সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে শিক্ষকদের কর্মবিরতির কারণে অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এ ইস্যুতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সম্মিলিতভাবে কর্মবিরতি কর্মসূচি নিয়েছে।
এ বিষয়ে তারা আপত্তি জানালেও সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় আজ সোমবার থেকে একযোগে ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। এ সময় তারা ক্লাস পরীক্ষা না নেওয়ার ও অন্য কার্যক্রম না চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরোধিতার মধ্যেই আজ থেকে সর্বজনীন পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’ চালু হচ্ছে।
নতুন নিয়মে পেনশন বাবদ অধ্যাপক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রায় কোটি টাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা ৩০ থেকে ৬০ লাখ টাকা কম পাবেন। সুযোগ-সুবিধা কমে যাওয়ার কারণে মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করতে আগ্রহ হারাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছর ১৩ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয় প্রত্যয় স্কিমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্তির প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, দেশের সব স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরিতে যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারী চলতি বছর ১ জুলাইয়ের পর যোগ দেবেন, তারা সর্বজনীন পেনশনের আওতাভুক্ত হবেন। স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় ৪০০ সংস্থা রয়েছে, যেগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন চার লাখের বেশি। এ ধরনের সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর এ প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিসহ দেশের প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা ফুঁসে ওঠেন। বেশ কয়েক দিন মানববন্ধন, অর্ধদিবস কর্মবিরতিসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন তারা। প্রত্যয় স্কিমের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটেও শিক্ষকনেতারা জোরালো বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুপারগ্রেডে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান তারা। তারা বলছেন, এ প্রজ্ঞাপন কার্যকর হলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম বৈষম্যের শিকার হবেন।
দাবি আদায়ে আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে যাচ্ছেন দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। গতকাল রবিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আজ থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে যাচ্ছেন। এতদিন পরীক্ষা কর্মসূচির বাইরে ছিল। কিন্তু আজ থেকে ক্লাস-পরীক্ষাসহ দাপ্তরিক সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবেন শিক্ষকরা।
সর্বশেষ ৯ বছর আগে ২০১৫ সালে সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল বহাল রাখার দাবিতে টানা আট মাস আন্দোলন করেন শিক্ষকরা। শিক্ষকদের এই নজিরবিহীন কর্মবিরতিতে সে সময় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায়। আবারও সে পথেই হাঁটছে পেনশন আন্দোলন।
প্রত্যয় স্কিমের নিয়মানুযায়ী, ১ জুলাই থেকে প্রত্যয় স্কিমে যুক্ত ব্যক্তির মূল বেতনের ১০ ভাগ বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা কেটে জমা করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, যার বেতন ১ লাখ টাকা তার ক্ষেত্রে বেতনের ১০ ভাগ হিসাবে (১০ হাজার টাকা) না কেটে ৫ হাজার টাকা কাটা হবে। অন্যদিকে যার বেতন ১০ হাজার টাকা তার ক্ষেত্রে ১০ ভাগ হিসাবে ১ হাজার টাকা কাটা হবে। সমপরিমাণ অর্থ প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া হবে। অবসরের পর সেই টাকা থেকে মাসিক পেনশন পাবেন। বিষয়টিকে বৈষম্যমূলক বলছেন আন্দোলনকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। নতুন নিয়ম পর্যালোচনা করে একটি রিপোর্ট তৈরি করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সেখানে ১৩টি বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বর্তমান নিয়মে শিক্ষকদের কোনো টাকা কাটা হয় না। নতুন নিয়মে টাকা কাটা হবে। বর্তমানে একজন অধ্যাপক এককালীন আনুতোষিক পান ৮০ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। নতুন নিয়মে এককালীন কোনো টাকাই পাবেন না। এ ছাড়া নমিনিদের