তিস্তাও যাচ্ছে চীন!

আগামী জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর এটি প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফর। এই সফরে বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি পূরণে আর্থিক সহায়তা এবং নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রতি ভারত সফরে তিস্তা প্রকল্পে ভারতের আগ্রহ প্রকাশের কারণে তার চীন সফরেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ৮ থেকে ১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। তবে সফরের মূল কর্মসূচি ৯ ও ১০ জুলাই সীমিত থাকবে। ৯ জুলাই দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। ১০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এ সফরের সময় চীনের পার্লামেন্ট ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস অব চায়নার প্রেসিডেন্ট ঝাও লেজির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।

আসন্ন সফরে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নানা বিষয় প্রাধান্য পাবে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এবারের সফরের বিশেষ দিকটি হবে বাংলাদেশের জন্য চীনের ৭০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৪০ কোটি ইউয়ানের বেশি ঋণ। এর মধ্যে বাণিজ্য-সহায়তার আওতায় ৫০০ কোটি ডলার ও বাজেট সহায়তার আওতায় ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ স্থানীয় মুদ্রায় বাংলাদেশকে ঋণ দেবে চীন। এর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে যেভাবে টাকা-রুপিতে লেনদেনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেই ধারাবাহিকতায় টাকা-ইউয়ানে লেনদেনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। এ ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের সময় সইয়ের জন্য এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারকসহ (এমওইউ) ১১টি দলিল চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই), বাণিজ্য সহায়তা, বিনিয়োগ সুরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সুনীল অর্থনীতি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সমীক্ষার ঘোষণা ও একাধিক মৈত্রী সেতু নির্মাণ ও সংস্কার।

এদিকে এশিয়ায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত ও চীনে এই অল্প সময়ের সফর ঘিরে যেমন বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনা তুুঙ্গে। তেমনি ভারত-চীনসহ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলও বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে মহাপরিকল্পনায় অর্থায়নে  চীনের পর ভারতের আগ্রহ।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, তিস্তা প্রকল্পে আপাতদৃষ্টিতে ঢাকাকে দিল্লির দিকে ঝুঁকে থাকতে দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের পর সংবাদ সম্মেলনে নিজেই বলেছেন, তিস্তার সঙ্গে যেহেতু পানিবণ্টনের বিষয়ে ভারতের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাই এই প্রকল্প ভারত করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়।

কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা অনেক বেশি। তারপরও এক দশকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। চীন কোনোভাবেই এই অঞ্চলে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বটা নষ্ট করতে চায় না।

এদিকে বাংলাদেশে অনেকগুলো মেগা প্রজেক্ট চলছে চীনের অর্থায়নে। আবার কয়েকটি বড় প্রজেক্ট শেষ হয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধের কিস্তির টাকা নিয়ে বেইজিংয়ের কাছে ছাড় চাইবে ঢাকা। আবার নতুন করে প্রকল্প ও অর্থায়নের বিষয়েও আগ্রহী ঢাকা। এর মধ্যে চীনের পক্ষ থেকে তিস্তা নিয়ে কী বার্তা থাকবে, সেটিও দেখার বিষয়।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্র বলছে, তিস্তায় চীনকে শীতল রাখতে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা। এরই মধ্যে এক মাসে দেশটিতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ঢাকা বার্তা দিয়েছে। তবে তিস্তায় কূটনৈতিক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

জানা গেছে, শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খুব শিগগিরি দিল্লি থেকে একটি কারিগরি টিম আসবে প্রকল্পের বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করতে।

এদিকে  তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা না হলেও তিস্তা প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা। তবে ভারতের নতুন করে কারিগরি টিম পাঠানোর বিষয়টিকে তারা কালক্ষেপণ বলে মনে করছেন।

এ ব্যাপারে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, ভারতের এই আগ্রহ ও কারিগরি টিম পাঠানোর বিষয়টি বাংলাদেশও কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চায়। এটা প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। তারা বলেছেন, যেভাবে বাংলাদেশের লাভ হবে, সেখানেই তারা আগ্রহী। চীন সফরে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হবে, ভারত যেহেতু আগ্রহী এবং তারা কারিগরি টিম পাঠাচ্ছে। তাদের পরিকল্পনাও বাংলাদেশ দেখতে চায়।

পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইননুন নিশাত এ নিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এতে মনে হচ্ছে ভারত প্রকল্পটি ঝুলিয়ে দিল। তারা সময়ক্ষেপণ করবে। ভারতের কারিগরি দল বা প্রতিনিধিরা এসে বলবে, প্রকল্পের যা কিছু কাজ তা বাংলাদেশে হবে। আমাদের সংকট হলো প্রকল্প যে-ই করুক, পানি আসতে হবে ভারত থেকে। শুকনার সময়ে যদি ভারত পানি ছাড়ে, তাহলে এই প্রকল্প দিয়ে কী হবে।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতের তিস্তা প্রকল্পের আগ্রহের কারণ হলো তারা কোনোভাবেই চায় না  চীন এই প্রকল্পে যুক্ত হোক। জিও পলিটিক্যাল কারণে এই অঞ্চলের কাছাকাছি কোনো জায়গায় তারা চীনকে দেখতে চায় না। তা ছাড়া ভারতের প্রতি বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা অনেক বেশি। তারা মনে করে, বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের আছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ূন কবির বলেন, ‘তিস্তা প্রকল্পে কারও সঙ্গে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাওয়ার দরকার নেই। আমরা চাই না প্রকল্পটি ঝুলে পড়ুক। যাদের এই প্রকল্প করার সামর্থ্য আছে, তারাই করলে ভালো। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পানি পাওয়ার বিষয়টি। সেটি নির্ভর করে ভারতের ওপর। সেটা সরকারের পক্ষ থেকে বুঝে-শুনেই করা হবে।’

তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে একটি পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে, একটি কারিগরি টিম আসবে। তাতে মনে হলো তিস্তা চুক্তি অনিশ্চিত। অথচ ২০১১ সালে চুক্তির সব চূড়ান্ত হয়েছিল। শুধু স্বাক্ষর করা বাকি। তারা বলছে, (নরেন্দ্র মোদি) মমতা ব্যানার্জি রাজি নয়। এখানে বিষয়টি হলো বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে সেখানে পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে চুক্তি না হওয়া দুঃখজনক। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প বা আরও অনেক খাল খননের পরিকল্পনা  নেওয়া হয়েছে। অনেকগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে। তাতে তিস্তার পানি থাকবে না।