পেছনের গল্প

‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’

প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়

দরজায় টোকা দিলাম, তখন সকাল ন’টা। ‘কে, আসছি।’ এ কথাটা ভেসে এলো। আমি প্রথম যৌবনে বেশ সাহসী ছিলাম বলতে হবে। সেই সকালে হাজির হলাম ন’নম্বর হেয়ার স্ট্রিটের বাড়িতে, ওয়ারী। উয়ারী তখন ঢাকার এক নম্বর সম্ভ্রান্ত এলাকা। লাল রঙের বাড়িটা। একটু পরেই একজন কপাট খুললেন, লুঙ্গি ও ফতুয়া পরা। ‘কাকে চাই?’ আপনি কামরুল ভাই না?

: হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাকে চিনতে পারছি মনে হয়।

: আমার নাম ফয়েজ। কলকাতার হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় দেখা করেছিলাম।

: আরে এসো এসো। কী করে জানলে, আমি এসেছি? এই তো কাল সন্ধ্যায় এলাম। এই বলে জড়িয়ে ধরলেন তিনি।

পঞ্চাশের গোড়া থেকেই আমি চিত্রশিল্পীদের বাড়িতে যেতাম। সে সময় কলকাতা থেকে যারা এসেছিলেন, তাদের মধ্যে তিন প্রধানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ও সফিউদ্দিন আহমদ। কলকাতাতেই এরা নাম করেছিলেন। কামরুল হাসান শুধু শিল্পী নন, মুকুল ফৌজের অধিকর্তা, ব্যায়ামবিদ, ব্রতচারী সংগঠক; সে কারণে এখানে অনেকেই তার নাম আগে থেকেই জানতেন। কামরুল হাসান ভাড়া বাড়িতে থেকেই বলতে হবে জীবন কাটিয়েছেন। সে ছোট একটা বাড়ি তিনি করেছিলেন হাতিরপুলে কাছে, সেটা বউ নিয়ে গেছেন; যে স্ত্রী বারো বছর আগে থেকেই তাকে পরিত্যাগ করে গুলশানের দিকে বাড়ি করে থাকেন। দীর্ঘদিনের একাকিত্বের মধ্যে একমাত্র মেয়েকেও তিনি একান্ত নিকটে পাননি; কিন্তু সবই মেয়েকে দিয়ে গেছেন। জীবনের প্রায় সবটা, বিশেষ করে শেষ জীবনে আমি নিবিড়ভাবে তার কাছে ছিলাম। আমার ওপরেই এলো লাশ গ্রহণের দায়িত্ব। তাকে কবর কীভাবে কোথায় দেব সে ব্যাপারেও আত্মীয়রা কেউ এলো না। আর্টস ইনস্টিটিউটে রাতে এসে তার লাশ রাখা হয় আর ছাত্র কামাল, মোহন ও অন্যরা সে লাশের গোসল ও কাফনের কাপড়ের ব্যবস্থা করে। তখনো কন্যা বা প্রাক্তন স্ত্রী কারও কোনো সন্ধান ছিল না। হাজার হাজার মানুষ ভোর থেকে চারুকলা ভবনে ভিড় করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক ছাত্র কামরুলের দেহ রক্ষা করেছে, পাহারা দিয়েছে। ভয় ছিল এরশাদের আর্মি এসে এই মরদেহ অন্যত্র নিয়ে যেতে পারে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি এক মিনিটের বক্তৃতায় বলেছিলেন যে, এরশাদ বিশ্ববেহায়া। তার এই উক্তি পরবর্তীকালে উদ্ধৃত করা হয় সর্বত্র। ভোর ছ’টায় আমি চারুকলায় পৌঁছাবার পরপরই মোহন রায়হান একটা দ্রুতগামী গাড়িতে পৌঁছাল। তার গাড়ির পেছনে কয়েক হাজার পোস্টার ‘... বিশ্ববেহায়া’, একই সঙ্গে কামরুলের অঙ্কিত এরশাদের একটি ব্যঙ্গচিত্র। এই পোস্টারটাই তখন প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়াল; এর ছোট সংস্করণ করা হয়েছিল, যা বক্ষে ধারণ করা যায়। সেই পোস্টার আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই ব্যঙ্গচিত্রের একটি ক্ষুদ্র ইতিহাস আছে। দোসরা ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার কবিতা পাঠের আসরের সভাপতিত্ব করার কথা ছিল কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্র। অসুস্থ থাকার কারণে আমি উপস্থিতদের মধ্যে উপবিষ্ট কামরুল ভাইকে সভাপতিত্ব করতে অনুরোধ করি। আমার সব ব্যাপারেই কর্তৃত্ব কেন? আমি সেবার পঞ্চমবারের মতো কবিতা উৎসবের আহ্বায়ক; সে সময় আমি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রধান। সংস্কৃতিকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের ওপর আমার তখন প্রচ- প্রভাব। আমি যা বলতাম, কবিতা উৎসবে তাই হতো। কামরুল ভাইকে বলে দিলাম, আপনি পনেরো মিনিট পর সভাপতি হিসেবে দুটো কথা বলে মঞ্চ থেকে নেমে যাবেন। কামরুল ভাই বললেন তাই হবে। এতক্ষণ বসে থাকা যাবে না। শতাধিক কবি কবিতা পাঠ করবে, এখানে বসে শুনব। তিনি মঞ্চে গিয়ে বসলেন। পনেরো মিনিট পর তাকে ভাষণ দিতে বললাম। তিনি চুপ করে গেলেন। আধ ঘণ্টা পর আবার তাগাদা পাঠালাম। এতে তিনি সন্তুষ্ট নন। তিনি বললেন, এত আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে যৌবনের উন্মাদনা, এ থেকে আমাকে সরাতে চাও কেন? আমি নিজে ওপরে গিয়ে এ কথা শুনে ফিরে এলাম। তিনি সাদা কাগজের খাতা চাইলেন চিত্র অঙ্কনের জন্য। দু-তিনজন দৌড়ে এলো কামরুল ভাইয়ের কাছে গিয়ে বসবে এ আশায়। আমি রবীন্দ্র গোপকে বললাম, কাগজপত্র থাকলে কামরুল ভাইকে দাও। উদগ্রীব গোপ ঝুলি কাঁধে নিয়ে কামরুল ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসল এবং একটা রুল করা খাতা দিল তাকে যা খুশি আঁকতে। জীবনের শেষ দিকে কামরুল ভাইয়ের হাতের আঙুল সর্বদা নিশপিশ করত, কিছু একটা করতে চায়। তিনি যা খুশি সর্বক্ষণ সভায় বসে আঁকতেন। কামরুল ভাই সে খাতায় যা খুশি আঁকতে শুরু করলেন।

