল আলী সাজি। এ ছাড়া কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন সিয়াম হোসেন ও জিহাদ হাওলাদার।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন-অর-রশীদ জানান, গত ১৯ মে তারা ঢাকায় আসার পর শিমুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই সময় তাদের ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ওই টাকা দিয়ে তাদের কিছু দিন আত্মগোপনে থাকার নির্দেশ দেন শিমুল ভূঁইয়া। ২২ মে আনার হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে তারা সীতাকু-ে চলে যায়। এবং সেখানে নাম পরিবর্তন করে পলাশ রায় ও শিমুল রায় পরিচয়ে রাতে মন্দিরে অবস্থান করে। এইভাবে তারা ওই মন্দিরে ২৩ দিন কাটিয়ে দেন। এ সময় মন্দিরের লোকজন তাদের অবস্থান করার কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, তারা কালী মায়ের ভক্ত। রাতে মাকে ছাড়া তারা ঘুমাতে পারেন না। তাদের এমন জবাবে মন্দিরের লোকজন তাদের রাতে থাকতে বাধা দিত না। তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তারকৃত ফয়সাল ও মোস্তাফিজ এক সময় ট্রাক চালাতেন। এ কারণে তাদের সীতাকু-ের ওই এলাকাটি পরিচিত। পাহাড়ের ওপর মন্দিরের অবস্থানও তারা জানতেন। ওই মন্দিরে উঠতে গেলে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এ কারণে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার ডিবির একটি টিম সেখানে গিয়ে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে এলাকাটিতে নজরদারি বৃদ্ধি করে। ফলে তারা পালানোর সুযোগ পায়নি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তারপরও তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
গ্যাসবাবুকে নিয়ে মোবাইল উদ্ধারে ডিবিপ্রধান হারুন : আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাসবাবুকে নিয়ে তার ফেলে দেওয়া মোবাইলসহ আলামত উদ্ধারে ঝিনাইদহে অভিযান চালানো হয়েছে। ডিএমপির ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ এ অভিযান পরিচালনা করছেন। গতকাল বুধবার ঝিনাইদহ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারুক আযমের নেতৃত্বে মাছ ধরার জেলেদের পুকুরে নামিয়ে অভিযান চালানো হয়। তবে কোনো কিছুই উদ্ধার করা যায়নি।
অভিযান শেষে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রেস ব্রিফিং করেন। তিনি বলেন, ‘এ হত্যা মামলায় মোট সাতজন অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। বাকি দুজনকে গ্রেপ্তারের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তারা সাগরে বা মাটির নিচে যেখানেই থাকুক না কেন আমরা তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব। কোনো ভালো মানুষকে হয়রানি করা হবে না এবং অভিযুক্ত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। গ্যাসবাবুকে নিয়ে আমরা তার ফেলে দেওয়া মোবাইল তিনটি উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।