শিল্পে তৃপ্তি থাকতে নেই

সূর্যের তেজ তখনো কমেনি। পরনে পাঞ্জাবি, পায়ে স্যান্ডেল। মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি। গরমে পাঞ্জাবি ভিজে গেছে। তবু মুখে চিরপরিচিত হাসি। একুশে পদকপ্রাপ্ত বাচনিক শিল্পী, অভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় কিছুক্ষণ বসলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুনের রুমে। কথা হলো বিভিন্ন বিষয়ে। এরপর ছবি তুলতে গেলেন। তারপর ডিজিটাল স্টুডিওতে। তাকে ঘিরে আছেন বিশেষ প্রতিনিধি প্রতীক ইজাজ, সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, হেড অব ইভেন্ট শিমুল সালাহ্ উদ্দিন সহ-সম্পাদক এনাম-উজ-জামান বিপুল এবং ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান। যদিও তিনি ছিলেন ছবির বাইরে। ক্যামেরায় নুরুস সাফা। 

কথা হচ্ছে এলোমেলো। একপর্যায়ে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বললেন সম্ভবত এ পর্যন্ত ১৩০টি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেছি। এ ছাড়া ফিল্ম, টেলিফিল্ম এবং একক নাটক হয়েছে প্রায় ৮৫০টি। হাত ছড়িয়ে আড্ডার ভূমিকা দিচ্ছিলেন শিমুল সালাহ্ উদ্দিন। কথা বলার একপর্যায়ে লিটু হাসান তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন। দুই হাত ছড়িয়ে, দাঁত বের করে হাসতে হাসতে তাকে বাধা দিয়ে বললেন বাধা দিয়েন না। দাদার পাশে বসছি। এরপর লিটু হাসান তাকে বললেন রেডি, ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর, গো...। শিমুল সালাহ্ উদ্দিন ভূমিকা দেওয়ার সময় অনেক বিশেষণে ভূষিত করলেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়কে। ভূমিকা শেষে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বললেন, আমার তো আরও অনেক প্রতিভা আছে। তিনি বেশ কিছু পরিচয়ের কথা বললেন। শিমুল সালাহ্ উদ্দিন হাসতে হাসতে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের হাতে হাত রেখে বললেন আপনি যা বললেন, এর বাইরে কী আছে? হাহাহাহাহা। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় হাসতে হাসতে বললেন- সব বলা যাবে না। ওসব থাক, ব্যক্তিগত ব্যাপার। শিমুল সালাহ্ উদ্দিন বললেন- আমাদের জয়ন্ত দা একজন সফল পিতাও। তার দুই ছেলে, আমাদের রতœ। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এমন কথা শুনে বললেন ওরা একসময় ভালো অভিনয়, আবৃত্তি করত। আমার বড় ছেলে ইন্দ্রনীল। আর ছোট  ছেলে কৃষ্ণেন্দু। বড় ছেলে পড়েছে ফাইন আর্টসে। স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে থেকে পড়াশোনা করে এসেছে। সব পড়াশোনাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছে। আর ছোট ছেলে পড়েছে জাহাঙ্গীরনগরে।

এনথ্রোপোলজিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু আমার বন্ধু সেলিম আল দীন জোর করে ওর বিভাগে ভর্তি করে নেয়। বলেছিল, তোমার ছেলে অন্য বিষয়ে পড়বে কেন?  যাক, ভালোই হয়েছে।  একদিন ওরা সিদ্ধান্ত নিল, আর আবৃত্তি বা অভিনয় করবে না। আমি খুব বকাবকি করলাম। বললাম, কেন আর এসব করবি না? ওরা বলল, যদি তোমাকে ক্রস করতে না পারি? সবাই হো হো করে হেসে উঠল। তিনি বললেন, লোকে বলবে ওওও, সে তো জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে। শিমুল সালাহ্ উদ্দিন বলেন ওদের সঙ্গে আপনার তাহলে ঝগড়া ভালোই হয়। সবাই হো হো করে হেসে উঠেল। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ও হাসি দিয়ে বললেন হয় না মানে, হ্যাঁ অনেক...। অবশ্য এখন আমি পেরে উঠি না ওদের সঙ্গে। যতদিন পেরেছি, ততদিন ডমিনেট করেছি। তখন ওদের জিততে দেইনি, এখন আমার আর জেতা যাচ্ছে না। আমি বলেছি দ্যাখ, সেদিন আমি সবচেয়ে খুশি হবো, যেদিন তোদের পরিচয়ে আমি পরিচিত হবো। সবাই তোদের নাম ধরে বলবে এটা ওদের বাবা।

