বাণিজ্যিকের আবাসিক ব্যবহার ভবন হয়ে উঠছে মৃত্যুকূপ

পাঁচতলা ভবনের দোতলা পর্যন্ত দোকান। তৃতীয়তলা থেকেই মানুষের বসবাস। না, শুধু ব্যাচেলর নয়, রীতিমতো পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস। এ চিত্র বিক্ষিপ্ত কোনো বাণিজ্যিক ভবনের নয়। চট্টগ্রাম মহানগরীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ভবন ও মার্কেট এলাকা বলে স্বীকৃত রেয়াজউদ্দিন বাজারের তামামকুমুন্ডি লেনের। আর শুধু তামামকুমুন্ডি লেনই নয়, পুরো রেয়াজউদ্দিন বাজার এলাকার সব ভবনেই একই চিত্র। ফায়ার সার্ভিস থেকে এসব ভবনকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি জেলা প্রশাসন থেকে ঝুঁকিমুক্ত করার কথা বলা হলেও কোনো অগ্রগতি নেই।

ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্কেট ভবনকে কোনোভাবেই আবাসিক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু রেয়াজউদ্দিন বাজার ও তামামকুমুন্ডি লেনের ভবনগুলোতে দোতলার পর থেকে ওপরের দিকে একেকটি রুমে ছয় থেকে সাতজন করে থাকে। এ ছাড়া বারান্দায় সিলিন্ডার দিয়ে গ্যাসের চুলায় রান্না করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এক ভবনের সঙ্গে আরেক ভবন লাগোয়া থাকায় কোনো আলো-বাতাস নেই এসব ভবনে। ফলে আগুন লাগলে ধোঁয়ার কারণেই দম বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যাবে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতের অগ্নিকাণ্ডেও একই ঘটনা ঘটেছে। আগুনে দগ্ধ হয়ে নয়, ধোঁয়ার কারণে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।’

রেয়াজউদ্দিন বাজারের পুরো এলাকাটি অগ্নিঝুঁকিতে থাকার অন্য আরেকটি কারণ উল্লেখ করে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘সব ভবনের দাহ্য পদার্থের দোকান রয়েছে। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর মানুষ বের হওয়ার বিকল্প কোনো রাস্তা নেই।’

এ বিকল্প রাস্তার খোঁজে গতকাল শুক্রবার সকালে কথা হয় তামামকুমুন্ডি লেনের মোহাম্মদী প্লাজার নিরাপত্তা প্রহরী মকবুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখানকার সব ভবনের গেট রাত ১টার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনো ভবন থেকে মানুষ যেমন বের হতে পারবে না, তেমনি প্রবেশও করতে পারবে না। মার্কেটের নিরাপত্তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ অভিযোগ রয়েছে এসব এলাকার ভবনে আগুন লাগলে মানুষ বের হওয়ার কোনো রাস্তা পায় না। ফটক বন্ধ থাকে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গেট বন্ধ রাখা হয়। মালিকের নির্দেশনা ছাড়া আমরা গেট খুলতে পারি না।’

একই ধরনের মন্তব্য করেন তামামকুমুন্ডি লেন বণিক সমিতির সিকিউরিটি অফিসার সরওয়ার কামাল। তিনি বলেন, ‘আমতল থেকে তামামকুমুন্ডি লেন হয়ে জলসা মার্কেট পর্যন্ত আমাদের ১১০টি মার্কেট রয়েছে। এসব মার্কেটের গেটের জন্য ১৫৮ জন দারোয়ান রয়েছে। রাতের বেলা মার্কেটের নিরাপত্তার স্বার্থে গেট বন্ধ রাখা হয়। এ ছাড়া রেয়াজউদ্দিন বাজারে রয়েছে আরও প্রায় ২০০ মার্কেট। সব মার্কেটেই গেট রয়েছে এবং রাতের বেলা বন্ধ রাখা হয়।’

ফটক বন্ধ রাখলে দুর্ঘটনার সময় মানুষ বের হতে পারে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তামামকুমুন্ডি লেনের বণিক সমিতির আজীবন সদস্য ও বিনিময় টাওয়ারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘গেট খুলে দিলে বহিরাগতরা এসে দোকান ভেঙে জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে অগ্নিকান্ডের পর গেট খুলে দেওয়ার পর অনেক দোকানে লুটের ঘটনা ঘটেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মার্কেটগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করার সুযোগ নেই। তাই মার্কেটের ভেতরের রোডগুলোর উভয় পাশে উচ্ছেদ অভিযান চালালে রাস্তা চওড়া হবে এবং ঝুঁকির মাত্রাও কমে আসবে।’

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘রেয়াজউদ্দিন বাজারের মার্কেটগুলো সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এগুলো শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে ১১ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা এগুলো বাস্তবায়নের জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আগেও বৈঠক করেছি, এখন আবারও করব। তবে মার্কেট ভবনে কোনোভাবেই আবাসিক ব্যবহার করা যাবে না।’

একই ধরনের মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারী। তিনি বলেন, ‘রেয়াজউদ্দিন বাজারের অনেক ভবনের অনুমোদনও নেই। আবার যেগুলো অনুমোদন নিয়েছে সেগুলো বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন পেয়েছে। সেখানে আবাসিক ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।’

ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের ৪৩টি মার্কেট ও স্পটকে অগ্নিকান্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত বছর এসব ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ লেখা সাইনবোর্ডও টানিয়ে দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। ভবনগুলো হলো নগরীর হক মার্কেট, স্বজন সুপার মার্কেট, বখতেয়ার মার্কেট, নজু মিয়া হাট মার্কেট, বলির হাট মার্কেট, ভেড়া মার্কেট, চাক্তাই চাউল পট্টি, শুঁটকি পট্টি, খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ, মিয়াখান নগর পুরাতন ঝুট মার্কেট, ওমর আলী মার্কেট, পোর্ট মার্কেট, বড়পুল বাজার, ইশা মিস্ত্রি মার্কেট, ফকিরহাট মার্কেট, নয়াবাজার মার্কেট, ফইল্যাতলি বাজার, চৌধুরী মার্কেট, রেলওয়ে বস্তি, কলসি দীঘিরপাড় এলাকাধীন কলোনি, আকমল আলী রোড এলাকাধীন কলোনি, চকভিউ সুপার মার্কেট, কেয়ারি শপিং মল, গোলজার মার্কেট, রেয়াজউদ্দিন বাজার, জহুর হকার মার্কেট, টেরিবাজার, তামামকুমুন্ডি লেন, ঝাউতলা বস্তি, আমবাগান বস্তি, সেগুনবাগান বস্তি, কদমতলী রেলওয়ে বস্তি, সিঙ্গাপুর সমবায় সমিতি মার্কেট, কর্ণফুলী মার্কেট, ২ নম্বর গেট রেলওয়ে বস্তি এলাকা, অক্সিজেনমোড় রেল রাস্তা সংলগ্ন বস্তি, বার্মা কলোনি, ড্রাইভার কলোনি, শেরশাহ কলোনি ও রৌফাবাদ কলোনি।