যুক্তরাজ্যের জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ আজ। এদিন দেশটির ৬৫০ নির্বাচনি কেন্দ্র বা আসনে ভোট হবে। ভোটাররা একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন। এবারের নির্বাচনে মূলত লড়াই হবে ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভ পার্টি (টোরি) ও লেবার পার্টির মধ্যে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য একটি দলকে জিততে হবে ৩২৬ আসন। অবশ্য যুক্তরাজ্যের এক বিশেষ আইনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও যারা এগিয়ে থাকবে, তারাই সরকার গঠন করতে পারবে। সে হিসেবে লেবার পার্টিই এবার ক্ষমতায় যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে বিভিন্ন জরিপে।
এদিকে এবার রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী লড়ছেন ভোটে। যুক্তরাজ্যের ভোটে এবার রেকর্ড ৩৪ বাংলাদেশি প্রার্থী লড়ছেন। এই প্রার্থীদের মধ্যে আছেন আটজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী, যাদের মধ্যে ছয়জনই নারী। আর ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে লড়ছেন দুই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। অন্যান্য দলের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি অব ব্রিটেন থেকে ছয়জন, রিফর্ম ইউকে থেকে একজন, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস (লিব ডেম) থেকে একজন, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) থেকে একজন, গ্রিন থেকে তিনজন এবং সোশ্যালিস্ট পার্টি থেকে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী সাধারণ নির্বাচনে নিজ নিজ দলের টিকিট পেয়েছেন। এই ২৩ জনের বাইরে যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১১ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক।
এর আগে ২০১৫ সালের ভোটে প্রার্থী হয়েছিলেন ১১ ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আর ২০১৯ সালে সংখ্যা ছিল ১৪।
গত মঙ্গলবার জরিপ কোম্পানি সার্ভেশনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবারের ভোটে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ৬৫০ আসনের মধ্যে ৪৮৪ আসনে জয় পাবে। এর আগে ১৯৯৭ সালে সাবেক নেতা টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি ৪১৮ আসনে জয়ী হয়ে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছিল। কিন্তু এবার দলটি ওই ফলাফলকেও ছাড়িয়ে অনেক দূর যাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এর বিপরীতে ১৪ বছর ধরে যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভ পার্টি (টোরি) মাত্র ৬৪ আসন পেতে পারে বলে অনুমান প্রকাশ করা হয়েছে। এটি হতে পারে ১৮৩৪ সালে রক্ষণশীল এ দলটির প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল। এ ছাড়া ডানপন্থি রিফর্ম ইউকে পার্টি সাতটি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সার্ভেশন তাদের বিশ্লেষণে মাল্টিলেভেল রিগ্রেশন ও পোস্ট-স্ট্রাটাফিকেইশন (এমআরপি) কৌশল ব্যবহার করেছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ের জনমত থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের বড় ধরনের নমুনাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।
জরিপকারী সংস্থাগুলো বলেছে, এই মডেলে জরিপ চালানোর বদলে জরিপের তথ্যগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য এমআরপি বিশ্লেষণগুলোও দেখিয়েছে, নির্বাচনে লেবার পার্টি এর চেয়ে আরও কম ব্যবধানে জয় পেতে যাচ্ছে, তবে সার্বিকভাবে কেউই এই ফলাফলের অন্যথা হবে বলে পূর্বাভাস দেয়নি।
এর আগে রেডফিল্ড ও উইলটন স্ট্র্যাটেজিসের যুক্তরাজ্যজুড়ে পরিচালিত নিয়মিত জরিপে নির্বাচনে লেবার নিশ্চিত জয়ের পথে রয়েছে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, যুক্তরাজ্যের এবারের নির্বাচনে ছোট-বড় মোট ৯৫টি রাজনৈতিক দল প্রার্থী দিয়েছে। দেশটির ইতিহাসে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমনসের ৬৫০ আসনের বিপরীতে এবারই সবচেয়ে বেশি ৪ হাজার ৫১৫ জন প্রার্থী ভোট করছেন।
ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম মিরর লিখেছে, এবার জাতীয় নির্বাচন এতটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে যে এমন কোনো নির্বাচনী আসন নেই, যেখানে অন্তত পাঁচজন প্রার্থী দাঁড়াননি। এমন একটি আসন রয়েছে, যেখানে সর্বাধিক ১৩ প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন। এবার ৩১৭ আসনে ৪৫৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোট করছেন।