শিমুল সালাহ্ উদ্দিন : আপনি দেশে-বিদেশে অনেক আবৃত্তি অনুষ্ঠান করেছেন। একজন স্বনামধন্য আবৃত্তি প্রশিক্ষক।

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : নিজেকে ‘প্রশিক্ষক’ বলব না। আবৃত্তি নিয়ে তাদের সঙ্গে ভাব বিনিময় হয়। আমি মনে করি না, প্রয়োগ শিল্পে কাউকে শেখানো যায়। একজন গাইড থাকতে পারে। একজন শিল্পীকে তৈরি করা যায় না। সে তৈরি হয়। নিজেই নিজেকে তৈরি করে।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : এখানে শিক্ষক বা গুরুর কোনো কৃতিত্ব নেই?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : এর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। ব্রিটিশরা আসার আগ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা ছিল আশ্রমকেন্দ্রিক। গুরু-শিষ্য পরম্পরা। গুরুগৃহে যেত, ৭-৯ বছরের মধ্যে। তাদের নাম হতো দ্বিজ। এর মানে হচ্ছে, দ্বিতীয়বার যে জন্মাচ্ছে। বাবা-মা গুরুর আশ্রমে গিয়ে ওদের দিয়ে আসত। তখন গুরুকে তারা বলতেন আপনার কাছে দিয়ে গেলাম। আপনিই ওর পিতা-মাতা। প্রথম জন্ম আমাদের মায়ের কোলে। দ্বিতীয় জন্ম বা জ্ঞানের জন্ম যা, সেটা গুরুগৃহে। তারা ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত থাকত। এ সময়টার নাম হচ্ছে ব্রহ্মচর্য। এখানে কিন্তু শুধু পুঁথিবিদ্যা না, জীবনযাপনের জন্য যত বিষয় আছে , শিকার-গো পালন থেকে শুরু করে সবই শেখানো হতো। এসব কিন্তু শেখানো হতো হাতে-কলমে। ২৫ বছর বয়সে সে ‘স্নাতক’ হয়ে অভিজ্ঞান পত্র নিয়ে ফিরে আসবে মাতৃগৃহে। এরপর সে বিয়ে করবে, সংসার জীবনযাপন করবে। এর নাম হচ্ছে ‘গার্হস্থ্য’। সে এটা ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত করবে। এরপর সে আস্তে আস্তে পুত্র-কন্যার হাতে সমস্ত দায়িত্ব দেবেন। তখন থেকে শুরু হবে ‘বানপ্রস্থ’। এটা চলবে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত। এরপর সে সংসার ত্যাগ করবে। পরে শুরু হবে সন্ন্যাস জীবন। তখনকার দিনে কিন্তু ন্যাচারাল বৃদ্ধাশ্রম ছিল। তারা নিজেরাই চলে যেত, পাহাড় কিংবা জঙ্গলে। একটা জিনিস খেয়াল করো গুরুর সান্নিধ্যে সবসময় থাকল তারা। আর এখন কী হ”েচ্ছ? একজন  শিক্ষক ৩০-৪০ মিনিট ক্লাস নিয়ে গেলেন। এরপর ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তারপর আরেকজন এলেন। এভাবে চলছে। গুরুর সঙ্গে সংযোগটা কোথায়? সুতরাং সেই ছাত্র তৈরি হবে কীভাবে? দিক নির্দেশনা কীভাবে পাবে? একটি ক্লাসে স্টুডেন্ট কত!

