যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটদলীয় প্রার্থী জো বাইডেন ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে প্রথম মুখোমুখি বিতর্ক হয়েছে। বিতর্কে ট্রাম্প ও বাইডেন দুজনই বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেছেন প্রায় দেড় ঘণ্টা। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ৩৫ মিনিট ৪১ সেকেন্ড এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কথা বলেছেন ৪০ মিনিট ১২ সেকেন্ডের মতো। সেই হিসাবে ট্রাম্প একটু বেশিই বলেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে সিএনএন আয়োজিত এই বিতর্ক আটলান্টায় মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যমটির স্টুডিওতে অনুষ্ঠিত হয়।
পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সীমান্ত ইস্যু, সামাজিক নিরাপত্তা, চাইল্ড কেয়ার, কংগ্রেস ভবনে হামলার ঘটনা এবং গর্ভপাতসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলার সময় তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ আনেন এবং পরস্পরকে তীব্র বাক্যবাণে জর্জরিত করার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু কিছু মিথ্যা ও কিছু অতিরঞ্জিত তথ্যের এই বিতর্কে জিতল কে? এপির সত্যতা যাচাই বলছে, ট্রাম্পের মিথ্যা বলার পাল্লা বাইডেনের তুলনায় বেশি।
সিএনএনের তাৎক্ষণিক জরিপ অনুযায়ী, বিতর্ক দেখেছেন এমন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৬৭ শতাংশ বলেছেন, ট্রাম্প ভালো করেছেন। আর মাত্র ৩৩ শতাংশ বাইডেনের পক্ষে মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিবিসির স্পেশাল করোসপনডেন্ড কেইটি কে লিখেছেন, এবারের বিতর্কের ফরম্যাট ছিল আমেরিকানদের জন্য তুলনামূলক ভালো। বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পই জিতেছেন। কিন্তু এটি কি তাকে নির্বাচনে জিততে সহায়তা করবে?
কেইটি আরও বলেন, তবে সঞ্চালকরা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেননি এবং এটা ছিল জো বাইডেনের জন্য একটি খারাপ রাত। তার অনেক জবাবই পরিষ্কার ছিল না। তাকে বয়স্ক মনে হচ্ছিল। তবে বিতর্কের দ্বিতীয় ধাপ তার জন্য কিছুটা ভালো ছিল এবং তিনি কিছুটা শক্তি পেয়েছিলেন। তবে এটি হতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টেলিভিশন বিতর্ক একে অন্যকে লক্ষ্য করে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ করেছেন দুই প্রধান প্রার্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চার বছরের মধ্যে এই প্রথম তারা আগামী ৫ নভেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে একে অন্যের মুখোমুখি হলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প অর্থনীতি সামলানো, পররাষ্ট্রনীতির রেকর্ড ও ব্যাপকসংখ্যক অভিবাসীর বিষয়ে বাইডেনের তীব্র সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, আদালতে সম্প্রতি ট্রাম্পের সাজার প্রসঙ্গ তুলে তাকে ‘গণতন্ত্রের জন্য হুমকি’ বলে উল্লেখ করেন বাইডেন।
অর্থনীতি : মার্কিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দুজন দুজনকে দোষারোপ করেন। বাইডেন দাবি করেন, তিনি ট্রাম্পের রেখে যাওয়া নাজুক অর্থনীতি পেয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের দাবি, বাইডেন উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভালো অর্থনীতি পেয়েছেন।
সীমান্ত সংকট : বাইডেনের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত সংকটে কেন ভোটাররা তার ওপর আস্থা রাখবেন। জবাবে বাইডেন বলেন, মার্কিন কংগ্রেসে একটি দ্বিদলীয় সীমান্ত বিল পাস করার জন্য তার প্রশাসন অনেক চেষ্টা করেছে। অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্পের আমলের নানা পদক্ষেপের সমালোচনা করেন বাইডেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের জন্য বাইডেনের অভিবাসননীতিকে দায়ী করেন ট্রাম্প।
ক্যাপিটল হিলে হামলা : ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলার জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেন বাইডেন। ট্রাম্প বলেন, সেদিন তার কার্যত কিছুই করার ছিল না।
গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধ : ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধের অবসান ঘটাতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করবেন কি না, এই প্রশ্নে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি ট্রাম্প। বাইডেনকে প্রশ্ন করা হয়, এই যুদ্ধ শেষ করতে তিনি কী করবেন। উত্তরে বাইডেন বলেন, হামাসই এই যুদ্ধের শেষ চায় না। বাইডেন ইসরায়েলের প্রতি তার জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিতর্কে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠে আসে। বাইডেন বলেন, তিনি মনে করেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন একজন যুদ্ধাপরাধী। ট্রাম্প বলেন, তিনি নির্বাচনে জিতলে ইউক্রেনে যুদ্ধ থামাবেন।
বিতর্ক ট্রাম্প শেষ করেছেন এই বলে যে আমেরিকার মানুষ এখন জাহান্নামে বাস করছে। ‘সাড়ে তিন বছর ধরে আমরা জাহান্নামে বাস করছি।’
অন্যদিকে শেষ বক্তব্যে বাইডেন আমেরিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বলেন, তিনি কর কমিয়ে আনতে চান। একই সঙ্গে দাবি করেন, ট্রাম্প কর বাড়িয়ে দেবেন।