নিশপিশ করা আঙুল দিয়েই তিনি সেদিন গোপের খাতাটা ভরে ফেললেন ছবিতে-স্কেচে। তারপর আমাদের অনুরোধ তিনি শুনলেন, প্রায় দু’ঘণ্টা বসেছিলেন পা গুটিয়ে। তিনি উঠলেন, মাইকের কাছে গেলেন এবং ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে।’ একটা কথা বলেই ওপরের পকেট থেকে ওষুধ বের করে মুখে দিলেন। আমরা অস্থিরতার সঙ্গে দেখছিলাম। আমি দৌড়ে যাই। আরও ক’জন। ধরে নামাই তাকে মঞ্চ থেকে। তিনি প্রথম রোতে আমার ভ্রাতুষ্পুুত্রের চেয়ারে বসলেন। কোনো কথা বলেননি। সে সময় শেখ হাসিনা এসেছিলেন কবিতা শুনতে। একজনের পরেই ছিলেন তিনি। দুই মিনিট পরেই কামরুল ভাইয়ের মাথা পেছনের দিকে বাঁকা হয়ে পড়ল, ভাতিজা রুমি ও আমাদের মেয়ে মিঠুর গায়ের ওপর। চারদিকে বিষন্ন গোলযোগ! আমরা তক্ষুনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তাকে নেওয়ার জন্য গাড়ি খুঁজছিলাম। শেখ হাসিনাও উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। তিনি তার পাজেরো জাতীয় গাড়িটা দিয়ে বললেন, এতে করে শিগগির নিয়ে যান। সে গাড়িতেই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ডাক্তাররা কাউকে ইনটেনসিভ কেয়ারে যেতে দেননি, আমাকে তারা পথ ছেড়ে দিলেন। বাইরে শ’খানেক কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী-নেতা। বহুবার টেলিফোনে তার কন্যা রত্নাকে ধরার চেষ্টা করা হলো। সবই বৃথা। তার আর কাউকে আমরা চিনি না। স্ত্রী নেই। তার বুকের ওপর বসে নিঃশ্বাস বের করার চেষ্টা করছেন তখন ডাক্তাররা। পরে তারা সমস্ত আশা ত্যাগ করলেন। ডাক্তাররা আমার দিকে চেয়ে বুঝিয়ে দিলেন কামরুল হাসান আর নেই! আমি এ কষ্টটা কীভাবে অপেক্ষমাণ কর্মীদের জানাব। মর্মান্তিক বেদনার্ত হৃদয়ে তাদের কাছে এসে বললাম : ‘কোনো দেশে এ জাতীয় আশ্চর্য অবিশ্বাস্য গুণসম্পন্ন ব্যক্তি তৈরি হয় পঁয়ষট্টি থেকে সত্তর বছরে!’ এ কথাই ছিল যথেষ্ট ইঙ্গিত। কান্না চেপে রাখতে পারিনি। প্রকৃত আত্মীয় বা সন্তানের সন্ধান না পাওয়ার পর আমাকেই খাতায় দস্তখত করে লাশ গ্রহণ করতে হয়েছে। এ লাশ আমরা কোথায় নেব? এরশাদ বাহিনীর ভয় আছে। শেষ পর্যন্ত চারুকলাতেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কামরুল ভাই আমার জীবনের প্রথম বই ‘জোনাকী’র প্রচ্ছদ করেছেন। তিনি আমার আরও ছয়টি বইয়ের চিত্রাঙ্কন করেছেন। আর তার অদ্ভুত স্কেচ ও আমার ছড়ার প্রতিযোগিতা হয়েছে। তার তুলির সঙ্গে লড়াই হয়েছে, সে বইটিও এখন বাজারে। তার স্টুডিওর ওপর আমি ছড়া লিখেছি। সেই মহান শিল্পী কামরুল হাসানকে হারিয়ে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম। তিনি এক সম্পাদককে ‘তিন কন্যা’ চিত্র দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বিশেষ অনুরোধে, আমারই সামনে। তাকে অনেকে ঠকিয়েছেন। আমি দেখেছি আমাদের চেনা এক বন্ধু একদিন কামরুল ভাইয়ের ছবি নিতে এসে তিনটা ক্যানভাসের চিত্র নিলেন। পরদিন দুটো সিলিং পাখা পাঠিয়ে দিলেন চিত্রের মূল্য বাবদ। কামরুল ভাইয়ের তখন ফ্যান কম ছিল। শেষের দিকে এবং উত্তরায় বাসা নেওয়ার পূর্বে তিনি ঢাকার মণিপুরীপাড়ায় একা থাকতেন। যাক, সেসব কথা।

