যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ সরকারের চলতি মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগেই নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। তার আশা ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ইতিবাচক প্রবণতা হয়তো তাকে এবং তার দলকে নির্বাচনের বৈতরণী পার করতে সহায়তা করবে। কিন্তু জনপ্রিয়তা সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেই সুনাকের সেই ‘বাজি’ কাজে আসেনি বলেই মনে হচ্ছে। সব ধরনের জরিপ ও বিশ্লেষকদের মত বলছে, ১৪ বছর পর ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টিকে হটিয়ে ক্ষমতায় ফিরবে লেবার পার্টি। শুধু ফিরছে বললে ভুল হবে, তারা ফিরছে রেকর্ডসংখ্যক আসন জিতে। রেকর্ডসংখ্যক আসন না জিতলেও আগামী সরকার যে কনজারভেটিভ তথা টোরিদের থাকছে না, সেটি মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলছেন সবাই। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় শুরু হয় ভোটগ্রহণ। সাড়ে চার কোটি ভোটারের জন্য দেশ জুড়ে ছিল ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে। গির্জা, কমিউনিটি সেন্টার ও স্কুলের মতো প্রথাগত কেন্দ্রের পাশাপাশি একটি পাব ও একটি জাহাজকেও ভোটকেন্দ্রে হিসেবে সাজানো হয়। ৯৫টি দল ও স্বতন্ত্র মিলে রেকর্ড ৪ হাজার ৫১৫ প্রার্থী এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৩৪ জন, যাদের প্রচার ঘিরে ১০ লাখের বেশি ব্রিটিশ-বাংলাদেশির মধ্যে দেখা গেছে উৎসবের আমেজ। স্থানীয় সময় রাত ১০টায় বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ করা হবে। সেখান থেকেই ভোটের মোটামুটি নিখুঁত একটি চিত্র পাওয়া যাবে। পরে রাতভর যুক্তরাজ্যের ৬৫০ আসনের আংশিক ও পূর্ণ ফল আসতে থাকবে। যে দল ৩২৬টির বেশি আসন পাবে, শুক্রবার তাদেরই সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন রাজা তৃতীয় চালস। এবার ভোটারদের তিন ভাবে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে যুক্তরাজ্যের নির্বাচন কমিশন। এক. সশরীরে কেন্দ্রে গিয়ে। দুই. ডাকযোগে। তিন. মনোনীতি ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থাৎ যাদের নিজ কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার আর কোনো উপায় নেই, তাদের জন্য এ ব্যবস্থা। সব ক্ষেত্রেই ভোট দিতে ভোটারদের ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র প্রদর্শন আবশ্যক। বিবিসি বলছে, ডাকযোগে ভোট দিতে চাওয়া নাগরিকদের কাছে সময়মতো ব্যালট পৌঁছাতে না পারায় অনেকের ভোট দেওয়ার ফিরতি ডাক হয়তো ৪ জুলাই রাত ১০টার আগে কেন্দ্রে আসবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এসএনপির ওয়েস্টমিনস্টার নেতা স্টিফেন ফ্লিন। তবে দেশটির ডাক বিভাগ রয়্যাল মেইল এটি মানতে নারাজ।
গতকাল সকালেই স্ত্রী অক্ষতা মূর্তিকে নিয়ে নর্থ ইয়র্কশায়ারের একটি কেন্দ্রে ভোট দেন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। ভোট দেওয়ার পর জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী না হলেও ক্ষীণ আশা করেছেন তিনি। লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার স্ত্রী ভিক্টোরিয়াকে নিয়ে ভোট দেন উত্তর লন্ডনের একটি কেন্দ্রে। জরিপে তার দলকে এগিয়ে রাখলেও জয় নিশ্চিত করতে ভোটারদের কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্টারমার।
বিবিসি বলছে, ২০১৯ সালে বরিস জনসন সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর এটাই যুক্তরাজ্যে প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এর আগে আরও দুটি সাধারণ নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল কনজারভেটিভ পার্টি। ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। ব্রেক্সিট গণভোটে হেরে পরাজয় স্বীকার করে পদত্যাগ করলে একই বছর তার স্থলাভিষিক্ত হন টেরিজা মে। তাকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসেন বরিস জনসন। কভিড মহামারীর লকডাউনের সময় আইন ভেঙে মদের পার্টি দেওয়ার কেলেঙ্কারি মাথায় নিয়ে জনসন পদত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হন লিজ ট্রাস। তবে তিনিও বেশিদিন থাকতে পারেননি। তার বিদায়ের পর ক্ষমতায় আসেন ঋষি সুনাক। সব মিলিয়ে গত ১৪ বছরে কনজারভেটিভ পার্টির পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে সর্বশেষ লেবার সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন গর্ডন ব্রাউন, যিনি ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার আগেও ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লেবার নেতা টনি ব্লেয়ার। ১৯৯৭ সালে টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে দলটি সর্বোচ্চ ৪১৮টি আসন জিতেছিল। তবে জরিপ বলছে, লেবারদের সাফল্য এবার সেই মার্জিনকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইউগভ, ফোকালডেটা ও মোর ইন কমন নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত তিনটি বড় আকারের জরিপে বলা হয়েছে, লেবার পার্টি অন্তত ৪৩০ আসন পেতে যাচ্ছে। কিছু জরিপে লেবারের আসন ৪৮০টির মতো হতে পারে বলেও দেখা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাউনিং স্ট্রিটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কিয়ার স্টারমারের (৬১) আগমন মোটামুটি নিশ্চিত। আর কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরের গোলযোগপূর্ণ শাসনামলের অবসান এখন সময়ের ব্যাপার। ভোটের পর প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকসহ সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে বিদায় নিতে হতে পারে। এরকম ঘটলে তিনিই হবেন যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি সাধারণ নির্বাচনের পর নিজের পদ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।
পূর্বাভাস সঠিক হলে শুক্রবার ঋষি সুনাক রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। এরপর রাজার সঙ্গে দেখা করবেন স্টারমার এবং সে সময় চার্লস তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের পরবর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাবেন।
আমন্ত্রণ গ্রহণ করে স্টারমার ডাউনিং স্ট্রিটে তার নতুন কার্যালয়ে যাবেন। সেখানে নতুন মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার আগে বক্তব্য রাখবেন।
সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী ও প্রধান কৌঁসুলি স্টারমার ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তার জন্য অপেক্ষা করছে ভঙ্গুর সরকারি সেবা কাঠামো ও স্থবির অর্থনীতিকে মেরামত করার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
রয়টার্স লিখেছে, জরিপের লেবারদের জয়ের আভাসের পাশাপাশি এটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, কনজারভেটিভদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, অর্থনীতিতে উদ্বেগ আর আট বছরে পাঁচ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে টালমাটাল সময়ের মধ্যে দিয়ে যুক্তরাজ্যকে যেতে হয়েছে, অনেক ভোটার স্রেফ সেখান থেকে উত্তরণের আশাতেই ক্ষমতায় পরিবর্তন চাইছেন। তার মানে হলো, লেবার পার্টির কাঁধেও অর্থনীতি মেরামত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসনসহ বিপুল সমস্যার বোঝা চাপবে আর সেগুলোর সমাধান করার জন্য যথেষ্ট অর্থের জোগান পাওয়া সহজ হবে না ভাবী প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের জন্য।
এদিকে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিরাচরিত প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর বাইরে এবার ভোটের মাঠ গরম করেছে এমন দলগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে জাতীয় পর্যায়ে লিবারেল ডেমোক্রেটস পার্টি, ইউকে রিফর্ম, গ্রিন পার্টি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে স্কটল্যান্ড-ভিত্তিক স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি), নর্দান আয়ারল্যান্ড-ভিত্তিক ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি (ডিইউপি) ওয়েলস-ভিত্তিক প্লেইড সিমরু।
এদিকে যুক্তরাজ্যের এবারের ভোটে লড়ছেন রেকর্ড বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। নির্বাচনে বিভিন্ন দলের মনোনয়নে প্রার্থী হয়েছেন সব মিলিয়ে অন্তত ৩৪ জন। লেবার পার্টি থেকে আছেন আটজন। এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আবার মনোনয়ন পেয়েছেন এমন চারজন হচ্ছেন রুশনারা আলী, রূপা হক, টিউলিপ সিদ্দিক ও আফসানা বেগম। অন্য চার প্রার্থীর মধ্যে আছেন রুমী চৌধুরী, রুফিয়া আশরাফ, নুরুল হক ও নাজমুল হোসাইন।
কনজারভেটিভ পার্টি থেকে আছেন দুজন আতিক রহমান ও সৈয়দ সাইদুজ্জামান। রিফর্ম ইউকে থেকে একজন, লিবারেল ডেমোক্রেটস থেকে একজন, এসএনপি থেকে একজন, গ্রিন পার্টি থেকে তিনজন, সোশ্যালিস্ট পার্টি থেকে একজন, ওয়ার্কার্স পার্টি অব ব্রিটেন থেকে ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১১ জন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের মধ্যে ইতিহাস সৃষ্টিকারী রুশনারা আলী এবার সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছেন। চার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীসহ ১০ প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে রুশনারাকে।