দেশজুড়ে আলোচিত রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেনসহ দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা জানিয়েছেন, এই সাপের কামড়ে রোগীর চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত এন্টিভেনম টিকা মজুদ আছে। এই সাপটি নিজে থেকে তেড়ে এসে কামড়ায় না। এমনকি বিশ্বের বিষধর শীর্ষ ১০ সাপের তালিকায় এটি নেই। অথচ এই সাপ নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কনভেনশন হলে ‘রাসেলস ভাইপার ফেয়ার ভার্সেস ফ্যাক্ট’ শীর্ষক এক আলোচনাসভায় এসব তথ্য জানানো হয়।
আলোচনাসভায় রাসেলস ভাইপার নিয়ে কোনও ধরনের ভুল তথ্য না ছড়ানোর আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রত্যেক এলাকার সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা সাপে কাটা রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে আনলে চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। এই রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে আনতে পারলে বাঁচানো সম্ভব। ভ্যাকসিন নেই, রোগী মারা গেছে দয়া করে এই ভুল তথ্য কেউ দেবেন না। ভুল তথ্য দিলে মানুষ আতঙ্কিত হয়। রাসেলস ভাইপারের এন্টিভেনম বাংলাদেশের প্রত্যেক হাসপাতালে আছে। যদি না থাকে আমরা নিয়ে আসার ব্যবস্থা করব।
রাসেলস ভাইপার নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সারা দেশে চিকিৎসক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য কর্মী, বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। রাসেলস ভাইপারের আতংক একদিন চলে যাবে। করোনাকালে আমরা শুনেছিলাম, ঢাকার রাস্তায় মানুষের লাশ পড়ে থাকবে। চিকিৎসকদের কল্যাণে তা হয়নি। এবারও সবার চেষ্টায় এ সমস্যা থেকে উত্তরণ করতে পারব। তাই আসুন, আমরা একসাথে সচেতন হই।
এ সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা বলেন, বাংলাদেশে সবাই চিকিৎসক- এটি একটি বড় সমস্যা। আমাদের এখানে যেকোনো রোগে মানুষ নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ওষুধ খায়। এমনকি এন্টিবায়োটিকও খায়। সাপের কামড়ে ওঝাদের কাছে না গিয়ে যেকোনো রোগে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। সাপের বিষয়ে আমরা সচেতনা তৈরির চেষ্টা করছি। এই বিষয়ে গণমাধ্যনের সহযোগিতা চাই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক দীন মো. নূরুল হক বলেন, দেশে ৬৬৫ জনকে প্রতিদিন কুকুরে কামড়ায়। ডুবেও অনেক সংখ্যক মানুষ মারা যায়। রাসেলস ভাইপারে কামড়ের সংখ্যা আরও অনেক কম। এ বিষয়ে আতঙ্ক তৈরি না করে সচেতন হবে। ভয় তৈরি করা যাবে না।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. টিটো মিঞা বলেন, সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা আছে ও দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি হাসপাতালে এন্টিভেনম পৌঁছানো হয়েছে। আমাদের চিকিৎসকরা এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত। তবে ওঝাসহ নানা কারণে রোগী হাসপাতালে আসতে দেরি করায় মৃত্যু বাড়ে। দেরিতে হাসপাতালে এলে রোগীরা জটিল অবস্থায় চলে যায়। ওই অবস্থায় তাদের আইসিইউ বা ইনটেনসিভ কেয়ার সেন্টারের প্রয়োজন হয়। হাসপাতালে এই জটিল রোগীদের মৃত্যু অনেকটার রোধ করা সম্ভব যদি ইনটেনসিভ সেবা নিশ্চিত করা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, সাপ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। সাপের বিষ ওষুধ তৈরির একটি উপাদান। তাই সাপ দেখলেই মেরে ফেলা যাবে না। মানবসৃষ্ট কারণের সাপ তার বাসস্থান থেকে লোকালয়ে আসছে। রাসেল ভাইপার নিয়ে অসংখ্য মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপের একটি। অথচ বিশ্বের দশটি বিষধর সাপের মধ্যেও নেই রাসেলস ভাইপার।
অনুষ্ঠানে রাসেলস ভাইপারের বাসস্থান, অভ্যাসসহ নানা বিষয় তুলে ধরেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালযয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু রেজা, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু শাহীন মো. মাহবুবুর রহমান ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ।
তারা জানান, এখন পর্যন্ত দেশের ২৭ জেলায় রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপ পাওয়া গেছে। এর মানে এই নয় যে, এসব এলাকার মানুষ ঘর থেকে বের হবে না। এই সাপ নিয়ে অনেক বেশি গুজব ছড়িয়েছে। এই সাপ কখনও তেড়ে এসে মানুষকে কামড়ায় না। সে বিপদের ঝুঁকি দেখলেই শুধু কামড় দেয়। দেশে ২০১৩ সালে প্রথম এই সাপের কামড়ে রোগী পাওয়া যায়। এ সাপের দংশনে ৭০ শতাংশ রোগী সুস্থ হচ্ছে। বাকি ৩০ শতাংশ মারা যাচ্ছে হাসপাতালে দেরিতে আসার কারণে। বর্তমানে দেশে এর এন্টিভেনম রয়েছে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এর এন্টিভেনম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দেশে এর এন্টিভেনম তৈরি কাজ চলমান আছে।