শিমুল সালাহ্ উদ্দিন : আপনার গুরু কারা? কবে থেকে ভাবলেন, আপনি আবৃত্তি বা অভিনয় শিল্পী হবেন?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : শোনো, আমার জন্ম ১৯৪৬ সালে সাতক্ষীরায়। আমাদের সময়ে ছিল কী প্রত্যেকটি স্কুলে, এখন এসব বন্ধ হয়ে গেছে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত। এরপরের ১৫ দিন কিন্তু একদম ছুটি। এই ছুটিটাও কিন্তু শিক্ষকরা তখন বৃথা যেতে দিতেন না। ৭ দিন ৭ দিনের কাজ ছিল। সেখানে নাটিকা, গান, আবৃত্তি, নাচ, সাঁতার, খেলাধুলাসহ নানান ধরনের অনুষ্ঠান ছিল। সবাই কিন্তু সবকিছু করতাম। যখন কলেজে ভর্তি হলাম, তখন আবৃত্তি নিয়ে নতুন একটা ভাবনা এলো। তখন কলকাতার বহুরূপীর কল্যাণ হালদার, তিনি নামকরা আবৃত্তিশিল্পী এবং অভিনেতা ছিলেন। তার ও তার মামিমার একটা আবৃত্তি শুনে আমি রাতে ঘুমাতে পারিনি। ভাবলাম, আবৃত্তি তাহলে এই! তখন আমি তার কাছে গেলাম। তার সঙ্গে আলাপ করে আমার চোখ খুলে গেল। তখন ভাবলাম, এটা আমার করতেই হবে। তিনি আমার আবৃত্তি শুনলেন। বললেন তোমার হবে। তখন আবৃত্তি কী, কেন এ রকম একটা পরামর্শ দিলেন। এটা কোনো শেখানো না। মনে রেখো, শিল্পে কিন্তু নকল নিষিদ্ধ। এটা করলে হয় নকল করতে হবে, নয় কৃত্তিমতার আশ্রয় নিতে হবে। যা স্বতঃস্ফূর্ত নয়, সেটা শিল্প হতে পারে না। সাবলীলতা কিন্তু এমনি এমনি আসে না। রবীন্দ্রনাথের একটা লাইন আছে না ‘সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। সবচেয়ে সহজ যেটা মনে হচ্ছে, সেটা কিন্তু সহজেই পাওয়া যায় না। এর জন্য অনেক চর্চা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা দরকার। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুনে মনে হবে এ আর এমন কী? সহজেই গাওয়া যাবে। তুমি একবার গেয়ে দেখো তো! হুমায়ূন আহমেদের নাটক বা উপন্যাসের কথাগুলো লিখে দেখ তো? পড়তে বা শুনতে সহজ লাগে! আমি অনেক চেষ্টা করেও কোনো সংলাপ পরিবর্তন করতে পারিনি। স্বাচ্ছন্দ্য হারিয়ে যায়। আমি যাত্রা, রেডিও-টিভি, মঞ্চ, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি।

প্রতীক ইজাজ : আমরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যখন আবৃত্তি করেছি, তখন আপনাকে নিয়মিত দেখেছি। 

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : আমিই কিন্তু দেশে প্রথম দ্বৈত এবং বৃন্দ আবৃত্তি শুরু করি। আগে শুধু একক আবৃত্তি ছিল। ফিন্যান্সের একটা সূত্র আছে র ম্যাটেরিয়ালস, প্রডাকশন, ডিমান্ড এবং সাপ্লাই। এরপর হচ্ছে, কনজামশন। এখানে একটা ব্যালেন্স থাকতে হয়। এই সমাজে যে পরিমাণ গায়ক-গায়িকা, নৃত্যশিল্পী দরকার, তার চেয়ে কম রয়েছে। অভিনেতা-অভিনেত্রীও একটু কম আছে। কিন্তু আবৃত্তিকার আছেন অনেক বেশি। যখনই ডিমান্ডের চেয়ে সাপ্লাই বেশি হবে, তখনই মান কমে যাবে। মানসম্পন্ন পারফরমেন্স করতে হলে, তোমাকে একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকতে হবে। যা ডিমান্ডের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ। 

প্রতীক ইজাজ : আপনি তো প্রয়োগের দিকটা বললেন। যখন ৭০ দশকে দেশ চষে বেরিয়েছেন, আপনার কী এখন মনে হয় আমাদের আদর্শগত কোনো পরিবর্তন হয়েছে?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তখন অনেক পথনাটক, একাঙ্ক নাটক করেছি। সেখানে একটা আদর্শ ছিল।