সুযোগ-সুবিধা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, এলপিআর-সংক্রান্ত নির্দেশনা না থাকাসহ নানা অসংগতি তুলে ধরা হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান পেনশন স্কিমে মাসিক পেনশনের সঙ্গে চিকিৎসা ভাতা, বছরে দুটি উৎসব ভাতা ও একটি বৈশাখী ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন স্কিমে এসব কোনো কিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বর্তমানে প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিএফ) থেকে ১০ শতাংশ কাটা হয়। কিন্তু পেনশন বাবদ কোনো অর্থ কাটা হয় না। বর্তমানে অর্জিত ছুটি অবসরকালে জমা থাকলে তার পরিবর্তে অর্থ দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন স্কিমে এ বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। একজন সরকারি চাকরিজীবী এলপিআরে গেলে কী ধরনের সুবিধা পাবেন সে বিষয়েও কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বর্তমানে নিট পেনশনের ওপর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন স্কিমে সেটি শূন্য। বর্তমানে পেনশন বাবদ এককালীন আনুতোষিক, ছুটি নগদায়ন, বেনোভোলেন্ট ফান্ড বাবদ ২৪ মাসের বেতন, এলপিআর বাবদ ১২ মাসের বেতন সুবিধা পান। সব মিলিয়ে অধ্যাপকরা ১ কোটি টাকার বেশি, কর্মকর্তারা ১ কোটি টাকার কাছাকাছি, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা ৫০ থেকে ৬০ লাখ এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা কম পাবেন।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘এতদিন পর্যন্ত আলোচনার জন্য ডাকা হয়নি। প্রত্যয় স্কিম চরম অপরিপক্ব হাতের কাজ এবং বিভ্রান্তিকর। এই স্কিম বাতিল করতে হবে। যারা প্রধানমন্ত্রীকে এ কুপরামর্শ দিয়েছে, তারা ষড়যন্ত্রকারী। আমরা নিজেদের সুবিধার জন্য আন্দোলন করছি না, করছি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য।’ তিনি বলেন, ‘প্রত্যয় স্কিমের যারা প্রবর্তক তাদের সঙ্গে বসে সরাসরি আলোচনা করতে চাই। তারা বলুক, বর্তমান সিস্টেম কতটুকু লাভজনক হবে, কতটুকু ক্ষতি হবে। প্রত্যয় স্কিমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি চরম অবজ্ঞার।’
শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘একটি কায়েমি গোষ্ঠী প্রধানমন্ত্রীকে বিভ্রান্ত করে প্রত্যয় স্কিম চালু করিয়েছে। এ স্কিম বৈষম্যমূলক। আমরা শিক্ষকরা আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাই। আমরা বিভিন্নভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা কোনো আগ্রহ দেখাননি। ফলে সর্বাত্মক আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ ছিল না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, ‘বিদ্যমান পেনশন সিস্টেমে একজন শিক্ষক অবসরকালে এক কোটি টাকা পান, প্রত্যয় স্কিমে সেটি পাবেন না। প্রত্যয় স্কিমে নমিনির জায়গাটা বাদ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা সম্পর্কে কোনো কিছুই পরিষ্কার করা হয়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, আমাদের প্রভিডেন্ট ফান্ড কেটে দেওয়া হয়েছে। পেনশন হচ্ছে একটি সুরক্ষা বলয়, কিন্তু শিক্ষকদের থেকে এই সুরক্ষা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’
বাংলাদেশ আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স ফেডারেশনের সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘কাল (আজ) থেকে শিক্ষকদের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদও অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতিতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেওয়া হবে। পানি থাকবে না, বিদ্যুৎ থাকবে না, টয়লেট পরিষ্কার করার কেউ থাকবে না, ময়লা পরিষ্কার করার কেউ থাকবে না, গাড়ি চলবে না, অফিস চলবে না, কোনো কিছু চলবে না সব বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা আমাদের পেট বাঁচানোর তাগিদে এগুলো করতে বাধ্য হব।’
চারটি আলাদা কর্মসূচি (স্কিম) নিয়ে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় গত বছর ১৭ আগস্ট, যা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এগুলো হচ্ছে প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা। প্রগতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীদের জন্য। সমতা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য। প্রবাস শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য। আর সুরক্ষা রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য। এবারের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন আরেকটি কর্মসূচি চালু হবে।