সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এমনিতেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। এখন আবার সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা থেকে পাঁচ বছর অন্তর সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি উল্লেখ করে নিয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষের কাছে হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান শিথিল করা হচ্ছে। প্রতি বছর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) বার্ষিক আয়কর বিবরণীর সঙ্গে যে সম্পদের বিবরণী জমা দেন, তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে এনবিআর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগ সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল এবং দুর্নীতি উৎসাহিত করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে দুর্নীতির বিস্তার রোধে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী আইন-বিধান মেনে দাখিল ও তা প্রকাশের নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুবীর নন্দি দাস হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আবেদনটি করেন।
সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিধান ১৯৭৯ সালে চালু করা হয়। দেশে বর্তমানে ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারী আছেন। চাকরিজীবীদের জবাবদিহি নিশ্চিতে আচরণ বিধিমালায় এ নিয়ম যুক্ত করা হয়। কিন্তু চার দশকেও এ নিয়ম পুরোপুরি প্রতিপালন করা যায়নি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সংস্থার কাছে বারবার তাদের কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী চেয়েও সবার বিবরণী পায়নি।
সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি মানাতে না পেরে এখন এ নিয়ম বদলে ফেলা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এনবিআর নিজেই সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেবে। একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ বিবরণীও জমা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
অভিযোগ আছে, একশ্রেণির সরকারি কর্মচারী এনবিআরে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে প্রকৃত সম্পদ দেখান না। বেনামে সম্পদ লুকিয়ে রাখেন।
১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, আয়কর বিবরণীতে জমা দেওয়া তথ্য সংরক্ষণ করার বাধ্যবাধকতা আছে। তা প্রকাশেও নিষেধ আছে। এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আদালত চাইলে কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতো রাষ্ট্রীয় তদন্তকারী সংস্থা চাইলেই শুধু ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার যেকোনো তথ্য প্রদান করতে পারে এনবিআর।
প্রতিটি আয়কর রিটার্ন ফরমের সঙ্গে আইটি ১০বি নামের একটি আলাদা ফরম থাকে। ওই ফরমেই সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হয়। সম্পদ বিবরণী জমার তিনটি শর্ত আছে। সে অনুযায়ী সম্পদের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা অতিক্রম করলে; গাড়ির মালিক হলে এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি-বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট থাকলে সম্পদ বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক।
আচরণবিধি অনুযায়ী সব সরকারি কর্মচারীর সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। যাদের টিআইএন আছে এবং ৪০ লাখ টাকার বেশি সম্পদধারী কিংবা বাড়ি-গাড়ি আছে এমন সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যাদের ৪০ লাখ টাকার কম সম্পদ আছে কিংবা বাড়ি-গাড়ি নেই, তাদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার নিয়ম কীভাবে প্রতিপালিত হবে?
সরকারি কর্মচারী আইন (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১২ ও ১৩ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের স্থাবর সম্পত্তি অর্জন, বিক্রি ও সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বাড়ি, জমি, ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন সম্পদের বিবরণী দিতে বলা হয়েছে। এমনকি কোনো জমি-বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ যেকোনো সম্পদ কিনতে ও বিক্রি করতে অনুমতি নিতে হয়। সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে টাকার উৎস সম্পর্কে জানাতে হয়। আবার সম্পদ বিক্রি করা হলে মূল্য জানাতে হয়। কারণ, কমবেশি মূল্যে সম্পদ বেচাকেনা হলো কি না, তা যাচাই করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল ও তা প্রকাশের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধানসহ ১৯ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনের যুক্তিতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দিতে হয়। এ ছাড়া কোনো ভবন ও বাড়ি করতে গেলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের বেশিরভাগ সেটা করছেন না। তাদের ক্ষেত্রে আইনের এসব বিধান প্রতিপালন হয় না। রিট আবেদনে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না এবং সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাবসংক্রান্ত প্রতিবেদন কেন আদালতে দাখিল করা হবে না, এ প্রশ্নে রুলের আরজি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের অবৈধ সম্পদ অর্জন প্রতিরোধে একটি কার্যকর ও যথাযথ আইন প্রণয়নে বিবাদীদের (রিট মামলার বিবাদী) নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, এ প্রশ্নেও রুলের আরজি জানিয়েছেন রিটকারী আইনজীবী।
অ্যাডভোকেট সুবীর নন্দি দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাম্প্রতিককালে সরকারের বেতনভুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদের অহরহ অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের কথা হলো, সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিধানটি প্রতিপালিত করা গেলে দুর্নীতি নিরুৎসাহিত হবে। এ কারণেই আইনের বিধান প্রতিপালনে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, আদৌ এ নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা জানতে চেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী নিজ নিজ সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া এবং তা দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। কার্যতালিকায় এলে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে চলতি সপ্তাহে আবেদনটির ওপর শুনানি হতে পারে।’