ভারতকে সন্তুষ্ট রেখে চীনের সঙ্গে প্রকল্প আলোচনা

ভারত ও চীন ইস্যুতে কৌশলী নীতি অনুসরণ করতে চান প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সে কারণে প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতকে সন্তুষ্ট রেখে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা করতে চান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বেইজিং সফরে বাংলাদেশের স্বার্থে ভারতের প্রয়োজনীয়তার কথা চীনকে বোঝানো হবে। আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং অভিজ্ঞ কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়েছেন।

তারা বলেন, চীনকে যেমন বাংলাদেশের জন্য ভারতের প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝানো হবে, তেমনি চীনের সঙ্গেও বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হবে ভারতের কাছে। আগামী পাঁচ বছর কাউকে খেপিয়ে বা বাদ দিয়ে কারও ‘পেটে ঢুকে যাওয়ার’ নীতিতে চলবেন না বঙ্গবন্ধুকন্যা। ভারত ও চীন দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে বাংলাদেশ।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, ভারত-চীন সম্পর্ক ধরে রাখতে এ কৌশল মাথায় রেখেই ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ভারত সফর শেষ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২১ জুন ভারত সফরে যান প্রধানমন্ত্রী। দুদিনের এ সফরের শেষ দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। ওই বৈঠকে দুই দেশের জনগণের কল্যাণে সহযোগিতার বিষয়ে পরস্পরের ওপর আস্থা রাখার কথা জানান তারা। ওই সফরে চীন নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও তা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে গণমাধ্যমে কোনো খবর প্রকাশিত হয়নি। ভারত সফরের আগে চীন সফরের কথা উঠেছিল। যদিও পরে তা হয়নি।

৮ জুলাই বেইজিং যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১০ জুলাই তার সফর শেষ হবে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তার এ সফরে চীনের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও একধাপ এগিয়ে নিবিড় কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া। সেই লক্ষ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের পর এবার চীনের বৈশি^ক উন্নয়ন উদ্যোগে (জিডিআই) যুক্ত হওয়া। অন্যদিকে বাংলাদেশের পরিকল্পিত দক্ষিণাঞ্চলীয় অবকাঠামোর উদ্যোগে (সিডি) চীনের যুক্ত হওয়ার ঘোষণা আসতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের লক্ষ্য চীনের কাছ থেকে ঋণ পাওয়া।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে কূটনীতিক বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ডিকাব টক অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, রিজার্ভ সংকট নিয়ে বাংলাদেশ চীনের সহযোগিতা চেয়েছে। চীনও এতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

চীনের রাষ্ট্রদূত আরও বলেছেন, তিস্তা নদী বাংলাদেশের সীমানায়। এটা বাংলাদেশের নদী। তিস্তা নদীতে যে প্রকল্পই হোক না কেন, তার সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ। চীন সেই সিদ্ধান্তে সম্মান জানাবে।

কূটনীতি বিষয়ে আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় আরও জানা গেছে, ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় দেশটির নিরাপত্তা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে ভারত উদ্বেগের কারণ এ নিরাপত্তাই। প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরও মোদি সরকারের উদ্বেগ কমিয়ে আনা হয়েছে। তারা বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে এমন কোনো ব্যাপারে বাংলাদেশ সম্পৃক্ত হবে না। শেখ হাসিনার আশ্বাসে ভারতও আশ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানা আওয়ামী লীগ নেতারা।

চীনের সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পর চলতি বছর ভারত এ বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথা বাংলাদেশকে জানায়। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পের জন্য ভারতের কারিগরি কমিটি পাঠানোর বিষয়টি ঠিক হয়।

তিস্তা প্রকল্প-সংক্রান্ত চলতি বছরের প্রথম দিকে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে ভারতের গবেষণা সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অনুসূয়া বসু রায়চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, তিস্তা প্রকল্পের যে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে, সেটি অস্বীকার করা যাবে না। তিনি বলেন, ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্ব বহন করে এমন সব প্রকল্প নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীন ‘অতিরিক্ত আগ্রহ’ প্রকাশ করে। চীন চায় তাদের উপস্থিতি জোরালো করতে। তাছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জন্য তিস্তা নদীর পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিস্তা প্রকল্পের আওতায় আছে, নদী খনন করে গভীরতা বাড়ানো, সারা বছর নৌ-চলাচলের ব্যবস্থা করা, নদীর দুই তীরে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে ভারত। ভারতকে দেওয়া আশ্বাসের বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে কতটুকু নিশ্চিত করা হবে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে মোদি সরকার।

কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে অভিজ্ঞ আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীন সরকার বাংলাদেশের ওপর খানিকটা গোস্বা করে আছে। চীন প্রত্যাশা করেছিল, নতুন করে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত তিনবারের রেওয়াজ পাল্টে এবার সরকারি সফরে প্রথম চীনেই যাবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী প্রথম ভারত সফর করেছেন।

