পুরনোতেই আস্থা নাকি নতুন কেউ

কে হচ্ছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), তা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনে আলোচনা চলছে। বর্তমান আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের দেড় বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১১ জুলাই। তাকেই আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হবে নাকি নতুন কাউকে এই পদে বসানো হচ্ছে, তা চূড়ান্ত হবে কিছুদিনের মধ্যেই।

তবে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুর্নীতিকা-ের তথ্য প্রকাশের পর পুলিশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বর্তমান আইজিপির চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ আরও ছয় থেকে বারো মাস বাড়ানো হচ্ছে। আর যদি মেয়াদ বৃদ্ধি করা না হয়, তাহলে বিসিএস ১২তম ব্যাচের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন, গ্রেড-১) কামরুল আহসানকে নতুন আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এ জন্য দুজনের ফাইল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি একই ব্যাচের অতিরিক্ত আইজিপি ও পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর মল্লিক ফকরুল ইসলাম ও অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) আতিকুল ইসলামের নামও আইজিপি হওয়ার বিষয়ে আলোচনায় আছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আইজিপি পদে সুনির্দিষ্ট কোনো মেয়াদকাল নেই।

সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী, ৫৯ বছর বয়স হলে অবসরে যান কর্মকর্তারা। ২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী, ৫৯ বছর বয়স পূর্ণ হয় বর্তমান আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয় বিবেচনায় রেখে দেড় বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান তিনি। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১২ জুলাই থেকে নতুন আইজিপির দায়িত্ব পালন শুরুর কথা। বর্তমান আইজিপিকে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, পুলিশে এমন আলোচনাই বেশি। পাশাপাশি এটাও আলোচনায় যে আইজিপি পদে নতুন কেউ আসতে পারেন। সরকারের হাইকমান্ড আইজিপি পদ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। ইতিমধ্যে বর্তমান আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) কামরুল আহসানের ফাইল প্রস্তুত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফাইলগুলো বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির খবরে দেশে-বিদেশে আলোচনার ঝড় বইছে। এ নিয়ে পুলিশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় সরকারের হাইকমান্ডও চিন্তিত। বর্তমান আইজিপির মেয়াদ শেষ হবে ১১ জুলাই। ইতিমধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারকরা আইজিপি পদে কাকে আনা যায় তা নিয়ে আলোচনা করছেন। নতুন আইজিপি নিয়োগ দেওয়া হবে, নাকি বর্তমান আইজিপির মেয়াদ আবারও বাড়ানো হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। পুলিশের বর্তমান পরিস্থিতি কে ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারবেন তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন নীতিনির্ধারকরা।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকরা চাইছেন বর্তমান আইজিপিকে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে। তার মেয়াদ হবে ছয় মাস অথবা এক বছর। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের আরেকটি অংশ চাইছেন, এই পদে নতুন কেউ আসুক। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) কামরুল আহসানকেই এগিয়ে রাখা হয়েছে। বর্তমান আইজিপির মেয়াদ না বাড়লে কামরুল আহসানই পরবর্তী আইজিপি হচ্ছেন সেই আভাস অনেকটাই স্পষ্ট। কারণ ১২তম ব্যাচের তিনি গ্রেড-১ পদমর্যাদার। পাশাপাশি একই ব্যাচের অতিরিক্ত আইজিপি ও পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর মল্লিক ফকরুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) আতিকুল ইসলামের নামও আইজিপি হওয়ার বিষয়ে আলোচনা হলেও তাদের আইজিপি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

পুলিশ সূত্র জানায়, আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের চাকরির মেয়াদ বাড়লে এটি হবে দ্বিতীয় দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। এর আগে গত বছরের ৯ জানুয়ারি তার চাকরির মেয়াদ দেড় বছর বাড়িয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা হয়েছিল।

বর্তমানে পুলিশ প্রশাসন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। এমন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এখনই নতুন আইজিপি নিয়োগ দিতে চাইছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এই মুহূর্তে বর্তমান আইজিপির ওপর আস্থাও রাখতে চাইছেন সরকারের হাইকমান্ড। কারণ পুলিশ প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের আলাদা একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিলে সে ক্ষেত্রে কামরুল আহসানকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবছেন সরকারের হাইকমান্ড। তার ওপরও ভরসা রাখতে চাইছেন নীতিনির্ধারকরা। পুলিশ বাহিনীতে কামরুল আহসানেরও সুনাম রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন।

বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৯৮৬ তথা অষ্টম ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট (এএসপি) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। আইজিপি পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তা ছাড়া তিনি সিআইডির প্রধান, ময়মনসিংহ ও ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন পুলিশ সদর দপ্তর, মেট্রোপলিটন পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজ করার মাধ্যমে তিনি বিশ্ব শান্তিরক্ষায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। চৌকস, পেশাদার ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পুলিশ অফিসার হিসেবে সমাদৃত চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বাহিনীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) ও দুইবার বাংলাদেশ পুলিশ পদকে (বিপিএম) ভূষিত হন।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ১৯৬৪ সালের ১২ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার শ্রীহাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকসহ (সম্মান) স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।

এদিকে, অতিরিক্ত আইজিপি কামরুল আহসান মেধাবী ও কর্মঠ পুুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে পরিচিত। বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন, গ্রেড-১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান ছিলেন। তার নেতৃত্বে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়। তা ছাড়া তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সিলেটে বিট পুলিশিং কার্যক্রম চালু করে সুনাম অর্জন করেন।

১৯৯১ সালে বিসিএস ১২তম ব্যাচের (পুলিশ) ক্যাডারে যোগদান করেন কামরুল আহসান। প্রশিক্ষণ শেষে খাগড়াছড়ি জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পদায়ন হয় তার। এরপর চট্টগ্রামের হাটহাজারী সার্কেলের এএসপি হন তিনি। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি, শরীয়তপুর, চট্টগ্রাম ও যশোর জেলার পুলিশ সুপার, পুলিশ সদর দপ্তরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (সংস্থাপন) ও অ্যাডিশনাল ডিআইজি (ট্রেনিং) এবং রেলওয়ে রেঞ্জের ডিআইজি ছিলেন।

কামরুল আহসান জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে সিয়েরা লিওন ও সুদানে ‘পুলিশ অ্যাডভাইজার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিশনগুলোয় দৃষ্টান্তমূলক অবদান রাখায় ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা পদক’ লাভ করেন তিনি। পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম (সেবা) পেয়েছেন দুবার। এ ছাড়া দুবার আইজি ব্যাজ অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ইমামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কামরুল আহসান। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।