তাপস রায়হান : আপনাকে মানুষ যতটুকু না অভিনয় শিল্পী হিসেবে জানে, তার চেয়ে বেশি কিন্তু আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে চেনে। যদিও অভিনয়ে শ্রম, মেধা, সময় বেশি দিয়েছেন?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় :  (মুচকি হেসে) না, সেটা তোমাদের কাছে। সেটা একটা শ্রেণি। কিন্তু গণমানুষ কিন্তু আমাকে অভিনেতা হিসেবেই জানে।  এখন তো হাতে হাতে সিনেমা হল। এর ফলে যারা অভিনয় করেন, তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে পরিচিত। এখন কিন্তু সম্ভাবনা নিয়ে অনেকেই বের হয়ে আসছে।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : অনেকেই বলেন  চঞ্চল, মোশাররফ করিম বা বেশ কয়েকজন অভিনেতাকে আমরা ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারছি না। আপনার ক্ষেত্রে কি এ রকম মনে হয়?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : এটা আমি জানি না। আমাকে কোনো পরিচালক অভিনয় দেখিয়ে দেননি। তারেক মাসুদ,  হুমায়ূন আহমেদ কেউ না।  আমি কিন্তু সব পরিচালকের কাছে পরামর্শ চাই। কেমন অভিনয় করতে হবে? কেউ এ পর্যন্ত কিছুই বলেনি। সে যে বয়সীই হোক। শট দেওয়ার পর আমি বলি আপনি কি স্যাটিসফাইড? তারা মুচকি হেসে ওকে বলেন। আমি কিন্তু অভিনয় করি না, চরিত্রের আচরণ তৈরি করার চেষ্টা করেছি। ইংরেজিতে একটা কথা আছে অ্যাকটিং ইজ রিয়াকটিং। তুমি যত কথা বলবে, তার চেয়ে অনেক কঠিন অন্যের কথা শুনে তোমার রিয়্যাকশনটা কেমন হবে, সেটা। আমাদের এখানে সেটা তেমন মানা হয় না।

প্রতীক ইজাজ : আমার মনে হয়, বাইরের আপনি আর ভেতরের আপনাকে আলাদা করা কঠিন। একই রকম লাগে।

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : আমি জানি না। হাহাহাহাহা।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : আপনাদের পরিবারে একটা সাংস্কৃতিক আবহ ছিল। সে বিষয়ে জানতে চাইছি?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : বাবা আবৃত্তি করতেন। কাকা ভালো পিয়ানো বাজাতেন। কাকিমা ক্লাসিক্যাল মিউজিক করতেন। আমার এক দিদি গান গাইতেন, আরেক দিদি গিটার বাজাতেন। আমরা ৩ ভাই, ৫ বোন। অনেক বড় পরিবার ছিলাম। এখন আছি ৩ বোন, ২ ভাই। আমি জ্ঞান হওয়ার পরই দেখছি, আমাদের গ্রামে যাত্রা হয়। সারা বছর খেলা। আর গ্রামে ছিল অনেক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। হোম লাইব্রেরি তো ছিলই। শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা লাইব্রেরি ছিল। বাবার হাত ধরেই আমি মধুসূদন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শেকসপিয়ার পড়া শিখেছি। আবার মা-কাকিমাদের সেসব পড়ে শোনাতে হতো। আমাদের বাড়িতে যাত্রাপালা হতো। আবার ওপরের চিলেকোঠার অ্যাপ্রোচটাই হচ্ছে, থিয়েটার স্টেজ।  কাকা, বোনরাও অভিনয় করত। গ্রামে যাত্রা হতো। সেখানে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছি। দুটোর পার্থক্যটা তখনই টের পেয়েছিলাম। যাত্রায় চারদিক খোলা, আর প্রসেনিয়াম বা মঞ্চে একদিকে খোলা। এই দুটো মাধ্যমে অভিনয়ের পার্থক্য কিন্তু তখনই বুঝেছি। আবার ধরো বেতার নাটক। সেখানে কিছুই তো আমি দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে কণ্ঠ দিয়ে সেই দৃশ্যটা আমাকে আঁকতে হবে। চারপাশে যা আছে সেটা বোঝাতে হবে। কার সঙ্গে অভিনয় করছি, সেটা বোঝাতে হবে। চরিত্রটা বোঝাতে হবে সব কিন্তু গলা দিয়েই।

এটা অনেক বেশি কণ্ঠনির্ভর। আবার টেলিভিশন মাধ্যমে কিন্তু একটা ব্যাপার আছে। এটাকে ড্রইংরুম মিডিয়া বলে। সবাই গল্প করছি, আড্ডা দিচ্ছি, চা খাচ্ছি, কেউ উঠে যাচ্ছে সেই মাধ্যম কিন্তু আলাদা। স্ক্রিনটা ছোট। ক্লোজআপের সংখ্যা কম। আবার লংশটও আছে। কিন্তু এটা বেশি আছে চলচ্চিত্রে। সবখানে তো একই স্টাইলে অভিনয় করা যাবে না। যাত্রাটা কিন্তু একেবারেই আলাদা। সেখানে অনেক কিছু প্রকট করতে হয়। আবার চলচ্চিত্রে সংযত হতে হয়। এখানে অভিনয় করতে হলে অনেক পারদর্শিতা দরকার।