জো বাইডেন পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আক্রমণ করেন। এর আগে ট্রাম্প সম্প্রতি জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের বন্দুক আইনে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি তুলেছিলেন।
পর্যবেক্ষকরা কী বলছেন : এদিকে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের যারা মনোযোগ দিয়ে বিতর্ক দেখেছেন, তারা অনেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান স্টেফাইন মারফি বিবিসিকে বলেছেন, বিতর্কে কিছু মুহূর্ত ছিল যেখানে বাইডেন তার বয়স তুলে ধরেছেন। তাকে বোঝাটা কষ্টসাধ্য ছিল।’
তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছু মন্তব্য করেছেন, যা “সত্যি নয়” এবং এগুলোর সত্যতা যাচাই করা উচিত। উদ্বেগের জায়গা হলো, নির্বাচনের ফল গ্রহণ করবেন কি না, তা বলতে ডোনাল্ড ট্রাম্প অনীহা দেখিয়েছেন।’
সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান রোডনি ডেভিস বলেছেন, ‘বিতর্কটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিষ্কার জয়। আমেরিকা জুড়ে ডেমোক্র্যাটদের জন্য দুঃখজনক বিতর্কের ধরনটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সহায়তা করেছে।’
বিবিসির ম্যাডেলাইন হ্যালপার্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর কোরউইন স্মিডট বলেছেন, ‘বাইডেন তার অনেক দুর্বলতা দেখিয়েছেন এবং খুব বেশি শক্তির জায়গা দেখাননি। ভিজ্যুয়াল, কণ্ঠ ও জবাব দেওয়ার গতির কারণে তাকে অনুসরণ করাটা কঠিন ছিল। অনেক তথ্যভিত্তিক জবাব ও পয়েন্ট প্রেসিডেন্ট বাইডেন দিয়েছেন। কিন্তু বলার ধরনের কারণে সেগুলো দ্রুত হারিয়ে গেছে।
ট্রাম্প নির্বাচনের ফল মানবেন? বিতর্ক পরিচালনাকারী সিএনএনের সঞ্চালক ট্রাম্পের কাছে দুবার জানতে চান যে নির্বাচনে যিনিই জিতুন, তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফল মানবেন কি না। ট্রাম্প বারবার প্রশ্নটি উপেক্ষা করছিলেন; বরং রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে চলে যাচ্ছিলেন।
এরপর আবারও তাকে একই প্রশ্ন করা হয়। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি এটি সুষ্ঠু, আইনগত ও ভালো নির্বাচন হয়, তাহলে অবশ্যই মানব।’ একই সঙ্গে তিনি ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে তার বড় ধরনের কারচুপির অপ্রমাণিত দাবির পুনরাবৃত্তি করেন।
প্রার্থীদের বয়স প্রসঙ্গ : বাইডেনকে তার বয়স সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় যে তিনি যখন দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করবেন, তখন তার বয়স হবে ৮৬। তিনি হবেন সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট জবাবে বলেন, একসময় তিনি সবচেয়ে কম বয়সী আইনপ্রণেতা বলে সমালোচনার শিকার হতেন এবং ট্রাম্প তিন বছরের ছোট এবং অনেকটাই কম যোগ্য।
অন্যদিকে ট্রাম্পকে বলা হয় যে তার বয়স এখন ৭৮ এবং দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে তা হবে ৮২ বছর। জবাবে ট্রাম্প বলেন, তার স্বাস্থ্য ভালো। এ সময় তিনি গলফ খেলার প্রসঙ্গও টেনে এনে বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি ২৫-৩০ বছর আগের মতোই ভালো অবস্থায় আছি। সত্যি বলতে, আমি এখন আরও উজ্জ্বল।
বাইডেনের সঙ্গে বিতর্কে ট্রাম্প জয়ী : সিএনএনের তাৎক্ষণিক জরিপ অনুযায়ী, বিতর্ক দেখেছেন এমন নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ বলেছেন, ট্রাম্প ভালো করেছেন। আর মাত্র ৩৩ শতাংশ বাইডেনের পক্ষে মত দিয়েছেন। বিতর্ক শুরুর আগে একই ভোটারদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ বলেছিলেন, বাইডেনের চেয়ে ট্রাম্প ভালো করবেন বলে তারা ধারণা করছেন। আর বাইডেনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ ভোটার।
তবে সিএনএন বলছে, জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা দেশটির সব ভোটারের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করেন না। যারা বিতর্কটি দেখেছেন, আর এই জরিপে অংশ নিয়েছেন, শুধু তাদের মতামতই এই ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের মধ্যে রিপাবলিকপন্থিদের সংখ্যা কিছুটা বেশি থাকতে পারে।
বিতর্কটি যারা দেখেছেন, জরিপে অংশ নেওয়া এমন ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতার প্রশ্নে বাইডেনের ওপর তাদের আস্থা নেই।
বাইডেন শিবিরে হতাশা, চনমনে ট্রাম্প শিবির : বিতর্কে বাইডেন ভালো করতে পারেননি। এ নিয়ে তার নিজ দল ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে হতাশা দেখা গেছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাইডেনের বিতর্ক শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিপদঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। অবশ্য বাইডেন মনে করেন, তিনি ভালোই করেছেন। একই সঙ্গে বলেন, একজন মিথ্যাবাদীর সঙ্গে বিতর্ক করা কঠিন।
অন্যদিকে বিতর্ক শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্পের প্রচারশিবির তার জয় দাবি করে। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান দলের নেতা স্টিভ স্কালিস এক বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্প বিতর্কে জয়ী হয়েছেন। বাইডেন আরেক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার উপযুক্ত নন। ট্রাম্পই আগামী ৫ নভেম্বরের নির্বাচনের একমাত্র পছন্দের প্রার্থী।
সূত্র : সিএনএন বিবিসি,এপি