ক্ষমতাসীন দলের এই নেতারা বলেন, ভারত-চীন সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের জন্য চীন সরকার ‘আরামদায়ক’ একটি অবস্থান নিয়েছে। সেটি হলো ভারতকে কম গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ চলুক সেই নীতিতে চীন নেই। কিন্তু চীনকে কম গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে ভারতের ইঙ্গিত রয়েছে। এখানেই এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে শেখ হাসিনার সরকারের। যদিও ভারতকে কম গুরুত্ব দেওয়ার নীতি চীনের না থাকার ফলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের টালমাটাল সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। একাধিক নেতা বলেন, এ বিষয়টি পুঁজি করে চীনকে সামাল দেওয়ার সুযোগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে রয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগের অন্য একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভারতকে কম গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে চীনের অবস্থান দেশটির এক ধরনের কৌশল। চীন উন্নয়ন অংশীদারত্বের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এমন গভীরে নিয়ে যেতে চায় যে, তারা মনে করে এর মধ্য দিয়ে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে তুলতে পারবে। সূত্রটি আরও জানায়, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ঢাকা-বেইজিং রাজনৈতিক সম্পর্ক অনেকাংশে বাড়বে। তবে সেটি দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

মন্ত্রী পদে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের এক নেতা বলেন, চীন গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পে যে অগ্রাধিকার পেয়েছে, এ মেয়াদে তা কম পেতে পারে। তবে অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধায় চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি বলেন, উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে এবার ভারতের আগ্রহ বেশি। যুক্তি হিসেবে ভারত বলছে, আরও বেশি বড় বড় উন্নয়নকাজে চীনের অংশগ্রহণ ঘটতে থাকলে ভারতের জন্য তা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ মন্ত্রী আরও বলেন, শেখ হাসিনার ভারত সফরে মোদি সরকার এ ব্যাপারে এক ধরনের পরামর্শ দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশকে। সফরের ব্যাপারে জানা এমন একটি সূত্র জানায়, এই পরামর্শে কিছুটা সম্মতিও জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

এ ক্ষেত্রে বড় প্রকল্পে ভারতের অনীহা থাকলে বা সক্ষমতার অভাব দেখা দিলে সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশের সহযোগিতা গ্রহণ করার সুযোগ নেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। তাতে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পরামর্শও ঠিক থাকবে, চীনের সঙ্গে কাজের সম্পর্কও থেকে যাবে।

সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-চীনের নানা ইঙ্গিতের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর কূটনীতিক সম্পর্কে অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের বিভিন্ন পরামর্শ চীন কতখানি ছাড় দেয় বা চাপ দেবে, তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার কতটা দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের গুরুত্ব বেশি বাংলাদেশে। গত ১৫ বছরে নানা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনের প্রতিও নির্ভরতা বেড়েছে শেখ হাসিনার সরকারের। এ অবস্থায় কাউকে পাশ কাটিয়ে আবার একটি দেশের প্রতি বেশি ঝুঁকে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত সময়গুলো যেভাবে পার করে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এবার সেভাবেই পার করবেন। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হেরফের হবে না।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারত-চীন ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমরা অনপ্রিন্সিপাল কাজ করি। যারা আমাদের ওপর চাপ দেন, তারাও জানেন আমাদের এ নীতির কথা। আমরা কারও লেজুড় হয়ে চলতে চাই না। ভারত ও চীন তারা পরস্পরবিরোধী। আমাদের তাতে কোনো অসুবিধা নেই। আমরা সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলব।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভারতের সঙ্গে জন্ম থেকেই সম্পর্ক। বাংলাদেশের জন্মের সময়ে চীন উল্টো দিকে ছিল, এখন তারা আমাদের উন্নয়ন সঙ্গী। ভারত-চীনের সমস্যা থাকতে পারে, আমরা সেদিকে তাকাব না। আমরা দেখব আমাদের সঙ্গে কী সম্পর্ক সেদিকে।’ তিনি বলেন, ভারতও চীন থেকে ঋণ নেয়, তাদের সঙ্গে বাণিজ্য করে। ভারতের মতোই বাংলাদেশও চীনের কাছ থেকে ঋণ নেয়, দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করে।

‘রাজনৈতিক বিশ্বাস’ আরও গভীর করতে আগ্রহী বেইজিং : চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং গতকাল এক ঘোষণায় বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক ‘রাজনৈতিক বিশ্বাস’ আরও গভীর করতে আগ্রহী চীন।

সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে স্বাগত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন ও আলোচনা করবেন শেখ হাসিনা। দুই প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার নথি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য, ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলনেও যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।