তাপস রায়হান : এ ক্ষেত্রে আবৃত্তি নিশ্চয়ই আপনাকে অনেক সাহায্য করেছে?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ, অভিনয়ে অনেক কাজে লেগেছে।

প্রতীক ইজাজ : আপনার আবৃত্তির অ্যালবামগুলোর কথা মনে পড়ে? নিশ্চয়ই অনেক স্মৃতি আছে? সেই সময়টা একটু বলবেন?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : অবশ্যই। আমি দেশে দ্বিতীয় আবৃত্তি অ্যালবাম করি। প্রথমটা ছিল কাজী আরিফের। সেই সময় তো একটা উত্তেজনা ছিলই।

তাপস রায়হান : আপনাকে তো একুশে পদক দেওয়া হলো, আবৃত্তিতেই?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : এটা ওরা ভুল করেছে। দুটো উল্লেখ করতে পারত। আমার অভিনয়টা কাজে লেগেছে আবৃত্তিতে। আবার আবৃত্তি কাজে লেগেছে সংগীতে। চলচ্চিত্রে সবগুলোই কাজে লেগেছে। আমার জন্য এটা সহজ হয়েছে।

লিটু হাসান : অভিনয় কতদিন করবেন?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : যতদিন সুস্থ আছি করব। আর অসুস্থ হয়ে গেলে, যদি অসুস্থের চরিত্র পাই, তখন সেটা অভিনয় করব। হাহাহাহাহাহাহা। (সবাই হো হো করে হেসে বললেন দাদা, এটা কিন্তু ভালো বলেছেন।) আমি অভিনয় ছাড়তে চাইলেও, অভিনয় তো আমাকে ছাড়ছে না।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : আপনার পরিবারে অনেকেই অভিনয় করতেন। কখনো কি মনে হয়েছে, রচনা বা নির্দেশনা দেওয়ার?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : (খেতে খেতে) হুম হুম, করেছি তো। অবশ্য যে অভিনেতা, সেই মানুষের পরিচালনা না করাই ভালো। আবার যে পরিচালক, তার অভিনয় না করা ভালো।

প্রতীক ইজাজ : আপনি লেখালেখিও করেন। একসময় ভালো কবিতাও লিখতেন। এ সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ, করি তো। এটা কোনো চিন্তাভাবনা নিয়ে করিনি। আমার একটা অভ্যাস ছিল ডায়েরি লেখার। প্রতিদিন লিখতাম। আমার বাবা ডায়েরি লিখতেন, রোজনামচা লিখতেন। অনেকটা পাকামি করে আমিও লেখা শুরু করি।

তাপস রায়হান : আপনি কি তৃপ্ত?

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় : শিল্পী জীবনে না ব্যক্তি জীবনে? হাহাহাহাহা। শিল্পে তৃপ্তি থাকতে নেই। এখানে অতৃপ্ত থাকলেই অগ্রগতি।

অ ল্প স্ব ল্প

চলচ্চিত্র : মাটির ময়না, ঘেটুপুত্র কমলা, বৃত্তের বাইরে, বাড়ির নাম সাহানা, ৭১ সেইসব দিন, জধাবহ, নয় নম্বর বিপদসংকেত, পূর্ণগ্রাসের কাল, আগস্ট ৭৫, একজন কবির মৃত্যু, অন্তর্যাত্রা, রানওয়ে, ঞযব খধংঃ ঞযধশঁৎ, কিত্তনখোলা, মাটির প্রজার দেশে, দাওয়াল, অপেক্ষা, নিরন্তরসহ ১৫০টির অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়।

আবৃত্তি অ্যালবাম : আত্মপ্রকাশ, দ্বিতীয়া, আগুনের ডালপালা, দোঁহে, শুধুই রবীন্দ্রনাথ, প্রেমের পদাবলী, প্রহরের পত্রাবলী, উত্তমকথনে নারীসহ ২২টি অ্যালবাম।

৮০০টির বেশি সীমিতদৈর্ঘ্য টেলিভিশন ফিকশন, টেলিফিল্ম, টেলি-ধারাবাহিকে অভিনয়।

১০টি চিত্রনাট্য রচনা।

১২টির অধিক গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা।

দেশ-বিদেশে দর্শনির বিনিময়ে প্রায় ৩০টি একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান।

অসংখ্য বিজ্ঞাপনচিত্র এবং তথ্যচিত্রের ধারাভাষ্যে কণ্ঠদান।

প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭।

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ

ছবি : আবুল কালাম আজাদ