বিবিসির হিসাব অনুযায়ী, এবার প্রার্থী দেওয়া ৯৫ দলের মধ্যে ৩৪টি একজন করে প্রার্থী দিয়েছে এবং বাকি দলগুলোর একাধিক প্রার্থী রয়েছে।
বাংলাদেশি কারা :
বিবিসি জানাচ্ছে, ৩৪ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর মধ্যে বেশিরভাগই এবার প্রথম ভোটে দাঁড়িয়েছেন। তাদের মধ্যে আবার অনেকে গাজা সংকটে লেবার পার্টির অবস্থানের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। বিবিসি লিখেছে, মূলত গাজায় ইসরায়েলের হামলা নিয়ে লেবার পার্টি এবং দলটির এমপিদের নীরবতার প্রতিবাদ হিসেবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
সম্প্রতি ব্রিটেনের ডেইলি সানের ‘ইলেকশন শো-ডাউন’ অনুষ্ঠানে লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে শুধু বাংলাদেশিদের নাম নেওয়ায় তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে পড়েন। একে পুঁজি করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা লেবার পার্টির দিকে ঝুঁকে থাকা ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের ভোট টানার চেষ্টা করছেন।
যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রার্থী ভোট করছেন, যাদের মধ্যে লেবার ও ব্রিটেনের ওয়ার্কার্স পার্টি ১৪ জন রয়েছেন।
লেবার পার্টি থেকে আট প্রার্থী, যার চারজনই সংসদ সদস্য। আগের নির্বাচনেও এই আটজন প্রার্থী ছিলেন দলের। এবার যে আটজন লড়ছেন, তার মধ্যে চারজন সদ্য ভেঙে দেওয়া পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। এবারও তারা তাদের একই নির্বাচনী আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন। এই চার সংসদ সদস্য হলেন রুশনারা আলী, রূপা আশা হক, টিউলিপ সিদ্দিক ও আফসানা বেগম।
এ ছাড়া লেবার পার্টির অন্য চার প্রার্থী হলেন উইথাম আসনে রুমি চৌধুরী, সাউথ নর্থহ্যামটনশায়ারে রুফিয়া আশরাফ, গর্ডন অ্যান্ড বুশানে প্রার্থী হয়েছেন নুরুল হক আলী এবং নাজমুল হুসাইনকে প্রার্থিতার সুযোগ দেওয়া হয়েছে ব্রিজ অ্যান্ড ইমিংহ্যামে।
টোরি দলের দুই প্রার্থী
ক্ষমতাসীন টোরি পার্টি এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে দুজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশকে তাদের দলের প্রার্থী করেছে। যার মধ্যে টটেনহ্যাম থেকে দাঁড়িয়েছেন আতিক রহমান এবং ইলফোর্ড সাউথ থেকে লড়ছেন সৈয়দ সাইদুজ্জামান।
ব্রিটেনের ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে ছয় প্রার্থী
ব্রিটেনের ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে ভোটে লড়ছেন ছয়জন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে ইলফোর্ড সাউথ থেকে গোলাম টিপু, বেডফোর্ড থেকে প্রিন্স সাদিক চৌধুরী, হ্যাকনি সাউথ থেকে মোহাম্মদ শাহেদ হোসেন, আলট্রিনশাম অ্যান্ড সেল থেকে ফয়সাল কবির, ম্যানচেস্টার রুশলম থেকে মোহাম্মদ বিলাল এবং স্টার্টফোর্ড অ্যান্ড বো থেকে হালিমা খান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ ছাড়া কট্টর জাতীয়তাবাদী দল রিফর্ম ইউকের প্রার্থী সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রার্থী রাজ ফরহাদ, যিনি ইলফোর্ড সাউথ আসনে লড়ছেন।
বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড স্টেপনি আসনে লিব ডেম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রুবিনা খান। এ আসনে লেবার থেকে লড়ছেন রুশনারা আলী।
ডানফার্মলাইন অ্যান্ড ডলার আসন থেকে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক নাজ আনিস মিয়া।
জলবায়ু সহনশীল যুক্তরাজ্য গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতিতে আসা গ্রিন পার্টি থেকে এবার তিনজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ভোটে লড়ছেন। তারা হলেন ইলফোর্ড সাউথ থেকে সৈয়দ সিদ্দিকি, ওল্ডহ্যাম ওয়েস্ট ও রয়টন থেকে সৈয়দ শামসুজ্জামান শামস এবং লেইসেস্টার থেকে শারমিন রহমান।
ফোকস্টোন আসন থেকে সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী হয়েছেন মমতাজ খানম।
এ ছাড়া বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র ১১ প্রার্থী হচ্ছেন আজমল মাসরুর, সুমন আহমেদ, স্যাম উদ্দিন, ওয়েইস ইসলাম, এহতেশামুল হক, নুরজাহান বেগম, হাবিব রহমান রাজা মিয়া, ওমর ফারুক ও নিজাম আলী।