শাহজাদপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বিলীন ২৫ ঘর

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর ও শাহজাদপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরি ইউনিয়নের হাট পাচিল গ্রামে যমুনা নদীর ভাঙনে ২৫ বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরে যমুনার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অর্ধশত মানুষের পাশের নিচু সমতল জমিতে নির্মাণ করা বাড়িঘর ৩/৪ ফুট বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। ফলে তারা স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য নারী ও শিশুদের নিয়ে চৌকি অথবা মাচায় বাস করছেন। গত কয়েকদিনেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি কোনো ত্রাণসামগ্রী বা অর্থ সাহায্য। বন্যার পানিতে চুলা ডুবে যাওয়ায় অনেকের ঘরে ঠিক মতো রান্নাও হচ্ছে না। ফলে তারা একবেলা-আধবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।

এ বিষয়ে বন্যার পানিতে বাড়িঘর ডুবে মাচা ও চৌকিতে বাস করা হাট পাচিল গ্রামের আজিদা বেগম (৭৫), পরীবানু (৫০), বিউটি খাতুন (৪০), সুরা খাতুন (৪৫) বলেন, গত কয়েকটিন ধরে বন্যার পানিতে বাড়িঘর ডুবে গেছে। এ পর্যন্ত চুলা জ্বালাতে পারিনি। ফলে রান্নাবান্নাও হয়নি। সকালে পান্তা ও চিড়া খেয়েছি। দুপুরে না খেয়ে আছি। রাতে কি করব ভেবে পাচ্ছি না।

তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণে তৈরি সিসি ব্লকের স্তুপে ছাউনি তুলে বাস করা বিধাব টুলু বেগম (৬৫) বলেন, যমুনায় বাড়িঘর বিলীন হওয়ার পর বাড়ি করার সামর্থ না থাকায় ব্লকের স্তুপের ওপর পলিথিনের ছাউনি তুলে বাস করছি। এ ব্লকের স্তুপও বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। এটা ডুবে গেলে কোথায় যাব জানিনা। এ নিয়ে খুবই দুঃশ্চিন্তায় আছি।

মোতালেব হোসেন (৫০), ছগির মোল্লা (৫৫), আবু সাঈদ (৫০), সোহেল রানা বলেন, বন্যার বানিতে বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধি মা বাবাকে নিয়ে অতিকষ্টে চৌকি উচু করে অথবা মাচা পেতে আমরা ১০/১২টি পরিবার বাস করছি। রাতে ঘুমাতে পানি না ছোট ছোট ছেলে মেয়ে বন্যার পানিতে পড়ে তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে। ঘরে খাবার না থাকায় সেই সকালে খেয়েছি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার উপক্রম হল এখনও খাবার জোটাতে পারিনি। ফলে আমাদেও এখানে সবগুলো পরিবার অর্ধাহারে অনাহারে রয়েছে। তারপরেও আমাদের ভাগ্যে কোনো ত্রাণ সামগ্রী বা সরকারি বেসরকারি কোনো সাহায্য জোটেনি। কেউ আমাদের খোঁজ-খবরও নেয়নি। আমরা আশায় বুক বেঁধে পথের দিকে চেয়ে আছি কেউ সাহায্য নিয়ে এদিকে আসে কি না।

এদিকে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের অনেক গ্রাম নতুন করে বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। কাজিপুর উপজেলার খাসরাজবাড়ি ইউনিয়নের সানবান্ধাঘাট হতে বিশুরীগাছাঘাট ও শাহজাদপুর উপজেলার খুকনি ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগ্রাম, আরকান্দি, পাড়ামহোনপুর, ঘাটাবাড়ি, জালালপুর ইউনিয়নের জালালপুর, পাকুরতলা, গুচ্ছোগ্রাম, সৈয়দপুর, কৈজুরি ইউনিয়নের শরিফমোড়, মোনাকষা গ্রামে যমুনা নদীর ভাঙ্গণে আরও ২৫ বাড়িঘর যমুনাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনেকে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়িঘর সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। এ ছাড়া গত কয়েকদিনে যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব অর্ধশত মানুষ পাশের নতুন নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের স্তুপে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ ছাড়া শাহজাদপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ৫০০ বিঘা জমির নেপিয়ার ঘাস বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।

এ বিষয়ে কাওয়াকোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিয়া মুন্সি বলেন, এভাবে যমুনার ভাঙন অব্যহত থাকলে মানচিত্র থেকে অচিরেই মুছে যাবে কাওয়াকোলা ইউনিয়ন। গত কয়েকদিন ধরে কাওয়াকোলা ইউনিয়নের হাট বয়ড়া, দৌগাছী, বড়কয়রা, ছোট কয়ড়া, কৈগাড়ী, দড়তা, চন্ডল বয়ড়া, বেড়াবাড়ী গ্রামে যমুনা নদীর ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ায় কাওয়াকোলা ইউনিয়নের কয়ড়া কমিউনিটি ক্লিনিক নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, যমুনার ভাঙনের তাণ্ডবে যেকোনো মুহূর্তে কয়ড়া কমিউনিটি ক্লিনিক যমুনায় বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই এ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি নিলাম বিক্রির কমিটি গঠন করে প্রকাশ্যে নিলামের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শাহজাদপুর উপজেলার পাকুরতলা গ্রামের লাল মিয়া ও পাচিল গ্রামের আলাউদ্দিন, কালাম শেখ, আয়নাল হক অভিযোগ করে বলেন, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জ পাউবোর ১৪ জন ঠিকাদার সমন্বিতভাবে যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করত, তাহলে এবার বর্ষায় আমাদের এই সর্বনাশ হতো না।

এ বিষয়ে জালালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ বলেন, এ বছরও যমুনার ভাঙনে খুকনি, কৈজুরি ও জালালপুর ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত গ্রামগুলিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত কয়েক দিনে অন্তত অর্ধশত বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ কাজ তিন বছরেও শেষ না হওয়ায় নদীতীরের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।

গত ১২ ঘণ্টায় ২১ সেন্টিমিটার বেড়ে যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষাবাঁধের হার্ড পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রঞ্জিত কুমার সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।