তার কবর কোথায় হবে তা নিয়ে কথা উঠল। কোনো কোনো শিক্ষক চারুকলায় কবর দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি করলেন; কিন্তু একটা কথা উঠেছিল জয়নুলের পাশে তার কবর হওয়া উচিত। চারুকলায় একটা বৃহৎ কক্ষে সব বুদ্ধিবৃত্তির লোক কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থান নির্ধারণ করার জন্য। শওকত ওসমান আমাদের প্রিয় মান্যবরেষু। তিনি বললেন, ফয়েজ, তুমি যা ঠিক করবে তাই হবে। কেউ দায়িত্ব নিতে রাজি নন। আমি বললাম, জয়নুলের কবরের কাছেই তার কবর হওয়া বাঞ্ছনীয়। সবাই বলল, তাই হবে। আমার ধারণা ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ প্রস্তাব সাদরে মেনে নেবে। আমি ৫শ টাকা দিয়ে কর্মীদের বললাম, এখানে কবর হবে, কবর খোঁড়ার লোক নিয়ে এসো। আরও কেউ কেউ টাকা দিলেন, যেমন শিল্পী রফিকুন নবীও টাকা দিলেন। এবার প্রশ্ন হলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলা। আবদুল মতিন সাহেব তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। তার অফিসে তখন সিন্ডিকেটের সভা আরম্ভ হয়েছে। পাশের রুমে ড. মুর্শেদ, শওকত ওসমান প্রমুখ বিশিষ্ট ৩০ জন আমাদের সঙ্গে ছিলেন। উপাচার্য মতিন সাহেবকে বললাম : কামরুল হাসানকে আমরা জয়নুল, নজরুলের কবরের পাশে কবর দিতে চাই। আপনি অনুমতি দিলে সেটা সম্ভব হবে। লাশ এখন ওখানেই আছে। তিনি বললেন : সিন্ডিকেটের সদস্যরা আমার কক্ষেই আছেন। তাদের সঙ্গে এক্ষুণি আলাপ করে জানাচ্ছি। দশ মিনিট পর তিনি ফিরে এসে হতাশাব্যঞ্জক খবর দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির ওপর এই কবর দেওয়ার অনুমতি সিন্ডিকেট দিতে চাচ্ছে না। আমরা গভীর বেদনা নিয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে ফিরলাম। পথে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলিনি, সবাই ভেবেছেন এখন কী করা যায়। মসজিদে ফিরে দেখলাম, জানাজার জন্য খাটটা সাদা কাপড়ে কাফন দিয়ে ফুল দিয়ে সাজিয়ে ভেতরে রাখা হয়েছে। কারও কাছে জিগ্যেস করিনি কিছু। নিচু প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে বললাম : কামরুল হাসানের দাফন বা কবর এখানেই হবে! উৎফুল্ল সবাই বলল, কবর তৈরি হয়ে গেছে। জানাজার পর জয়নুলের কাছেই কামরুলের কবর দেওয়া হয়, এতে কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি ছিল না। বাধ্য হয়ে পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট এক সভায় কামরুলের কবর অনুমোদন দিয়েছিল।

দেশ বিভাগের পূর্বে এই কামরুল ‘ভিমরুল’ নামে ‘আজাদ’ পত্রিকায় কার্টুনিস্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রতচারী আন্দোলনের পুরোধা, তার মতো ক’জন রায়বেশে ঢোল বাজাতে পারত? কামরুল তখন ছিলেন মুকুলফৌজের জন্মদাতা। আবার তিনিই ছিলেন শরীর গঠনের একজন অগ্রপথিক, যিনি কলকাতায় ‘আয়রনম্যান অব বেঙ্গল’ খেতাব পেয়েছিলেন। তাকে রেখে আমরা চললাম স্বগৃহে। ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ পোস্টারটাই আমাদের সম্বল হয়ে রইল। এ এক ঐতিহাসিক দলিল, যেখানে ইতিহাসকে ধরে রাখা হয়েছে। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব